কী আসছে?
আমি আর শান্তনু ফের ঝুঁকে পড়লাম। হাঁ, পিছনে অনেক দূরে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসছে কী যেন–বৃষ্টির মধ্যেই নেমে আসছে–
কী ওটা?
বিক্রম না দেখেই বলল, কুকুর।
কুকুর! ও কীরকম কুকুর?
দেহের তুলনায় মুখটা বীভৎস রকম বড় ও উঁচলল। ছুটে আসছে। লক্ষ আমাদের গাড়িটা।
চোখে ধাঁধা লেগে যাচ্ছিল। বিক্রমকে উদ্দেশ করে বললাম, ওটা তো কুকুর মনে হচ্ছে না।
তা হলে দেখুন বোধহয় বানর।
সে আবার কী? বিরূপাক্ষদা বললেন, ম্যাজিক না কি? এই বলছ কুকুর, তার পরই বলছ বানর! তাজ্জব!
আপনিই দেখুন না।
বিরূপাক্ষদা বললেন, আমার নজর কি অতদূরে পৌঁছাবে?
শান্তনু হঠাৎ গম্ভীর গলায় বলল, আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। কুকুর নয়, বানরও নয়, কুচকুচে কালো কিছু একটা দু’পায়ে ভর দিয়ে হাঁটছে, লম্বা হাত দুটো পাশে ঝুলছে। ঠিক যেন ওরাং ওটাং!
হিমালয়ের পাহাড়ে ওরাং ওটাং!
তার চেয়ে অবাক কাণ্ড চেয়ে দ্যাখো কী জোরে ছুটে আসছে। …
বিক্রম তখন ভয়ংকর কিছু বুঝে স্টিয়ারিংয়ের ওপর ঝুঁকে পড়ে মরিয়া হয়ে স্পিড তোলার চেষ্টা করে যাচ্ছে।
ও শান্তনু, আমার তো মনে হয় বানরও নয়, ওরাং ওটাংও নয়, একটা মানুষ–
তাই তো। হাঁটুর নীচে পর্যন্ত ঝোলা ঢিলে ওয়াটারপ্রুফ গায়ে ঢলঢল করছে। মাথায় কানে ওয়াটারপ্রুফ টুপি। ছুটে আসছে এই দিকে।
কী ওটা?
একবার মনে হল কুকুর, একবার মনে হল বানর। আবার পরক্ষণেই মনে হল ওরাং ওটাং। আর এখন মনে হচ্ছে বৃষ্টির মধ্যে দিয়ে এগিয়ে আসছে বর্ষাতি জড়ানো লম্বা একটা মানুষ! এ তো একটা রহস্য! আর কেনই বা উঁচু পাহাড়ের পথ দিয়ে ছুটে আসছে? কেনই বা ওর লক্ষ আমাদের গাড়িটা?
এসবের উত্তর একমাত্র দিতে পারে আমাদের ড্রাইভার বিক্রম থাপা। কিন্তু ও তো গাড়িতে উঠে পর্যন্ত মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে। তারই বা কারণ কী? ও কি জানে এই পথে বৃষ্টি পড়লে এই অদ্ভুত পাহাড়ি জীবটির আবির্ভাব হয়? সেই জন্যেই এই পথে আসতে চায়নি। আর এও জানে ঐ যে বহুরূপী জীবটি গায়ে ওয়াটারপ্রুফ জড়িয়ে লাফাতে লাফাতে ছুটে আসছে সে নিশ্চয় কলা, শাঁকালুভোজী প্রাণী নয়। আর আমাদের সঙ্গে নিছক আলাপ করার জন্যে ছুটে আসছে তাও নয়।
ও ভাই থাপাজি, কিছু একটা বলল। পেছনে ধাওয়া করে আসছে ওটা কী?
থাপাজি উত্তর দিল না। বাঁ হাতটা তুলে শুধু কথা বলতে বারণ করল।
দেখতে দেখতে ওয়াটারপ্রুফওলা ঢ্যাঙা লোকটা হুড়মুড় করে কাছে এসে পড়ল। একটা ছুটন্ত গাড়িকে ধরে ফেলে আর কি! এও আশ্চর্যের কথা! একটা মানুষ কী করে দৌড়ে একটা গাড়ির নাগাল পায়–যে গাড়িটা পাহাড়ের রাস্তাতেও অ্যাকসিডেন্টের ভয় তুচ্ছ করে ছুটছে দুর্দান্ত গতিতে!
আমরা বুঝতে পারলাম এসব রহস্য বিক্রম ভালো করেই জানে। আর হিংস্র লোকটার নাগালের মধ্যে এসে পড়লে কী পরিণতি হবে তাও তার অজানা নয়। অথচ পালানো ছাড়া পরিত্রাণের উপায় আর কী হতে পারে তা বোধহয় থাপাজি জানে না। এ অবস্থায় আমরা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসে রইলাম। একবার বিরূপাক্ষদাকে দেখলাম। চোখ বুজিয়ে শুধু ইষ্টনাম জপ করে যাচ্ছেন।
আকাশে এখন জমাট মেঘ তেমন নেই। তবু মেঘ আছে। টিপটিপ বৃষ্টিও পড়ছিল। মাঝে মাঝে বিদ্যুতের চমকানি। বিক্রম আগের মতোই আকাশের দিকে তাকাচ্ছে। আর বিড়বিড় করে কিছু যেন প্রার্থনা করছে।
হঠাৎ মনে হল পিছনে যেন একটা ঝড়ের আভাস। অথচ আশেপাশে ঝড়ের চিহ্নমাত্র নেই। ঘাড় ঘোরাতেই চমকে উঠলাম। এখন আর পায়ে হেঁটে নয়, দু’পা শূন্যে তুলে ভেসে আসছে মানুষটা। এখন প্রায় দশ হাতের মধ্যে এসে পড়েছে। বোঝাই যাচ্ছে একবার নাগালের মধ্যে পেলে ঐ মানুষের আকারবিশিষ্ট জীবটা কী করবে।
এই সময়ে বৃষ্টিটা যেন প্রায় থেমে এল। আর তৎক্ষণাৎ অসাধারণ তৎপরতায় বিক্রম স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে গাড়িটাকে নিয়ে গেল পাহাড়ের কোল দিয়ে অন্যদিকে। সেখানে পৌঁছতে
কোথায় বৃষ্টি কোথায় ঝড়–কোথায় বা মেঘ ডাকা! একেবারে দুপুরবেলার সোনা গলানো বোদ!
পিছনে তাকিয়ে দেখলাম কোনো জীবজন্তুর চিহ্নমাত্র নেই। শুধু পাহাড়ের পর পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে একরাশ চাপা রহস্য বুকে নিয়ে। হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। সবচেয়ে নিশ্চিন্ত হয়েছে। যেন বিক্রম। বার বার পিছনে ফিরে সেই পাহাড়গুলোর দিকে তাকিয়ে মাথা নত করতে লাগল। যেন কোনো অদৃশ্য দেবতার উদ্দেশে প্রণাম জানাল।
কিন্তু এতক্ষণ ধরে ব্যাপারটা কী ঘটল বুঝতে পারলাম না।
শান্তনু বলল, আমিও ঠিক জানি না। দেখি বিক্রম যদি এখন কিছু বলে!
গাড়ির স্পিড বিশেষ না কমিয়ে বিক্রম গাড়ি চালাচ্ছে। হিলে’ এখনও প্রায় পাঁচ কিলোমিটার। বিক্রমকে খুশি করার জন্য শান্তনু এবার ভাঙা ভাঙা পাহাড়ি ভাষায় জিগ্যেস করল, এখানে যা ঘটল সে বিষয়ে কিছু বলো। আমরা তো শুধু ভয়ই পেয়ে গেলাম। কিছু বুঝলাম না।
উত্তরে বিক্রম কোনো কথা না বলে স্টিয়ারিং থেকে বাঁ হাতটা তুলে শুধু একবার কায়দা করে ঘুরিয়ে দিল। তার অর্থ কী তা ঠিকমতো বুঝতে না পারলেও এটুকু বোঝা যায় যে, হয় সে নিজেও জানে না, নয় তো সে বলতে পারবে না।
অগত্যা আমাদের চুপ করে থাকতে হল। বিরূপাক্ষদা শুধু অধৈর্য হয়ে গজগজ করতে লাগলেন। বললেন, এ তো আচ্ছা রহস্য!–বলে যেন অনেকটা নিশ্চিন্ত হয়ে শার্সি বন্ধ জানালায় মাথা ঠেকিয়ে ঘুমোবার চেষ্টা করলেন।
