এই মেলা উপলক্ষ করে পাশাপাশি গ্রাম-গঞ্জ থেকে বহু লোক আসে। কাছেই বিরাট একটা দীঘি। সেখানে স্নান করে সবাই জোড়া বটতলায় পুজো দেয়। সেদিন সবাই দীঘির পাড়েই রাঁধাবাড়া করে খায়। মেলায় নাগরদোলা, সার্কাস, ম্যাজিক থেকে শুরু করে বাদামভাজা, পাঁপড়ভাজা সবই থাকে। মিষ্টির দোকানের তো ছড়াছড়ি। সবচেয়ে আকর্ষণের ব্যাপার এই মেলায় দূর-দূরান্তর থেকে দুর্গম পথ পেরিয়ে সাধু-সন্ন্যাসীরা আসেন। ভস্মমাখা দেহে, কপনিমাত্র পরে তারা ধুনি জ্বালিয়ে সারা রাত ধ্যান করেন। মাঝে মাঝে নাগা সন্ন্যাসীদেরও দেখা যায়। শোনা যায় তারা হিমালয় থেকে নেমে আসেন।
এইসব ভিড়ভাট্টা মেলা, ঠাকুর পুজো, সাধুদর্শন আমার ভালো লাগে না। আমি পুলিশ অফিসার। আগেই বলেছি আমরা সন্দিগ্ধ স্বভাবের। পুলিশের কাজ করতে করতে মনের কোমল বৃত্তিগুলো, ভাবাবেগ সব নষ্ট হয়ে গেছে। এখন সবকিছুই হাস্যকর বলে মনে হয়। কিন্তু আমার স্ত্রীর আবার উল্টো। তিনি বাচ্চা ছেলেদের মতো মেলা দেখতে ভালোবাসেন। পুজো না দিলে তার তৃপ্তি নেই। সাধু-সন্ন্যাসী পেলেই তাদের পায়ে আছড়ে পড়েন।
এখানে মেলা বসছে শুনে স্ত্রী বললেন, আমি যাব।
বললাম, যাও। দয়া করে সঙ্গে আমায় যেতে বোলো না।
স্ত্রী হেসে বললেন, তোমাকে দরকার নেই। আমি নোটন আর সুব্বাকে নিয়ে যাব।
–সেই ভালো, বলে লেখায় মন দিলাম। একটু পরে গৃহিণী ফিরে এসে বললেন, সুব্বা যেতে চাচ্ছে না।
বললাম, না গেল তো নাই গেল।
বাঃ! ছেলেটা এখানকার মেলা দেখেনি। দেখবে না?
বললাম, তার যেতে ইচ্ছে না করলে কি করবে?
স্ত্রী বললেন, তুমি একটু বল না।
বিরক্ত হয়ে বললাম, ওকে আমি কিছু বলতে পারব না।
অগত্যা গৃহিণী বিমর্ষ মুখে চলে গেলেন।
হঠাৎই আমার মনে হলো–রাজু যেতে চাইল না কেন? বাড়িতে এখন ওর এমন কী রাজকার্য আছে?
বিকেলে গৃহিণী ফিরে এসে ঘটা করে মেলা দেখার কথা বললেন। অনেক সাধু-সন্ন্যাসী দেখেছেন। গুনে গুনে পঞ্চাশ জন সাধুর পায়ের ধুলো নিয়েছেন। খুব ভালো লেগেছে। পরে হঠাৎ গলার স্বর খাটো করে বললেন, সুব্বা তো যাব না বলল। কিন্তু ও গিয়েছিল। আমি ওকে দেখেছি। কিন্তু ও আমাকে দেখেও এড়িয়ে গেল।
এর উত্তর আমি আর কী দেব? চুপ করে রইলাম। শুধু বললাম, ও বড়ো পাকা ছেলে। দিন দিন বেয়াড়া হয়ে উঠছে।
গৃহিণী আর কিছু বললেন না। চলে গেলেন।
মেজো, ছোটো ভাইরা কেউ নেই। বাড়িটা বড্ড খালি-খালি লাগছে। কলকাতায় দুখানা মাত্র ঘরে আমার সঙ্গে শুধু নোটন আর নোটনের মা থাকে। মাত্র তিনজন। সে একরকম সয়ে গিয়েছে। কিন্তু এখানে এত বড়ো বাড়িতে মাত্র আমরা তিনজন আর হতচ্ছাড়া ঐ রাজুটা মোট চারজন। বড় ফাঁকা লাগে। এই সময়ে প্রণবেশ যদি এসে পড়ত তাহলে খুব ভালো হতো। বলেও ছিল–আসবে। কিন্তু এল কই?
সেদিন বিকেলে ছাদে পায়চারি করছিলাম। সূর্য ডুবে গেছে। কিন্তু অন্ধকার হয়নি। হঠাৎ বাড়ির পিছনের জঙ্গল থেকে এক ঝাক পাখির ভয়ার্ত চেঁচামেচি শুনে চমকে উঠলাম। পাখিগুলো অমন করে চেঁচাচ্ছে কেন দেখবার জন্যে ছাদের ঐ দিকে গিয়ে দাঁড়ালাম।
আমাদের বাড়ির পিছন দিয়ে একটা সরু ধুলোভরা রাস্তা এঁকেবেঁকে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে সেই দীঘির দিকে গেছে। পাঁচিলের কাছে গিয়ে দেখলাম রাজু ঐ রাস্তা দিয়ে খুব তাড়াতাড়ি যাচ্ছে। আর গাছে গাছে যত পাখি ছিল, সব ওর মাথার ওপর গোল হয়ে ঘুরছে আর কিচমিচ্ করছে। রাজু কিন্তু সেদিকে তাকাচ্ছে না। হনহন্ করে হেঁটে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে গেল।
আমি অবাক হলাম। এই ভর-সন্ধেবেলা রাজু জঙ্গলের মধ্যে গেল কেন? কেনই বা পাখিগুলো অমন করে আর্তস্বর চিৎকার করছিল? অনেক ভেবেও কোনো জুৎসই উত্তর খুঁজে পেলাম না।
নিচে নেমে এসে স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলাম, রাজুকে কোথাও পাঠিয়েছ?
স্ত্রী বললেন, না তো।
বললাম, তাহলে ওকে জঙ্গলে ঢুকতে দেখলাম কেন?
স্ত্রী অবাক হয়ে বললেন, জঙ্গলে! জঙ্গলে কেন যাবে?
–সেটাই তো আমার প্রশ্ন। আর ও যখন ঐদিকে যাচ্ছিল তখন এক ঝাঁক পাখি ওর মাথার ওপর উড়ছিল আর চিৎকার করছিল।
-কী যে বল!
–ঠিক আছে। ও এলে আমার সঙ্গে দেখা করতে বোলো।
–ও তো বাড়িতেই ছিল। দাঁড়াও দেখছি। বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। পাঁচ মিনিটের মধ্যে রাজুকে নিয়ে ফিরে এলেন, এই তো। এখানেই রয়েছে।
আমি অবাক। দশ মিনিট আগে ছাদ থেকে ওকে আমি স্বচক্ষে জঙ্গলে ঢুকতে দেখেছি। এর মধ্যে কখন ফিরে এল? তবে কি আমি ভুল দেখলাম? এতখানি ভুল হওয়া কি সম্ভব?
তবু জিজ্ঞেস করলাম, তুই কোথায় ছিলি?
ও ভাঙা হিন্দিতে বলল, আমার ঘরে।
–তুই পেছনের রাস্তা দিয়ে জঙ্গলের দিকে যাসনি?
ও খুব সংক্ষেপে রুক্ষ গলায় বলল, নেহি।
আমার বেজায় রাগ হলো। আর সঙ্গে সঙ্গেই রাগ প্রকাশের ছুতোও খুঁজে পেলাম। বললাম, সেদিন তোর মাইজি ওদের সঙ্গে মেলায় যেতে বলল। তুই বললি যাবি না। কিন্তু লুকিয়ে লুকিয়ে একা গিয়েছিলি। অথচ সেকথা বলিসনি। কেন? কেন একা একা মেলায় গিয়েছিলি?
ও আগের মতোই ঘাড় শক্ত করে শুধু বলল, নেহি।
আমার স্ত্রী চেঁচিয়ে উঠে বললেন, তুই তো আচ্ছা মিথ্যেবাদী! আমি নিজে চোখে দেখলাম যেখানে সাধুরা বসেছিল সেখানে ঘুরছিলি। আর বলছিস কিনা–
ও ফের ঘাড় নাড়ল–নেহি।
