অনেক অনুরোধে গ্যারাজের মালিক আমাদের আড়ালে বিক্রমকে বোঝাতে লাগলেন। একটু পরে ফিরে এসে বললেন, এক কাজ করুন। আপনাদের তো উদ্দেশ্য এই সময়ে পাহাড়ের ফুলের শোভা দেখা। তাহলে ‘সোমবারিয়া’, ‘হিলে’ হয়ে ‘বার্সে’ না গিয়ে জোংরি হয়ে ইয়ম পর্যন্ত গাড়িতে যান। তারপর কিছুটা হাঁটা পথ। এই পথ দিয়ে যেতে সব ড্রাইভার রাজি। এখানেও প্রকৃতির অফুরন্ত শোভা। যে দিকেই তাকাবেন দেখবেন সবুজের সমারোহ। এত সবুজ সমতল কোথাও নেই।
শান্তনু ঠোঁটের ফাঁকে হেসে ববল, সবই তো ঠিক। কিন্তু আসল কথাটাই চেপে গেলেন। ঐ যে বললেন ‘কিছুটা পথ’–সেটা কি সঠিক জানেন কতটা?
মালিক মুখ কাচুমাচু করে বললেন, না, ঠিক জানি না, তবে–
তবে-টবে নয়, আমি জানি পাক্কা ছাব্বিশ কিলোমিটার পথ হাঁটতে হবে। আর সে পথ জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে। রীতিমত নির্জন।
মালিক লজ্জিত হয়ে বললেন–তা হবে।
শান্তনু বলল, শুনুন, আমরা বুঝতে পারছি না কোনো ড্রাইভার ঐ পথ দিয়ে যেতে চাইছে না কেন। তবে ঐ পথ দিয়েই আমরা ‘বার্সে’ যাব। আমাদের যেমন প্রোগ্রাম করা আছে তেমনিই থাকবে। দেখি তাহলে অন্য কোনো গাড়ি পাওয়া যায় কিনা।
আমরা ফিরে যাবার জন্যে উঠতেই মালিক বললেন, দাঁড়ান, আর একবার কথা বলে দেখি। আবার কথা বলতে উঠলেন। এরপর কাজ হল।
বিক্রম থাপা রাজি। তবে সন্ধের আগেই বার্সের অনেক আগে ‘হিলে’ পৌঁছাতে চায়। তার বেশি যাবে না।
শান্তনু বলল, পাহাড়ে রাস্তায় এমনিতেই তো সন্ধের সময় গাড়ি চালানো নিষেধ।
বিক্রম বলল, তা তো সকলেরই জানা, আমি বলছি পথে কোথাও হল্ট করা চলবে না। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ‘হিলে পৌঁছতে হবে।
বেশ, তাই হবে।
আর একটা কথা, স্যার। পথে যদি কেউ এমনকি পুলিশও গাড়ি দাঁড় করিয়ে ন্যাকামি করে জিগ্যেস করে আজ কী বার? বলবেন, সরি, খেয়াল নেই। কিছুতেই যেন বলে ফেলবেন না–আজ শনিবার! প্লিজ স্যার, একথাটা মনে রাখবেন।
জিগ্যেস করলাম, কেন?
আমাকে থামিয়ে দিয়ে শান্তনু বিক্রমকে বলল, ঠিক আছে। রাজি।
থ্যাঙ্ক ইউ, স্যার! বলে বিক্রম এবার চটপট গাড়িতে উঠে স্টার্ট দিল।
নিচু গলায় বললাম, হঠাৎ বার নিয়ে লুকোচুরি?
ফিসফিস করে শান্তনু বলল, এসব অঞ্চলে কত রকমের কুসংস্কার।
এই সময়ে বিরূপাক্ষদা বিরক্ত হয়ে বলে উঠলেন, সবই কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দিলে হবে না, ভায়া। আমাদের যাত্রাটাই অপয়া। আমি তো গোড়া থেকেই বলছি, ফুল দেখতে হিমালয়ে! এমন কথা কে কবে কস্মিনকালে শুনেছে! তাও গরমকালে নয়, মার্চ মাসের গোড়ায়! মার্চ মাস তো ওখানে ভরা শীতের সময়। জানলার কাচটা ভালো করে ফেলে দাও না। শীতে মলাম যে!
বললাম, কাচ তো ফেলাই আছে।
তা হলে ঠান্ডা ঢুকছে কোথা দিয়ে?
কাচের শার্সিটা ঠিকমতো লাগেনি বলে শান্তনু খানিকটা কাগজ গুঁজে দিয়ে বাতাস আটকে দিল।
কী ঝকমারি রে বাবা! ফুল দেখতে পাহাড়ে! কেন আমাদের দেশে কি ফুল নেই? গোলাপ, বেল, জুই, গাঁদা, রজনীগন্ধা, টগর, ডালিয়া–
শান্তনু রাগাবার জন্য বলল, কিন্তু ম্যাগনোলিয়া, ম্যাপল, পাইন, ওক, ফার, আরও কত কী!
বললাম, আসল নামটাই তো বললে না—’রডোড্রেনড্রন’?
ওটা না দেখলে বোঝানো যাবে না।
বিরূপাক্ষদা এসব কথা বুঝতে চান না। তিনি যেন কোনো ভালো প্রস্তাবেও প্রথম থেকে বিরূপ। উৎসাহ করে কোনো প্রস্তাব দিলে উনি প্রথমেই বলে উঠবেন, ‘পাগলের প্রলাপ। তাই আমরা ওঁকে ‘বিরূপাক্ষ’র বদলে ‘বিরূপ’দা বলে ডাকি। ভালো কথাতেও উনি বিরূপ। অন্তত প্রথমটা। তবু কোনো দূরপথে যেতে গেলে ওঁকে না পেলে যেন মন ভরে না। ঐ যে ওঁর মাংকিক্যাপ, ঐ যে মাংকিক্যাপের উপর দিয়ে মাফলারটা ভালো করে জড়ানো, ঐ যে গলার সবচেয়ে ওপরের বোতামটাও আটকানো, ঐ যে হাঁটুর নীচ পর্যন্ত ঝুল সেকেলে অলেস্টার–এমন অদ্ভুত পোশাকে মোড়া মানুষের যেন তুলনা নেই। তিনি সাধারণত ধুতি পরেন। প্যান্ট পরার অভ্যাস নেই, কিন্তু যেহেতু পর্বত আরোহণ করতে চলেছেন, অতএব তাকে ফুল প্যান্ট পরতেই হয়েছে। কথায় বলে, ‘অনভ্যাসের ফোঁটা কপাল চচ্চড়’–তারও সেই দশা। প্যান্ট তার পেট থেকে নেমে নেমে যাচ্ছে–ঢলঢল করছে। আর উনি প্রতিনিয়তই থাক সে কথা।
এঁকে না হলে যেমন আমাদের চলে না তেমনি আমাদের না হলে ওঁরও চলে না। আসলে তিনি নিজেও ভ্রমণ করতে ভালোবাসেন। তা বলে তার সমবয়সীদের সঙ্গে নয়, আমাদের মতো ছোকরাদের সঙ্গে।
শিলিগুড়ি ছাড়িয়ে গাড়ি ক্রমশই ওপরে উঠছে। আবার তিস্তা। টানা দেখা দেয় না। মাঝে মাঝে অন্তর্ধান করে। আবার ক্ষণেকের জন্যে দেখা মেলে। এ যেন লুকোচুরি খেলা। একটু পরে পাওয়া গেল রংগীতকে। যেন তিস্তার সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে। দূরে ঢেউ খেলানো পাহাড়ের সারি। উইন্ডস্ক্রিনের মধ্যে দিয়ে দেখছি। প্রকৃতির এই রূপ তো শস্যশ্যামল সমতলদেশে মেলে না।
ও বিরূপদা, আপনি ঢুলছেন!
বিরূপাক্ষদা অর্ধনিমীলিত চোখে একবার তাকালেন–ঢুলব না তো কী করব? তোমাদের মতো শুধু পাহাড় আর খাদ দেখব? কী দেখবার আছে? বলেই মাংকিক্যাপটা ঠিক করে আবার চোখ বুজলেন। চোখ বুজিয়েই বললেন, ও ড্রাইভার-ভায়া, চায়ের দোকান দেখলে একটু থামিও। তুমি যে পক্ষীরাজ ঘোড়া ছোটাচ্ছ!
বিক্রম থাপা উত্তর দিল না।
বললাম, এখানে চায়ের দোকান নেই, বিরূপদা। আপনি ঘুমোন।
