আমরা চমকে উঠলাম। সামনে অল্প দূরে যেন মাটি খুঁড়ে উঠে এল একটা বলদে টানা গাড়ি। একটাই বলদ। খুবই হৃষ্টপুষ্ট। কুচকুচে কালো রঙ। তার শিঙ দুটোতে সিঁদুর মাখানো। দু’দিকে তীক্ষ্ণ ফলা লাগানো একটা লম্বা শিক বলদটার নাক এফোড়-ওফোঁড় করে দু’দিকে বেরিয়ে পড়েছে। ফোঁটা ফোঁটা রক্ত গড়িয়ে পড়ছে মাটিতে। আর–
সেই ছাউনিহীন গাড়িতে চালকের আসনে বসে আছে যে, সাক্ষাৎ যমদূতের মতো তার চেহারা। এই প্রচণ্ড ঠান্ডায় তার গায়ে শুধু একটা চাদর আর মাথায় পাগড়ি। দু’চোখ লাল। কপাল জুড়ে সিঁদুর মাখা। একেবারে আমাদের গাড়ির সামনে এসে কোমরে দু’হাত রেখে দাঁড়াল।
বিক্রম গাড়ি থামিয়ে নীচে নেমে হাত জোড় করে হাঁটু গেড়ে বসল। আমরা তো অবাক! তারপর চলল দুজনের পাহাড়ি ভাষায় তর্ক-বিতর্ক। না, তর্কও নয়, বিতর্কও নয়। একজন ক্রমাগত চোখ গোল গোল করে ধমক দিয়ে যাচ্ছে আর আকাশের দিকে আঙুল তুলে কী দেখাচ্ছে। অপর দিকে আমাদের থাপা বাহাদুর হাত জোড় করে মুখ কাচুমাচু করে কিছু একটা উত্তর দিচ্ছে। বারকয়েক পাহাড়ি ভাষায় শনিবার কথাটা শোনা গেল। হাবেভাবে যতটুকু বোঝা গেল তা হচ্ছে যমদূত সদৃশ লোকটি বিক্রমকে ধমকাচ্ছে, কেন সে আজ এই পথে এল? বলছে, আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখো। তুমি কি জান না এর পরিণতি কী? তুমি কি ভুলে গেছ আজ কী বার?
শান্তনু নিচু গলায় বলল, ও বোধ হয় এ অঞ্চলের একজন গুরু–মাতব্বর। এরা পাহাড়িদের কাছে পুজো পায়। দেবতার মতোই। এমন শুনেছি সেই ডাক্তার দাসের মুখে। সহজে এদের মতো উচ্চস্তরের মানুষের নাকি দেখা পাওয়া যায় না। ‘
তবে এ লোকটা ভালো। সে সাবধান করে কী যেন বলল, অমনি বিক্রম সভয়ে পিছনে তাকিয়ে গাড়িতে উঠে পড়ল। আর আশ্চর্য! বলদের গাড়িটা সামনে তো এগোলই না যেদিক থেকে এসেছিল সেদিকেও গেল না। পাশের ঢাল দিয়ে দ্রুত নামতে লাগল–চাষের ভুই তছনছ করে।
আমরা তো হতবাক! ব্যাপারটা কী হল? কেন মাতব্বরটি সামনে গেল না, কেনই বা ফিরেও গেল না? যেন কোনো কিছুর আভাস পেয়ে ভয়ে তাড়াতাড়ি নেমে গেল!
আমরা যেন নিজেদেরকেই প্রশ্ন করলাম! নিজেরাই উত্তর খুঁজলাম। শেষ পর্যন্ত নিজেরাই মুখ চাওয়াচাওয়ি করে চুপ করে গেলাম।
কেবলই শুনছি স্যাটারডে, স্যাটারডে–ব্যাপারটা কী হে!–গলার স্বর উঁচু করেই জিগ্যেস করলেন বিরূপাক্ষদা।
শান্তনু চাপা গলায় বলল, কিছু একটা ঘটনা আছে, যা আমরা জানি না। জানতে চাই এটাও হয়তো চায় না কেউ। বলে ইশারায় বিক্রমকে দেখিয়ে দিল। তারপর ফিসফিস করে বলল, আমাদের একেবার চুপ করে থাকাই উচিত।
ভয় পেয়ে বিরূপাক্ষদা বললেন, ও বাবা! ফুল দেখতে বেরিয়েও স্পিকটি নট!
হ্যাঁ, অন্তত ‘হিলে’ পৌঁছানো পর্যন্ত।
এমনি সময়ে গুড় গুড় করে কয়েকবার মেঘ ডেকে উঠল। বিদ্যুৎচমকে পাহাড়ের ওপর গাছগুলোকে স্পষ্ট করে দেখিয়ে দিল। তারপরই প্রচণ্ড শব্দে বাজ পড়ল। গগনচুম্বী পাহাড়ের শ্রেণিতে বজ্রপাত দেখেছ তোমরা? না দেখে থাকলে ভালোই। সুন্দরও যে সময়ে সময়ে কত ভয়ংকর হয় তা না দেখলে বুঝতে পারবে না।
বাজের শব্দে বিরূপাক্ষদা ওঁর ভারী শরীরটা নিয়ে প্রায় আধ হাত লাফিয়ে উঠেছিলেন। পড়ে যাচ্ছিলেন, কোনো-রকমে ড্রাইভারের সিটটা আঁকড়ে ধরে সামলে নিলেন। তারপর দু’কান চেপে ধরে জিগ্যেস করলেন, বাজটা কোথায় পড়ল হে? খুব কাছেই মনে হচ্ছে?
শান্তনু আঙুল দিয়ে একটা বিশাল উঁচু পাহাড়ের শৃঙ্গ দেখিয়ে দিল। দেখিয়ে দিল পাহাড়ের ওপর ছোটো ছোটো গাছপালা বাজের আগুনে দাউ দাউ করে জ্বলছে। মনে হচ্ছে যেন পাহাড়টা আগুনের মালা মাথায় জড়িয়ে ম্যাজিক দেখাচ্ছে। দেখতে দেখতেই চোখে পড়ল আগুনের কয়েকটা স্ফুলিঙ্গ পাশের পাহাড়ের গাছে গিয়ে পড়ল। যেন অগ্নিবৃষ্টি করছে।
চমকে উঠলাম সবাই। কী সর্বনাশ! দাবানল হয়ে যাবে নাকি?
হয়নি। রক্ষে, এই সময়ে নামল বৃষ্টি।
আর সঙ্গে সঙ্গে শুরু হল ড্রাইভার বিক্রমের ছটফটানি। গাড়ি চালাতে চালাতেই সে ফিরে ফিরে কাচ লাগানো স্ক্রিন দিয়ে দেখছিল। বৃষ্টি জোরে হচ্ছিল না। তাই বাইরের জিনিস মোটামুটি দেখা যাচ্ছিল।
বিক্রম সেই গাড়িতে ওঠার পর থেকে কেবল আকাশের দিকে তাকাচ্ছিল। এখন তাকাচ্ছে। পিছনের দিকে। কী যেন বারবার দেখার চেষ্টা করছে। ও যেন নিশ্চিত জানে আজ যখন শনিবার আর আকাশ থেকে যখন জল পড়েছে বজ্রপাতের সঙ্গে তখন কিছু একটা দেখা যাবেই। না ভালো নয়–ভালো নয়–মোটেই ভালো নয়। তবু যদি ওর একান্তই আবির্ভাব ঘটে তাহলে আগে থেকেই প্রস্তুত হতে হবে।
হঠাৎ বিক্রম অতিমাত্রায় সতর্ক হয়ে উঠল। ভয়ে তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
শান্তনু চেঁচিয়ে উঠল, এ কী করছ? অ্যাকসিডেন্ট হবে যে!
ও কোনোরকমে অদ্ভুত কায়দায় গাড়ি সামলে বাঁ হাত তুলে পিছনের রাস্তাটা দেখিয়ে দিল। আমরা ঘাড় ঘোরালাম। স্ক্রিনের ভিতর দিয়ে বাইরে তেমন কিছু দেখা গেল না। সেই পাথর ছড়ানো উঁচু-নিচু পথ, পথের একপাশ থেকে মাথা উঁচু করে উঠেছে পাহাড়, অন্য পাশে গভীর গর্ত বা খাদ। তার পিছনে ঘন কুয়াশা। কিন্তু বিক্রম এরই মধ্যে দিয়ে। কিছু দেখতে পেয়েছিল। তাই মুহুর্মুহু তার মুখের ভাব বদলাচ্ছিল।
কই হে, কিছুই তো দেখছি না। অনেক কষ্টে বিরূপাক্ষদা তাঁর দেহভার উত্তোলন করে কোনোরকমে ঘাড়টা ফিরিয়েছিলেন। তারপরেই তিনি যেন চমকে উঠলেন–হ্যাঁ, হা, কী যেন আসছে!
