এক পাহাড় থেকে আর এক পাহাড়। প্রকৃতি যেন খেয়ালের বশে পর পর পাথর, গাছপালা দিয়ে দুর্লঙ্ প্রাচীরের পর প্রাচীর সৃষ্টি করে রেখেছেন। মনে হচ্ছে পাঁচিল টপকালেই অজানা রহস্যময় কোনো জগৎ খুঁজে পাওয়া যাবে।
ওপরে উঠতে উঠতেই দেখা যাচ্ছিল পাহাড়ের ঢালে অনেক নীচে ছোটো ছোটো ঘরবাড়ি। সবুজের পটভূমিতে আঁকা যেন অপরূপ ছবি। কিন্তু–ওগুলো কী?
এত ওপর থেকেও দেখা যাচ্ছি প্রায় প্রত্যেক বাড়ির ওপরে বাঁশে বেঁধে ওড়ানো হয়েছে রঙ-বেরঙের লম্বা কাপড়ের পতাকা। দূর থেকে ভারী সুন্দর লাগছে দেখতে।
আমি বিক্রমকে জিগ্যেস করিনি। (জিগ্যেস করে লাভ নেই। কারণ ও তো কথাই বলছে। )। কিন্তু ওই হঠাৎ উত্তর দিল—’প্রেয়ার ফ্ল্যাগ’। বলেই দু’হাত তুলে কারও উদ্দেশে বার কয়েক নমস্কার করল।
বিরূপাক্ষদা চোখ বন্ধ করেই ছিলেন, এবার চোখ খুললেন। আমাদের দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করলেন, কীসের প্রেয়ার? কার কাছে?
এবার উত্তর দিল শান্তনু। বলল, অশুভ শক্তি তাড়াবার জন্যে নানা জায়গায় বিশেষ করে নির্জন জায়গায় ধর্মপুস্তক থেকে কোনো অমৃত বাণী লিখে লিখে টাঙিয়ে দেয় এখানকার মানুষ। এরা এমন অনেক কিছু বিশ্বাস করে যা আমরা ভাবতে পারি না। ‘অশুভ শক্তি’ মানে বুঝতে পারছেন তো, বিরূপদা?
বিরূপদা উত্তর দিলেন না। মুখ আরও গম্ভীর করে বসে রইলেন।
একটু হেসে শান্তনু বলতে লাগল, কলকাতায় একজন ডাক্তারের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল– ডাঃ দাস। কিছুকাল ভুটানে ছিলেন। সাউদার্ন ভুটানের ডিস্ট্রিক্ট টাউন সরভং। সেখানে সরকারি হাসপাতালে ডাক্তার (M.O) হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি বলতেন এইসব পাহাড়ি অঞ্চলের সাধারণ দরিদ্র মানুষজন ভূতে শুধু বিশ্বাস করাই নয়, প্রচণ্ড ভয় পায়। এরা তাই বাড়ির আনাচে কানাচে লাল-সাদা পতাকায় বুদ্ধের বাণী লিখে টাঙিয়ে দেয়। তাদের বিশ্বাস পতাকাগুলো যত নড়বে বুদ্ধের বাণী ততই অভয়বার্তা নিয়ে ছড়িয়ে পড়বে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে।
বিরূপাক্ষদা হাঁ করে শুনছিলেন। বলে উঠলেন, ও বাবা এখানেও ভূত! তবে কি আমরা ভূতের রাজ্যের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি? কোথাও আর নিস্তার নেই। বলে মাংকিক্যাপের উপর দিয়ে গরম চাদরটা ভালো করে জড়িয়ে নিলেন। যেন কোনো ফাঁক দিয়ে ভূতের নিঃশ্বাসটুকুও ঢুকতে না পারে।
হাসতে হাসতে বললাম, কোনো ভূতের গল্প-টল্প?
শান্তনু বলল, বলেছিলেন বৈকি! একেবারে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে। শুনবে?
বলেই শান্তনু শুরু করল, দাস সাহেবের কোয়ার্টারটি পাহাড়ের ওপর। বেশ সুন্দর। কিন্তু ওখানে থাকতে না থাকতেই ছন্দপতন। রুগি থেকে আরম্ভ করে অন্যান্য ডাক্তাররাও বলতে লাগলেন, দাস সাহেব, একটু সাবধানে চলাফেরা করবেন। সন্ধ্যার পর যেন মোটেই বেরোবেন না। বিশেষ করে পাহাড়তলিতে। জায়গাটা নাকি খারাপ। তারপর একদিন
হঠাৎ বিরূপাক্ষদা রেগেমেগে বলে উঠলেন, জায়গাটা যখন খারাপ বলে জেনেছ তখন ওসব নিয়ে কথা বাড়িয়ে লাভ কী?
শান্তনু হেসে বলল, ভয় পাচ্ছেন নাকি?
বিরূপাক্ষদা বললেন, স্থান-কাল ভেদে সব মানুষই ভয় পায়। ভয়ের কারণ যেখানে থাকে সেখানে তার ভয় না পাওয়াটা স্বাভাবিক নয়।
বললাম, তবে যে বললেন, ‘বৃহৎ শিকারে যেতে চান–হিমালয়ান ব্ল্যাক বিয়ার, রেডপান্ডা, আরো কত সব বৃহৎ জন্তু?
বিরূপাক্ষদা বললেন, ওদের কথা আলাদা। ওদের রক্ত-মাংসের শরীর আছে। বন্দুক ছুড়লে গায়ে লাগে। মরে। আর এরা? নাও আর কথা বাড়িও না। ও বাবা! থাপা সাহেব যে গাড়িটা উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এবারে খাদে ফেলবে আর অশরীরীদের দলে আমাদেরও নাম লেখাবে।
সত্যি বিক্রমের আবার কী হল? জোরে চালাচ্ছিলই, এখন বারবার আকাশের দিকে তাকাচ্ছে আর গাড়ির স্পিড বাড়াচ্ছে। পাহাড়ি রাস্তায় গাড়ি ছুটছে–নুড়িগুলো চাকার ধাক্কায় ছিটকে যাচ্ছে–যেন গুলি বৃষ্টি করছে! কেবলই মনে হচ্ছে এইবার বুঝি গাড়িটা উল্টে গড়িয়ে পড়বে পাশের গভীর গর্তে।
সত্যিই পাহাড়ের আবহাওয়ার মর্জি বোঝা দায়। এই মিষ্টি রোদ–তারপরেই হঠাৎ মেঘলা হয়ে গেল চারিদিক। শুরু হল টিপ টিপ বৃষ্টি। আবার একটু পরেই রোদ্দুর। এইজন্যেই ভ্রমণকারীরা ইংরেজিতে একটা কথা বলে থাকেন, ‘হিমালয়ের আবহাওয়া আনপ্রেডিক্টেবল।
এতক্ষণ দূরে দূরে কারু, র্যাটং, নরসিং প্রভৃতি যে পর্বতশিখরগুলি দেখা যাচ্ছিল হঠাৎ সেগুলো অদৃশ্য হয়ে গেল। চারিদিক থেকে রাশি রাশি ভাসমান তুলোর মতো কী যেন এগিয়ে আসতে লাগল। আমি আতংকিত হয়ে পড়লাম। মনে হতে লাগল একটু পরেই ঐ ভাসমান তুলোর মতো ভয়ংকর জিনিসগুলো গাড়ির মধ্যে ঢুকে আমাদের দম বন্ধ করে মেরে দেবে।
এদিকে থাপা প্রাণপণে এক্সেলারেটারে ক্রমাগত চাপ দিয়েই যাচ্ছে। গাড়ি কখনও হেলতে দুলতে চলেছে–কখনও ঘটাং ঘটাং করে লাফাতে লাফাতে। বিক্রমের চুলগুলো মাথার ওপর খাড়া হয়ে উঠেছে। সে এক ভয়ংকর দৃশ্য।
এইবার বিরূপাক্ষদা হাঁকড়ে উঠলেন, ড্রাইভার, গাড়ি সামলে চালাও। কী পেয়েছে আমাদের? খাঁচায় আটকানো কতকগুলো ইঁদুর। তোমাকে পুলিশে দেব।
বিক্রম উত্তর দেবার দরকার মনে করল না। হঠাৎ ও উইন্ডস্ক্রিনের দিকে ঝুঁকে পড়ে চোখ ছোটো করে কী যেন লক্ষ করতে লাগল। গাড়ির স্পিড কমাতে লাগল। হঠাৎ থাপার এ আবার কী হল? ওর দিকে তাকিয়ে দেখলাম ও কেমন যেন মিইয়ে গেছে। সেই অবস্থাতেই ও চট করে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে একটা দোলানি দিয়ে গাড়িটাকে বাঁ পাশে নিয়ে এল।
