গাড়ি এখন চলছে অনেকটা স্বাভাবিক গতিতে। তবু বিক্ৰম গাড়ি চালাতে চালাতেই মাঝে মাঝে ঘড়ি দেখছে। এতেও আমার ভয়-না জানি আবার কী হয়।
আমি ইশারাতে শান্তনুকে জিগ্যেস করলাম, এত ঘড়ি দেখার ঘটা কেন?
শান্তনু বললে, বাঃ! মনে নেই আমাদের সঙ্গে তো কথাই ছিল বেলা থাকতে থাকতেই এসে পৌঁছতে হবে ‘হিলে’তে।
তার মানে এখনও যথেষ্ট ভয় আছে।
শান্তনু একটিপ নস্যি নিয়ে বলল, ভয় পেয়েছি ঠিক। কিন্তু বিপদে পড়িনি এখনও। একটুর জন্যে মৃত্যুর ছোঁওয়া থেকে বেঁচে গিয়েছি।
হ্যাঁ, বেঁচে গিয়েছি বিক্রমের তৎপরতার জন্যে। কিন্তু ওকে ধন্যবাদ জানিয়েও লাভ নেই। ও তো কথাই শুনবে না। আচ্ছা, বিক্রমের রহস্যটা কী বলে মনে হয় তোমার?
কী করে বলব? তুমিও যেখানে আমিও সেখানে। হয়তো আমি হিমালয়ের পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরেছি কয়েকবার, তা বলে এমন রহস্যময় ঘটনা কখনো ঘটতে দেখিনি। শুধু বিক্রম কেন, জানতে ইচ্ছে করে কেন কোনো ড্রাইভার আসতে চায় না? কেন শনিবারটা যাত্রা করা নিষেধ? ঐ যে বহুরূপী মূর্তিটাকে ও? কেন, কী করে কখনও কুকুর, কখনও ওরাং ওটাং, কখনও মানুষের রূপ ধরছিল? বিজ্ঞানের যুগে একি সম্ভব? তা যদি না হয় তাহলে বলতেই হয়, সবটাই চোখের ভুল। পাহাড়ের মায়া।
কিন্তু এও তো গোঁজামিলের কথা। আমরা তো সম্পূর্ণ দেখলাম শেষ মুহূর্তে মনুষ্যমূর্তি জীবটি গাড়ির দিকে ওয়টারপ্রুফটা ছুঁড়ে দিয়ে আমাদের আটকাতে চেয়েছিল। এ তো চোখের ভুল হতে পারে না। তাই না?
শান্তনু বলল, মনে হয় এসবের উত্তর আমরা পেতে পারি বার্সে পৌঁছে, ওখানকার কেউ না কেউ হয়তো জানতে পারে।
বললাম, হয়তো তাই, ও–আচ্ছা, আমাদের বার্সে পৌঁছে দিয়ে বিক্রম আমাদের নিয়ে ফিরবে তো? নাকি ফেলে পালাবে? তা হলেই তো চিত্তির!
শান্তনু বলল, আমাদের নিয়ে ফিরতে না পারে। সেটা তার ইচ্ছে। কিন্তু আজ হিলে পৌঁছে ওকে নাইট হল্ট করতেই হবে। রাত্রে পাহাড়ি রাস্তায় যাবে না। ফিরলে কাল সকালে। তবে এ কথাও ঠিক–এ পথ দিয়ে ফিরবে না। আর আমাদের না নিয়ে ফিরলে ওর লাভ কী?
বিরূপাক্ষদা হঠাৎ অধৈর্য হয়ে বলে উঠলেন, এই ড্রাইভার সাহেব, গাড়িটা একবার রোখো। লং জার্নি–একটু নামার দরকার হয় তা কি তুমি বোঝ না?
কিন্তু থাপা শুনতেই পেল না। এবার শান্তনু ওকে একটু ঠেলা দিয়ে পাহাড়ি ভাষায় গাড়িটা একটু দাঁড় করাতে বলল। বিক্রম যেন বিরক্ত হয়েই একধারে গাড়িটি দাঁড় করাল।
বিরূপাক্ষদা দরজা খোলবার জন্যে ব্যস্ত হলেন। কিন্তু দরজার কলক্তি ঠিক বোঝেন না। শুরু করলেন ধাক্কাধাক্কি। বিক্রম ইশারায় বিরূপাক্ষদাকে নিরস্ত করে পিছু না ফিরেই ডান হাত বাড়িয়ে লকটা খুলে দিল। সবাইকে উদ্দেশ করে এতক্ষণে বিক্রম মাত্র আধখানা করা বলল, ‘Ten minutes only.’ বলে দশটা আঙুল তুলে দেখিয়ে দিল।
ঠিক আছে। বলে এ দরজা দিয়ে আমি আর শান্তনু নেমে পড়লাম। আঃ! কী মুক্ত প্রকৃতি! এতক্ষণ বন্ধ গাড়ির মধ্যে থেকে যেন হাঁপিয়ে উঠেছিলাম, এখন বেরোতেই শীত ধরে গেল। হাত-পা একটু খেলিয়ে নেবার জন্যে আমরা প্রথমে আলিস্যি ভেঙে তারপর জোরে জোরে পা ফেলে খানিকটা হাঁটলাম। একবার পিছনে ফিরে দেখলাম বিরূপদা আপাদমস্তক গরম কম্বল মুড়ে গুটিগুটি এদিকে আসছেন। কিন্তু বিক্রম কোথায় গেল? ও কি নামেনি? আশ্চর্য! এতখানি জার্নি করেও কি একবার মাটিতে পা রাখার দরকার ওর হয় না?
যাই হোক, বিক্রমের জন্যে ভাবার দরকার নেই। এসব অঞ্চলে আগে ঘুরেছে। বিরূপাক্ষদাকে নিয়েই যত ভাবনা। এই যে আমরা ওঁকে ফেলে এগিয়ে এসেছি তাতে উনি আমাদের প্রতি বিরূপ।
খাস হিমালয়ের গোটা পাহাড়ের একেবারে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে এর আগে আমরা কখনো নগ্ন পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখার সুযোগ পাইনি। আজই দেখলাম, পাহাড়ের গায়ে যে জমা শ্যাওলা তারও মধ্যে যেন একটা বিশেষত্ব আছে। পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে কতরকম গাছের চারা। একেবারে শীর্ষে বড়ো বড়ো গাছ যেন আকাশকে ধরতে চাইছে। তাছাড়া আছে। হরেকরকমের ফুল। বেশির ভাগই ভায়োলেট কালার। কোনো কোনো সাদা ফুলের পাপড়িতে পাপড়িতে রঙের শোভা। কোথাও থোকা থোকা লাল টকটকে ফুল। আর সেইসব ফুলে উড়ে এসে বসছে কতরকমের প্রজাপতি। আমরা তন্ময় হয়ে দেখছিলাম। শান্তনু উত্তেজিত হয়ে বলল, আরে ঐ তো রডোড্রেনড্রন! দ্যাখো কেমন থোকা থোকা লাল ফুল। এই ফুল দেখে আর কোথায় কোনো ফুল মনে পড়ে বলো তো!
বললাম, আমাদের গরমকালের পলাশ। বসন্তে বাঁকুড়া, পুরুলিয়ায় যেন আগুন ধরিয়ে দেয়।
রাইট! সিকিমিরা রডোড্রেনড্রনকে নাকি ‘গুরাস’ বলে। গুরাস ফুটলে গ্রামের সিকিমিরা আনন্দে মেতে ওঠে।
গুরাসও কি এমনি লাল?–বোকার মতোই প্রশ্ন করি।
শান্তনু হেসে বলল, লাল তো বটেই। যখন বলছি রডোড্রেনড্রন–এরই আর এক নাম ‘গুরাস’।
লজ্জিত হয়ে বললাম, স্যরি!
তবে এক রকমের সাদা গুরাসও নাকি হয়। দারুণ সুন্দর। আরে! ঐ তো সাদা গুরাস! কতো বড়ো! দ্যাখো দ্যাখো। চলো, ফুলটা তুলে আনি। যে ক’দিন পারি অচেনা পাহাড়ি বন্ধুর স্মৃতি হিসেবে রেখে দেব।
আমরা এগিয়ে গিয়ে ফুলটা তুলতে যাচ্ছি। হঠাৎ ভুইফেঁড়ের মতো জঙ্গলের মধ্যে থেকে বেরিয়ে এল সেই বলদে টানা গাড়ির অদ্ভুত দর্শন লোকটি। যাকে দেখেছিলাম অনেক দূর পিছনে। চমকে উঠলাম। সেই সিঁদুর লেপা চওড়া কপাল। সেই খালি গা। হাতের ইশারায় ফুলটা ছুঁতে নিষেধ করল। তারপর সে একটি মাত্র কথা বলেই উধাও হয়ে গেল। কথাটার অর্থ আমি সঠিক বুঝতে না পারলেও শান্তনু বুঝতে পেরে বলল, ভয়ানক বিষ। কোনো রকমে ঠোঁটে ঠেকালেই মৃত্যু। এমনকি হাত দিয়ে ছুঁলেও তাড়াতাড়ি হাত ধুয়ে ফেলতে হয়। নইলে ভুলে মুখে ঠেকিয়ে ফেললে আর রক্ষে নেই।
