বলে চলে যাচ্ছিল, ফিরে দাঁড়িয়ে বলল, এ কথা আর কাউকে না বলাই ভালো। ভয় পাবে। শুধু আপনি একটু সাবধানে থাকবেন। বলেই চলে গেল।
এই একটা নতুন ভাবনা শুরু হলো। সুব্বা কি সত্যিই আমায় মেরে ফেলতে চায়? কিন্তু কেন? ওকে সেদিন মেরেছিলাম বলে? ওর এত বড়ো সাহস হবে বাড়িতে এত জনের মধ্যে আমায় মারার? তা হতে পারে না। ও হয়তো সেদিনের মতো ভয় দেখাতেই এসেছিল। ছোটো বৌমা দেখে ফেলায় ধরা পড়ে গেছে।
এর ঠিক তিন দিন পরে ছোটো ভাইয়ের কাছে চিঠি এল, সামনের সপ্তাহে ছোটো বৌমার বোনের বিয়ের দিন হঠাৎ ঠিক হয়েছে। দিন দশেকের জন্যে ওরা যেন চলে আসে।
ছোটো বৌমা মহা আনন্দে ছোটো ভাইয়ের সঙ্গে বাপের বাড়ি চলে গেল। যাবার সময়ে আমায় গম্ভীর মুখে বলে গেল রাজুকে তো সরাবেন না। ওর কাছ থেকে সাবধানে থাকবেন।
আমিও চাই রাজুকে সরিয়ে দিতে। কিন্তু সরাবার তো স্পষ্ট কারণ থাকা চাই। তা ছাড়া ও যাবে কোথায়? নেপালের সেই কাঠমাণ্ডুতে? ওখানে কি ও একা যেতে পারে? তা হলে ওকে একা কোথায় তাড়িয়ে দেব?
ছোটো বৌমা আমায় সাবধানে থাকতে বলল। কিন্তু নিজের বাড়িতে সবার মাঝখানে কী এমন সাবধান হতে পারি?
.
আরও কাণ্ড
সেদিন আবার একটা কাণ্ড হলো।
দুপুরবেলা। আমি আমার ঘরে একা বিছানায় বসে লিখছি। মাথার ওপর পাখা ঘুরছে। হঠাৎ মনে হলো ফ্যানের হাওয়াটা কিরকম এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। একভাবে গায়ে লাগছে না। তাকিয়ে দেখি পাখাটা এদিক থেকে ওদিকে দুলছে।
অবাক হলাম। এ আবার কি! ফ্যানটা এমন দুলছে কেন? ভাবলাম নিশ্চয় ভূমিকম্প হচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে উঠে ঘর থেকে বেরিয়ে ভূমিকম্পের কথা জানাতে গেলাম। আর ঠিক তখনই পাখাটা ভীষণ শব্দ করে আমার বিছানার ওপর খুলে পড়ল সেই শব্দে সবাই ছুটে এল আমার ঘরে। সবাই বলল, খুব ভাগ্যের জোরে বেঁচে গেছি। কিন্তু আর কারো ঘরে পাখা এতটুকু দোলেনি। সবাই খুব আশ্চর্য হয়ে গেল।
আমি লক্ষ করলাম সবাই ছুটে এসেছে। আসেনি শুধু রাজু।
কী মনে হলো জিজ্ঞেস করলাম, সুব্বা কোথায়?
কেউ বলতে পারল না। আমি তখনই ছাদে উঠে গেলাম। দেখি হতভাগা সরু পাঁচিলের ওপর হাঁটতে হাঁটতে পেয়ারা খাচ্ছে। পেয়ারা তো সব ছেলেই খায়। কিন্তু ও গোটা পেয়ারাটা মুখে পুরে ছাগলের মতো চিবোচ্ছে। আর সারা মুখে পেয়ারার বিচিগুলো বিচ্ছিরিভাবে লেগে রয়েছে।
–এখানে কি করছ? মেজাজ গরম করেই ওকে জিজ্ঞেস করলাম।
ও কোনো উত্তর না দিয়ে পাঁচিল থেকে নেমে বাঁদরের মতো ছাদের ওপর লাফাতে লাফাতে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেল।
ইলেকট্রিক মিস্ত্রি ডাকা হলো। সে তো দেখে অবাক। বলল, যে আঁকশিতে পাখাটা ঝুলছিল সেটা ঠিকই আছে। পাখাও খারাপ হয়নি। তা হলে পড়ল কি করে?
পড়ল কী করে সে কথা আলাদা। আমার কিন্তু মনে হলো আমাকে মারবার জন্যেই যেন কোনো অদৃশ্য শক্তি একাজ করেছিল। আমার কোনো শুভ শক্তি আমাকে এ যাত্রাতেও বাঁচিয়ে দিল।
.
ছোটো ভাইরা ছেলেমেয়ে নিয়ে চলে গেলে বাড়িটা অনেকখানি ফাঁকা হয়ে গেল। ওদের জন্যে হঠাৎ মন কেমন করতে লাগল। মনে হলো ওরা না গেলেই ভালো হতো। আর তো মাত্র সপ্তাহ দুয়েক আছি। সবাই একসঙ্গে থাকলে ভালোই লাগত। বিশেষ করে ছোটো ভাইয়ের স্ত্রী ঐ যে আমায় চুপি চুপি সাবধানে থাকার কথা বলে গিয়েছিল, সে কথা মনে করে আমার অস্বস্তি হতে লাগল। যাক, কদিন পরেই তো ওরা আসছে। তা ছাড়া বাড়িতে আমার স্ত্রী, নোটন ছাড়াও মেজো ভাই, মেজো ভাইয়ের স্ত্রী রয়েছে। কাজেই আমার কোনো অসুবিধা নেই।
সুব্বা বড়ো একটা এদিকে আসে না। আমার ঘরের সামনের বারান্দা দিয়ে যখন যায় তখন একবার ঘাড় ঘুরিয়ে এমনভাবে আমাকে দেখে যেন আমি ওর দুচক্ষের বিষ। আমার মনেও একটা পৈশাচিক ভাবের উদয় হয়। ইচ্ছে করে ওর সরু গলাটা টিপে ধরি।
মাত্র দুদিন পরেই মেজো বৌমার বাপের বাড়ি থেকে জরুরি খবর এল–ওর বাপের বাড়ির জমিজমা ভাগ হচ্ছে। সেইজন্যে কয়েক দিনের জন্যে মেজো বৌমাকে যেতে হবে। পরের দিনই মেজো ভাই, মেজো বৌমা ছেলেমেয়ে নিয়ে চলে গেল। যাবার সময়ে মেজো বৌমা হেসে বলে গেল, দিদি তো রইলেন। আপনার অসুবিধে হবে না এক সপ্তাহের মধ্যেই চলে আসব।
যাক মেজো ভাইরাও চলে গেল। এত বড়ো বাড়িটা এখন যেন আমায় গিলতে আসছে। এখন শুধু আমার স্ত্রী আর নোটন। রাজু তো দিব্যি বহাল তবিয়তে আছেই।
ওরা না থাকায় আমার স্ত্রীর কোনো অসুবিধে হচ্ছে বলে মনে হলো না। এত বড়ো বাড়িটা খালি হয়ে গেল, তার জন্যে তার কোনো কষ্টও নেই। জোড়া বটতলায় শিগগিরই মেলা বসবে, অনেক সাধু-সন্ন্যাসী আসবে। তাদের দেখতে যাবে সেই আনন্দেই মশগুল।
আর নোটন? সে তো রাজুর সঙ্গে দিব্যি ঘুড়ি ওড়াচ্ছে।
কিন্তু আমি? আমার যে শুধু খারাপই লাগছে তা নয়–সত্যি কথা বলব, পুলিশের লোক হয়েও আমার কেমন ভয় করছে। কিসের ভয় তা ঠিক বুঝতে পারি না। ঐ একফোঁটা ছেলে রাজু সুব্বাকে? পাগল হয়ে গেলাম নাকি? ওকে ভয় পেতে যাব কেন? ওর সাধ্য কী আমার ধারেকাছে ঘেঁষে!
.
রহস্যময় রাজু
আমাদের এই গ্রামে বারো মাসে তেরো পার্বণ লেগেই আছে। বিশেষ করে এই সময়ে জোড়া বটতলায় বিরাট মোচ্ছব হয়। মোচ্ছব চলতি কথা। আসল কথা হচ্ছে মহোৎসব (মহা উৎসব)। বহুকাল থেকে এই জোড়া বটতলায় এক পক্ষ কাল ধরে মেলা বসে। জোড়াবটের নিচে একটি ঠাকুর আছে। ঠাকুরের কোনো বিশেষ মূর্তি নেই। একটা পাথর আগাগোড়া সিঁদুর মাখানো।
