রাজু মুখে একরকম অদ্ভুত শব্দ করতে করতে ক্রমশ আমার দিকে এগিয়ে আসছে। ওর দুটো হাত তখন আমার গলার কাছে। আমি নিজের দুহাত দিয়ে ওর সরু সরু হাত দুটো চেপে ধরতে গেলাম কিন্তু বরফের ছুরির মতো ওর হাত দুটো আমার হাত অবশ করে দিল। আমি শেষবারের মতো চিৎকার করে উঠলাম বাঁচাও।
কাকে উদ্দেশ করে চেঁচালাম তা জানি না, তবে সাড়া পেলাম তখনি।
সুশান্ত, তুমি কোথায়, বড্ড অন্ধকার!
চমকে উঠলাম! এ যে প্রণবেশের গলা!
আমি দ্বিগুণ জোরে আবার চেঁচিয়ে উঠলাম–বাঁচাও!
সঙ্গে সঙ্গে নিচে থেকে জোরালো টর্চের আলো এসে পড়ল সিঁড়ির ওপর।
–এ কী! সুশান্ত! তুমি এখানে দাঁড়িয়ে? কি হয়েছে?
হঠাৎ জ্বলন্ত চোখ দুটো নিভে গেল। টর্চের আলোয় রাজুকে পরিষ্কার দেখা গেল। রাজু আমাকে আর প্রণবেশকে ধাক্কা দিয়ে বিরাট এক লাফ মেরে নিচে নেমে অদৃশ্য হয়ে গেল।
.
শেষ কথা
রাজু সুব্বাকে নিয়ে এই অলৌকিক কাহিনিও আমার ডায়রিতে লিখে রেখেছি। তবে শেষটুকু লেখা হয়নি।
পরের দিনই সবাই ফিরে এল। সকলেই আমার এ কদিনের ঘটনা শুনল। ছোটো ভাইয়ের স্ত্রী বলল–আমি তখনই বুঝেছিলাম ও ছেলেটা মানুষ নয়, সাংঘাতিক কিছু। যাক, খুব বেঁচে গেছেন।
আমার স্ত্রী তখনো ভয়ে নির্বাক।
তখনও তিনদিন ছুটি বাকি ছিল। ভেবেছিলাম প্রণবেশকে নিয়ে এই তিনটে দিন এখানেই কাটিয়ে যাব। কিন্তু সন্ধেবেলায় সেই ছেলেটা এসে খবর দিল–সাধু আজও এসে বসেছে। এবার বাড়ির আরও কাছে।
শুনে সবারই মুখ শুকিয়ে গেল। এ কি আমায় শেষ না করে এখান থেকে যাবে না?
সেদিনই আমার স্ত্রী সুটকেস গুছিয়ে নিলেন। বললেন–আর নয়। কাল ভোরের ট্রেনেই কলকাতায় ফিরে চলল। ওসব পাহাড়ে তান্ত্রিকদের হাত থেকে সহজে নিস্তার পাওয়া যায় না।
ভয়ে ভয়ে ভোরবেলাতেই একরকম পালিয়ে এলাম বলা চলে। যথাসময়ে ট্রেন এল। তাড়াতাড়ি সামনে যে বগি পেলাম তাতেই উঠে পড়লাম।
গার্ড হুইশল দিল। সবুজ ফ্ল্যাগ দুলে উঠল।
হঠাৎ নোটন চেঁচিয়ে উঠল–বাবা, দ্যাখো দ্যাখো সুব্বা!
জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখি একটা কংকাল যেন অস্বাভাবিক জোর ছুটে আসছে ট্রেন ধরার জন্যে। অন্তত পিছনের বগিতেও যদি উঠতে পারে। কিন্তু তখনই ট্রেন চলতে শুরু করে প্ল্যাটফর্ম ছাড়িয়ে গেল। রাজু অল্পের জন্যে ট্রেনের নাগাল পেল না।
.
প্রণবেশ বলল–সুব্বা তোমাকে ছাড়বে না দেখছি।
নিরাপদে কলকাতায় পৌঁছেছি। কিন্তু এখনও সুস্থির হতে পারিনি। কি জানি রাজু আবার এখানেও এসে না পড়ে।
[শারদীয়া ১৩৯৭]
আতংক যখন হিলিতে
০১.
পাহাড়ি রাস্তায় হাজার ঝুঁকি নিয়ে গাড়ি চালাতে হয়। খুব অভিজ্ঞ ড্রাইভার না নিলে বিপদের সম্ভাবনা। তা আমাদের ড্রাইভার বিক্রম থাপা ভালোই গাড়ি চালাচ্ছে। ‘শার্প কার্ড’ এর মতো বিপদসংকুল জায়গাগুলোও গোঁয়ার ড্রাইভারের মতো ফুল স্পিডে না চালিয়ে স্পিড কমিয়ে খুব সাবধানে চালায়। এতে আমরা খুশি। শিলিগুড়ি থেকে ওঠার সময় থেকেই আমরা ওকে বলেছি–তাড়াহুড়োর কিছু নেই। আমরা স্রেফ বেড়াতে বেরিয়েছি। এই সময়ে পাহাড়ে ফুলের শোভা বিশেষ করে রডোড্রেনড্রনের সমারোহ দেখবার মতো।
বিক্রমের অবশ্য এসব কথায় কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই, নিজের ইচ্ছেমতো যেমন স্পিডে গাড়ি চালাচ্ছিল তেমনি চালিয়ে যেতে লাগল।
গাড়িটা আমরা ভাড়া করেছিলাম শিলিগুড়ি থেকে। আমরা বার্সে যাব শুনে গ্যারেজের মালিক একটু চুপ করে ছিলেন। শান্তনু জিগ্যেস করেছিল–কী ভাবছেন? কোনো অসুবিধে আছে?
গ্যারেজের মালিক বলেছিলেন–আর কিছু নয়, অত উঁচুতে—
উঁচু আর এমন কী? ৯০০০ ফুট।
মালিক হেসে বলেছিলেন–হিলেই তো ৯০০০ ফুট। তারপর চার কিলোমিটার ঢাল। গাড়ি যাবে না। হাঁটতে পারবেন তো?
শান্তনু মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, হ্যাঁ হ্যাঁ, খুব পারব।
ওখানে ভালো হোটেল-টোটেল আছে তো? মানে বেশ আরামদায়ক। মাংকিক্যাপ থেকে শুধু ঠোঁট দুটি বার করে প্রশ্ন করেছিলেন বিরূপাক্ষদা।
হোটেল? পাশের দুজন ড্রাইভার শ্রেণির লোকের দিকে তাকিয়ে হাসলেন গ্যারেজের মালিক।
হোটেলের আশা করে যাবেন না, স্যার। পথে সরাইখানা যদি দু-একটা পান তাহলে ভাগ্য বলতে হবে।
তা হলে শান্তনুভায়া, আমি ফিরে চললাম।
সে আবার কী? আপনারই উৎসাহে–
হ্যাঁ, পাহাড়ে সমতলে বেড়াতে ভালোবাসি বলে এই দুর্ধর্ষ শীতে হোটেল পাব না! নিউমোনিয়ায় পৈত্রিক প্রাণটা এই পাহাড়ের রাজ্যে হারাব নাকি?
অবস্থা বুঝে গ্যারেজের মালিক ভরসা দিয়ে বললেন-হোটেল নিশ্চয় পাবেন তবে বার্সেতে নয়। বার্সেতে পৌঁছাবার আগেই। সেখানেই রাতটা আরাম করে কাটিয়ে পরের দিন সকালে ফের রওনা দিয়ে বার্সেতে পৌঁছে যাবেন।
এ কথায় বিরপাক্ষদা তখনকার মতো শান্ত হলেও ড্রাইভারকে নিয়ে ঘটল বিপত্তি।
ভালো ড্রাইভারের কথা বলতে গ্যারেজের মালিক বিক্রমকে দেখিয়ে দিলেন। কিন্তু বিক্রম গোড়া থেকে সেই যে মুখ ফিরিয়ে বসেছিল তখনও তেমনি রইল।
কি রে যাবি? জিগ্যেস করলেন মালিক।
বিক্রম মাথা নাড়ল। যাবে না।
কেন?
তার উত্তরে ইনিয়ে-বিনিয়ে অনেক কথা বলল যা থেকে বোঝা গেল ও যেতে চায় না এটাই আসল কথা।
তারপর আমরা বেশি টাকার লোভ দেখালেও ও যখন যেতে রাজি হল না তখন আমরা মুশকিলে পড়লাম। কেন যাবে না তার কারণ কিছুই বোঝা গেল না। শুধু বিক্রমই নয়, সংক্রামক ব্যাধির মতো ‘না’ কথাটা ছড়িয়ে গেল সব ড্রাইভারের মুখে।
