তা না হয় হল। কিন্তু ভোজবাজির মতো ব্যাপারটা কী হল? শান্তনুও বুড়ো আঙুল। দিয়ে গাল চুলকোতে চুলকোতে ঐ একটা কথাই বলল, তাই তো। ব্যাপারটা কী হল?
উত্তর তখনই পাওয়া গেল না। রিস্টওয়াচের ওপর চোখ পড়তেই চমকে উঠলাম। দশ মিনিট কখন হয়ে গেছে! চলো–চলো।
আমরা হুড়মুড় করে গাড়ির দিকে চললাম। পাহাড়টা ঘুরতেই যে জায়গাটা সেখানেই তো গাড়িটা থাকার কথা। কিন্তু–
তাহলে আমরাই জায়গা ভুল করেছি। শান্তনু বলল।
বললাম, না, আমরা কিছু ভুল করিনি। ঐ দ্যাখো বিরূপাক্ষদা দাঁড়িয়ে আকাশ-পাতাল কী ভাবছেন।
বলিহারি যা হোক! আমাকে একা ফেলে কোথায় গিয়েছিলে তোমরা? গাড়িটাও নিয়ে গেলে?
গাড়িটা নিয়ে গেলাম মানে?
মানে তো আমিই জানতে চাই। এই সরু রাস্তায় গাড়ি নিয়ে যাবার কী এমন দরকার পড়ল?
আমরা আবার গাড়ি নিয়ে কোথায় যাব? আমরা কি গাড়ি চালাতে জানি?
তোমরা চালাতে যাবে কেন? ড্রাইভারকে নিয়েই গেছ।
আমরা অবাক হয়ে দুজনের দিকে তাকালাম। নিশ্চয় বলতে পারতাম এই মায়াবী পাহাড়ি রাস্তায় এতক্ষণ ধরে ঘুরতে ঘুরতে বিরূপাক্ষদার মাথা গোলমাল হয়ে গেছে। কিন্তু এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখলাম গাড়িটা সত্যিই নেই।
বাঃ রে মজা! ড্রাইভার সুষ্ঠু মোটর গাড়ি উধাও!
এবার আমাদের দুর্ভাবনা হল। কী সব হচ্ছে!
ব্যাপারটা একটু খুলে বলুন তো বিরূপাক্ষদা!
খুলে আর বলব কী? প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে ঐ ঝোপটার দিকে গিয়েছিলাম। উঠে দাঁড়িয়ে আলিস্যি ভাঙলাম। দেখলাম অজস্র টকটকে লাল ফুল–থোকা থোকা লাল ফুল। শুনেছিলাম রডোড্রেনড্রন নাকি লালফুল। ভাবলাম এগুলোই যদি রডোড্রেনড্রন হয় তাহলে তোমাদের ডেকে দেখিয়ে দিই। ব্যাস এখানেই যদি নয়ন সার্থক হয়ে যায় তাহলে আর এগোবার দরকার কী? এই ভেবে ডাকতে গিয়ে দেখি তোমারও নেই গাড়িও নেই। আমি তো ভয়ে কাটা। এই জনমানবশূন্য জায়গায় অমি একেবারে একা! ভাবো তো কী অবস্থা!
শান্তনু বলল, এ ব্যাপারটা পরে গাড়িতে বসে ভাবলেও চলবে। এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ ভাবনার কথা হচ্ছে–থাপা আমাদের না জানিয়ে গাড়িটা নিয়ে গেল কোথায়?
আমি ভয়ে ভয়ে বললাম, আমাদের ফেলে রেখে পালাল নাকি?
শান্তনু বলল, পালাবে? কেন পালাবে? আমাদের জব্দ করার কারণ তো কিছু ঘটেনি। তাছাড়া ভাড়ার মোটা টাকা হাতছাড়া করবে বিক্রম এমন বুদ্ধ নয়।
আমি ইতস্তত করে বললাম, তবু লোকটাকে তো ঠিক স্বাভাবিক বলে মনে হয় না।
বিরূপাক্ষদা চোখ গোল গোল করে একবার আমার দিকে একবার শান্তনুর দিকে তাকাচ্ছিলেন আর সভয়ে আমাদের কথা শোনবার এবং মানে বোঝবার চেষ্টা করছিলেন। এবার আর চুপ করে থাকতে পারলেন না। বলে উঠলেন, পালানোর কথা কী সব বলছ তোমরা একটু স্পষ্ট করে বলো।
দেখছি গাড়িও নেই, বিক্রমও নেই। এর মানে কী হতে পারে তাই আলোচনা করছিলাম।
বিরূপাক্ষদা একেবারে আঁতকে উঠলেন–অ্যাঁ! এসব কী কথা! বিক্রম যদি চলে গিয়ে থাকে তাহলে আমরা যাব কী করে? আর থাকবই বা কোথায়? এ তো মানিকতলা থেকে শ্যামবাজারের মোড় পর্যন্ত কিংবা বাড়ি থেকে বাজার যাওয়া নয়। হায় হায়! শেষ পর্যন্ত পাহাড়ের নীচে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শীতে কাঁপতে কাঁপতে মরতে হবে। আমার তো আবার বেজায় ঠান্ডার ধাত! ও শান্তনু, তুমি অমন গোমড়া হয়ে থেকো না।
শান্তনু বলল, না, আমি অন্য কথা ভাবছি।
কী? ভয়ে ভয়ে বিরূপাক্ষদা তাকালেন।
ভাবছি, আমরা শীতে মরব, না হিংস্র প্রাণীদের উদরপূর্তির সহায়ক হব?
আঁৎকে উঠলেন বিরূপাক্ষদা–আবার হিংস্র জন্তু-টন্তুর কথা কী বলছ? এই ঘোর বিপদের একেবারে মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে তোমরা কি মজা করছ? আমায় ভয় দেখাচ্ছ?
শান্তনু মাথা নাড়ল–না বিরূপদা, আমরা অমন বেরসিক নই। চেয়ে দেখুন। এই ছাপগুলো কোন জীবের বলতে পারেন?
চমকে লাফিয়ে উঠে দু’পা পিছিয়ে এসে চশমাটা ঠিক করে নিয়ে ঠাওর করলেন বিরূপাক্ষদা। এ তো কুকুরের পা। ও বাবা এ তো দেখছি অনেকগুলো। এত কুকুর–একসঙ্গে!
কাছাকাছি গেছেন। কিন্তু ফুল মার্কস পেলেন না। এগুলো কুকুরের থাবা নয়। কুকুরের থাবা অন্যরকম। আপনি নেকড়ের থাবা দেখেছেন?
নেকড়ের থাবা! কলকাতায় ঘোরাঘুরি করে একটা গোটা নেকড়েই দেখলাম না তো নেকড়ের থাবা! কী বলতে চাও তুমি?
শান্তনু গম্ভীর গলায় বলল, এইসব অঞ্চলের পাহাড়ে এক ধরনের নেকড়ে আছে যারা আসল নেকড়ে নয়, তবে নেকড়েদের জাতভাই। ওরা সাধারণত কুকুরের চেয়ে বেশ ছোটো। মাটি শুঁকতে শুঁকতে, সামনের দিকে শরীর ঝুঁকিয়ে, ক্ষিপ্রগতিতে ছোটে। নেকড়ের চেয়ে আকারে ছোটো। কিন্তু ঢের বেশি হিংস্র। একটা বিদেশী বইয়ে পড়েছিলাম এরা একাই একটা পূর্ণবয়স্ক মানুষকে খেয়ে ফেলতে সময় নেয় আট থেকে দশ মিনিট। মারাত্মক কথা হচ্ছে, এরা থাকে পাহাড়ে। এক জায়গা থেকে বেরিয়ে যখন অন্য জায়গায় যায় তখন দলবদ্ধভাবে ছুটতে ছুটতে যায়। সামনে কেউ পড়লে তার রক্ষা থাকে না।
বিরূপাক্ষদা বললেন, ও বাবা, তুমি এতও জান। গোয়েন্দাকেও হার মানাও দেখছি। তা এতগুলি নেকড়ে-শাবক একযোগে গেলেন কোথায়? ‘পুনরাগমনায় চ’–ফিরে আসার জন্যে যায়নি তো?
মনে হয় ফিরবে আর এই পথ দিয়েই। আমি যতদূর পড়েছি তাতে জেনেছি এদের স্বভাবই এই–দিক পরিবর্তন করে না।
