কিন্তু–
সত্যিই তো! বড়ো জোরে চালাচ্ছে গাড়ি। আমরা তো বারণ করেছিলাম। তবু–কিসের এত তাড়া?
ভেবেছিলাম বিরূপাক্ষদা বুঝি ঘুমিয়ে পড়েছেন। কিন্তু না, হঠাৎ তিনি চোখ বুজিয়েই সেই একই কথা নিয়ে বকবক করে চললেন।–পাগল! পাগল না হলে কেউ এই প্রচণ্ড ঠান্ডায় ফুলের বাহার দেখার জন্যে পাহাড়ে পাহাড়ে ছোটে!
বিরূপদা, কিছু বলছেন?
বলব আর কী! তোমাদের পাল্লায় পড়ে এই বয়েসে আমার লাইফ খতম হতে চলেছে।
কিন্তু আপনি তো পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরতে ভালোবাসেন।
হ্যাঁ, এক্সকারশান, অ্যাডভেঞ্চার আমি ছোটবেলা থেকেই ভালোবাসি। তবে তা ফুলের শোভা কিংবা নদীর কুলুকুলু গান শোনার জন্যে নয়। হ্যাঁ, বুঝতাম যদি বৃহৎ শিকারের জন্য কোথাও গেলাম–
‘বৃহৎ শিকার’ জিনিসটা কী, দাদা?
যা নিছক পাখি, খরগোশ মারা নয়। যা লেপার্ড, হিমালিয়ান ব্ল্যাক বিয়ারের পিছু পিছু চেজ করতে করতে গুলি করে মারা।
অবাক হলে গেলাম। চোখের সামনে ভেসে উঠল বহুদিনের পরিচিত তার সেই গোল মুখ, ভারী গাল, মোেটা বেঁটেখাটো, থপথপে চেহারা যা কোনোরকমেই শিকারীর উপযুক্ত নয়।
শান্তনু বলল, কিন্তু আপনি কি জীবনে কোনোদিন বন্দুক ধরেছেন? গুলি ছোঁড়া তো পরের কথা।
এইবার বিরগদা চোখ মেলে তাকালেন, বললেন, আমি বন্দুক ধরতে যাব কেন? হান্টার’দের সঙ্গে থাকব। বাহবা দেব। সেটাও একটা কাজ। ফুটবল খেলায় দেখ না প্লেয়ারদের চেয়ে চেঁচাবার লোক অনেকগুণ বেশি। এও তেমনি।
হান্টার!–হাসলাম আমরা। কথায় জোর দেবার জন্যে বিরূপদা মাঝে মাঝেই প্রচলিত সহজ বাংলার বদলে ইংরিজি বলেন। যেমন একদিন বললেন, ‘নো নো, আমি ওর মধ্যে নেই।’ আর একদিন বললেন, আমার ‘ফাদার’ ছিলেন অহিংস প্রকৃতির মানুষ। ইত্যাদি।
হান্টারদের সঙ্গে থাকলে তো শুধু থাকাই হবে। শিকার করা হবে না।
তা না হোক এনজয় তো করা হবে।
এ যাত্রায় শিকারে যাওয়া হল না। তাহলে?
পারের বার অন্য কিছু ভাবব। তবে কিছুতেই ফুল দেখতে কিংবা পাহাড়ে সূর্য ডোবা দেখতে যাব না। এই দুটো ছাড়া যে কোনো অ্যাডভেঞ্চার করতে–
মানে–যেখানে ভয়-ভয়, গা-ছমছমে কিছু—
বুঝেছি, যেখানে ভয় থাকবে কিন্তু বিপদ থাকবে না। তাই তো?
বিরূপদা যেন ধরা পড়ে গেলেন। দাঁতের ফাঁকে একটু হাসলেন।
হঠাৎ বিক্রম গাড়ির স্পিড কমিয়ে হাত পিছনে ফিরিয়ে সবাইকে কম কথা বলতে ইঙ্গিত করল।
আমরা তো অবাক। এতখানি পথ। রহস্য-রসিকতাও করা চলবে না? কিন্তু কারণ জিগ্যেস করতে ভরসা পেলাম না। গাড়িতে উঠে পর্যন্ত যা গম্ভীর হয়ে আছে! গম্ভীর হয়ে থাকাই কি বিক্রম থাপার স্বভাব, না কোনো বিপদের আশঙ্কা করছে ও! ঈশ্বর জানেন!
আমরা এখন আরও ওপরে উঠে এসেছি। রংগীত নদীর তীরে জায়গাটার নাম জোরথাং। দক্ষিণ সিকিমের একটি বড়ো ব্যবসাকেন্দ্র।
জায়গাটা ভালোই মনে হল। ঠিক করলাম এখানে নেমে কিছু খেয়ে নেওয়া যাক। কারণ পথে কোথাও এরকম জায়গা পাওয়া যাবে কি না কে জানে! গাড়ি থেকে নেমে একটা মোটামুটি রেস্টুরেন্ট গোছের চায়ের দোকান পাওয়া গেল। আমরা চারটে চেয়ার টেনে নিয়ে বসলাম।
বিক্রম থাপা কিন্তু এখনও কোনো কথা বলছে না। একপাশে বসে খেতে খেতে কেবলই আকাশের দিকে তাকাচ্ছে।
আশ্চর্য! কী আছে আকাশে? এমন রৌদ্রোজ্জ্বল বেলা এগারোটায়?
হঠাৎ এই সময়ে বিক্রম এক কাণ্ড ঘটিয়ে বসল।
ও যেখানে বসেছিল তার সামনেই হাত দু-একের ব্যবধানে হোটেলের ম্যানেজারের টেবিল। টেবিলে একটা প্লেটে কিছু মশলা, ক্লিপ করা কতকগুলো ফর্দ আর সরু একটা খাতা। আর একটা ডেস্ক-ক্যালেন্ডার! ড্রয়ারটা খোলা। এইমাত্র একজন খদ্দের পয়সা দিয়ে গেল। ড্রয়ারটা খুলে রেখেই ম্যানেজার কিচেনে ঢুকলেন বোধহয় তদারকি করতে। বিক্রম তার চেয়ার থেকে বডিটা তুলে এক মুহূর্তের জন্যে হাত বাড়াল। তার পরেই হাত গুটিয়ে চুপচাপ নিজের চেয়ারে বসে কফির পেয়ালায় চুমুক দিল।
কিছু বোঝবার আগেই বিরূপদা নিঃশব্দে আমার গায়ে আঙুলের খোঁচা দিলেন। চাপা গলায় বললেন, দেখলে আমাদের গুণধর মৌনীবাবা বিক্রমের খেলা? কিছু একটা হাতসাফাই করল।
শান্তনু সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, কিছুই হাতসাফাই করেনি। ডেস্ক-ক্যালেন্ডারের বড়ো বড়ো অক্ষরে ছাপা SATURDAY কথাটা উল্টে দিয়ে চোখের আড়াল করে দিল।
কেন?
শান্তনু যথাসম্ভব নিচু গলায় বলল, তা বলতে পারব না। হয়তো ঐ কথাটায় ওর এলার্জি হয়। বলে হাসল।
এ আবার কী রহস্য রে বাবা! গজগজ করে উঠলেন বিরূপাক্ষদা।
.
০২.
চা আর টুকটাক কিছু খেয়ে নিয়ে আমরা একঘণ্টার মধ্যে গাড়িতে গিয়ে বসলাম। পেটে খিদে ছিল। কিন্তু বিরূপাক্ষদা বারবার সাবধান করে দিয়েছিলেন, ভারী কিছু খাবে না ভায়ারা। পথে-ঘাটে হালকা খাওয়াই উচিত।
তার এই সাবধানবাণীটা শিরোধার্য করে নিয়েছিলাম আমরা।
গাড়িতে উঠেই বিক্রম স্টার্ট করে দিল। তার যেন একমুহূর্ত বিলম্ব সহ্য হচ্ছিল না। কীসের যে এত তাড়া বুঝতে পারছিলাম না। পাহাড়ের গা বেয়ে নুড়ি বিছানো আঁকাবাঁকা পথ ক্রমশ উঠে গেছে ওপরের দিকে। এই ভেবে আশ্চর্য হই যে, পাহাড়-জঙ্গল ঘেরা এই দুর্গম জায়গায় কে তৈরি করেছিল এই পথ! কী করে তারা জেনেছিলেন এই পথের শেষ ঠিকানা কোথায়? সত্যি, ভাবতে গিয়ে অবাক হয়ে যাই।
