স্ত্রী বললেন, তুই ডাহা মিথ্যেবাদী। নোটনকে জিজ্ঞেস কর। সেও দেখেছে।
নেহিনেহি–বলতে বলতে রাজু যেন পালিয়ে গেল।
সেদিন রাত্রে স্ত্রী প্রথম বললেন, শোনেনা, রাজুকে আমার কেমন যেন লাগছে।
আমি চুপ করে রইলাম।
স্ত্রী আবার বললেন, কিছু বলছ না যে?
–কি আর বলব? আমিও টের পাচ্ছি। ওর ঐ রোগা-পটকা শরীর নিয়ে দুমদাম করে কাজ করা, ছাদ থেকে লাফিয়ে গাছের ডাল ধরে ঝোলা, ছাদের সরু পাঁচিলের ওপর দিয়ে হাঁটা, হাঁটতে হাঁটতে মস্ত বড়ো হাঁ করে গোটা পেয়ারা চিবনো, ওর অস্বাভাবিক চোখ, আমার দিকে অদ্ভুতভাবে তাকানো, মেলায় যাব না বলে লুকিয়ে লুকিয়ে যাওয়া, সন্ধেবেলায় দীঘির পথে জঙ্গলে ঢোকা, ওকে দেখে ভয় পেয়ে পাখির ঝাঁকের তাড়া করা–অথচ ও নাকি জঙ্গলের পথে যায়নি, ঘরেই ছিল–সবই রহস্যময়।
স্ত্রী শিউরে উঠে বললেন, কী হবে গো! আমার যে কেমন ভয় করছে। ওকে তাড়াও।
–ও নিজে থেকে চলে না গেলে কি তাড়ানো যায়? কোথায় যাবে?
স্ত্রী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, এত বড়ো বাড়িতে এভাবে থাকতে আমার খুব ভয় করছে। কেবলই মনে হচ্ছে খারাপ কিছু ঘটবে। কবে যে ওরা সবাই আসবে–
পরের দিন হঠাৎ আমার স্ত্রীর বাপের বাড়ি থেকে ওর এক ভাই এল। ওর মা খুব অসুস্থ। এখুনি আমার স্ত্রীকে নিয়ে যাবে।
শুনে চমকে উঠলাম। ওর মা অসুস্থ বলে নয়, আমাকে একা থাকতে হবে বলে।
যাবার সময়ে স্ত্রী ব্যাকুল হয়ে বললেন, বাধ্য হয়ে যেতে হচ্ছে। তোমায় একা ফেলে যেতে কিছুতেই মন সরছে না। খুব সাবধানে থেকো। যত তাড়াতাড়ি পারি চলে আসব।
আমি মুখে হাসি টেনে বললাম, কিচ্ছু ভেবো না। আমি একজন পুলিশ অফিসার। কেউ না থাক সঙ্গে রিভলভার আছে।
বললাম বটে কিছু ভেব না। কিন্তু নিজেই কিরকম দুর্বল হয়ে গেছি।
রিভলভার? রিভলভার কি সব ক্ষেত্রে কাজ দেয়?
.
গভীর রাতে পায়ের শব্দ
নোটনকে নিয়ে আমার স্ত্রী চলে যাবার পরই আমি যেন কিরকম অসহায় হয়ে পড়লাম। আমি কিছুতেই আর এ বাড়িতে টিকতে পারছি না। কেবলই মনে হচ্ছে ভয়ংকর কিছু যেন ঘটতে যাচ্ছে। একটা কথা ভেবে অবাক হলাম–কী অদ্ভুতভাবে একে একে সবাইকে চলে যেতে হলো। ছোটো ভাই গেল, মেজো ভাই গেল, শেষ পর্যন্ত আমার স্ত্রী-পুত্রও গেল। ব্যাপারটা কি? মনে হলো কোনো অশুভ শক্তি পরিষ্কার মতলব করে একে একে সবাইকে সরিয়ে দিচ্ছে। একটি মাত্রই উদ্দেশ্য–আমাকে একা রাখা। আর তখনই আমার জীবনহানির ব্যাপারে হেরম্ব জ্যাঠার সাবধানবাণী মনে পড়ল–এক মাসের মধ্যে জীবন সংশয় হতে পারে। এই সময়টায় যেন কখনো একা না থাকি।
কথাটায় তখন গুরুত্ব দিইনি। এখন গুরুত্ব দিতে হচ্ছে। ভয় পাচ্ছি।
আবার এটাও পরিষ্কার নয়–কিসের জন্যে ভয়? এখানে আপাতত একা থাকলেও পাড়া প্রতিবেশী আছে। দুবেলা তারা আমার খোঁজ-খবর নেয়। আমিও যাই তাদের বাড়ি। কোথাও কোনো অস্বাভাবিকতা নেই। বিপদের আভাস পর্যন্ত নেই, যত ভয় শুধু আমার বাড়ির ভিতরেই। এইটুকু নিশ্চিতভাবে বুঝেছি ঐ নেপালী ছোঁড়াটাই আমার কাছে অস্বস্তির কারণ। ওর হাবভাব, চাল-চলন কেমন যেন অদ্ভুত। তার চোখ দুটো ঠিক মানুষের চোখ নয়। তার চোখের দৃষ্টিতে মরা জন্তুর চাউনি। অথচ সে বাড়ির কাজকর্ম করে, আমার ছেলের সঙ্গে খেলা করে, ঘুড়ি ওড়ায়।
তাহলে? তাকে ভয় কিসের জন্যে?
এ প্রশ্নের মীমাংসা করতে পারি না। কিন্তু বেশ বুঝতে পারছি শ্রীযুক্ত বাবু সুশান্তকুমার সরকার, কলকাতার পুলিশ অফিসার–এই আমি কিন্তু এই খালি বাড়িতে টিকতে পারছি না। প্রতি মুহূর্তে এখন অকাল অপমৃত্যুর ভয় পাচ্ছি। স্পষ্ট দেখছি–দুয়ারে মৃত্যুর দূত দাঁড়িয়ে।
প্রণবেশটাও যদি এই সময়ে এসে পড়ত!
ওরা চলে গেছে বেলা বারোটার সময়ে। যাবার আগে আমার স্ত্রী দুবেলার মতো বেঁধে দিয়ে গেছে। কাজেই আজকের দিনটা চলে যাবে। কাল থেকে আমাকেই যা হোক কিছু রাঁধতে হবে।
ওরা চলে যাবার পর আমি সারা দুপুর ঘরে বসে রইলাম। আর লক্ষ্য রাখলাম সুব্বার দিকে। বাঁচোয়া সে একবারও আমার সামনে আসেনি। যদিও জানি সে বাড়িতেই আছে।
কেমন করে জানলাম ও বাড়িতে আছে? ঠিক বলতে পারি না। তবে ইদানিং টের পাই ও বাড়িতে থাকলে বাড়ির মধ্যে বাতাসটা কিরকম ভারী হয়ে থাকে। নিশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। ও বাড়িতে থাকলে পরিষ্কার বুঝতে পারি এ বাড়ির প্রত্যেকটা ইট, কড়ি, বরগা, এমনকি কুয়োর জল পর্যন্ত থিরথির করে কাঁপে। আজ এখনও কাঁপছে। তাই বুঝতে পারছি ও বাড়িতেই আছে। কিন্তু কোথায় আছে, কী করছে জানি না।
হঠাৎ আমার দম বন্ধ হয়ে এল। মাথাটা কিরকম ঝিমঝিম করতে লাগল। আমি সচকিত হলাম–পায়ের শব্দ পাচ্ছি…সে শব্দ কখনোই তেরো বছরের ছেলের পায়ের শব্দ নয়– যেন একটা ভারী বোঝা টেনে নিয়ে যাবার শব্দ।…বুঝলাম রাজু সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসছে। ও এল। বারান্দা দিয়ে যেতে যেতে ও একবার দাঁড়াল। আমার ঘরের দিকে তাকাল। আমার সঙ্গে চোখাচোখি হলো। আমার বুকের মধ্যে রক্ত চলকে উঠল।
ও কি আমায় দেখে হাসল? ও কি হাসতে জানে? ওকে তো কখনো হাসতে দেখিনি। ওটা কি হাসি? দাঁতের মতো কতকগুলো কী যেন ওর ঝুলে-পড়া ঠোঁটের ওপর ঝিকঝিক্ করে উঠল। আমি ছুটে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলাম।
তারপরেই শুনলাম ধুপধাপ শব্দ করে ও ছাদে চলে গেল। ছাদটা ওর বড় প্রিয় জায়গা।
