দোতলায় উঠে টানা বারান্দা। দুপাশে ঘর। প্রায় প্রত্যেক ঘরেই লোকজন আছে। এত লোক আছে অথচ এই দুদিনে তা বোঝাই যায়নি। কয়েকজনকে দেখলামও। কিন্তু তাদের জীবন্ত মানুষ বলে মনে হলো না। মুখে কথা নেই, আমি যে একজন নতুন মানুষ ওপরে এসেছি–তা কোনো কৌতূহলই নেই। শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। আশ্চর্য এই যে, এরা যেন সবাই মুখে কুলুপ এঁটে আছে। কথা নেই। সবারই চোখের চাউনিতে ভয় ভয় ভাব–এই বুঝি কিছু হয়। আমার মনে হলো এরা যেন এ জগতের বাসিন্দা নয়। কোথা থেকে কোথায় এসেছে জানে না। কেউ কাউকে চেনে না। অথচ পরে নিশীথের কাছ থেকে জেনেছিলাম এরা সবাই রাজপরিবারেরই। বসে বসে রাজার অন্নধ্বংস করছে। তাদের অন্য কোথাও যাবার উপায় নেই বলেই দুচোখে চাপা আতঙ্ক নিয়ে এখানে পড়ে আছে। আতঙ্ক কাকে নিয়ে তা বুঝতে বাকি রইল না।
বললাম, রাজাবাবু কোন ঘরে থাকেন?
ঐ দিকে। কিন্তু ওখানে যাওয়া নিষেধ।
একটা তালাবন্ধ ঘরের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়লাম।
এটা কার ঘর?
অম্বুজার।
ও এখন ঘরে কি করছে?
নিশীথ গম্ভীরভাবে বলল, জানি না। এবার চলো। আর নয়।
হঠাৎ দরজার ভেতর থেকে ক্রুদ্ধ গলা পাওয়া গেল, কে ঘুরছে বারান্দায়?
নিশীথ দরজার কাছে মুখ এনে বলল, আমি নিশীথ। দরজা খুলে দাও।
নিশীথ আমার হাত ধরে তাড়াতাড়ি সিঁড়ির দিকে এগিয়ে এল। চলে আসবার সময় দেখলাম অম্বুজার ঘরের এদিকে একটা জানলা আছে। পাছে খোলে সেজন্য শেকল বাঁধা।
আমরা সবে সিঁড়ি দিয়ে নামছি, দরজায় দুমদাম শব্দ। সেই সঙ্গে ক্রুদ্ধ মোটা গলায় চিৎকার, দরজা খোলো, দরজা খোলো।
সন্ধ্যের পর নিশীথ যথারীতি এল। ও যেন এ দুদিনে কেমন হয়ে গেছে। আমার চেয়েও যেন ও-ই বেশি ভয় পেয়েছে। বিনা ভূমিকায় বলল, শোনো, ঐ কাক-টাকের কথা কাউকে বলো না যেন। সবাই ভয়ে অস্থির হয়ে যাবে।
মনে মনে হাসলাম, তাও তো অম্বুজার ঘরের নিচে মাটিতে সেই পায়ের ছাপের কথা প্রকাশ করিনি।
বললাম, বলব আর কাকে? এত বড়ো বাড়িতে লোক বলে কেউ আছে? ওপরে যাদের দেখলাম ওরা তো সবাই এক-একটা মমি। সেই রূপকথায় রাক্ষসের গল্প পড়েছিলাম রুপোর কাঠি ছুঁইয়ে মড়ার মতো করে রেখেছিল, সেই রকম।
নিশীথ চুপ করে রইল।
বললাম, আচ্ছা, অম্বুজা ঘরে একলা থাকে কেন? সঙ্গে কেউ থাকলে তো পালাতে পারবে না।
নিশীথ বলল, ও কাউকে নিয়ে শুতে চায় না। অবশ্য এতগুলো আত্মীয় রয়েছে, তাদের কাউকে বললে শোবেও না।
কেন?
কেন তা তো দেখতেই পাচ্ছ। তা ছাড়া–এই পর্যন্ত বলে নিশীথ থেমে গেল।
থামলে কেন?
তা ছাড়া এ বাড়ির সকলের ধারণা হয়েছে ওর সঙ্গে যে শোবে সেই মরে যাবে।
আমি অবাক হয়ে বললাম, সে আবার কি?
হ্যাঁ, রানীমা, ওকে খুব ভালোবাসতেন। তাই ওর কাছেই সেই ছোটোবেলা থেকে বরাবর শুতেন। কিন্তু হঠাৎ দেড় বছর আগে ঐ মেয়ের পাশে শুয়েই মরে গেলেন। অথচ কোনো রোগ হয়নি। তারপর আরও তিনজন মেয়েকে ওর ঘরে শোবার জন্যে পাঠানো হয়েছিল। জলজ্যান্ত মেয়ে। পরপর তিনটেই মরে গেল।
কিসে মরত?
কেউ বলতে পারল না। কোনো রোগ ছিল না। শুধু সকালে দেখা যেত ঠোঁট নীল হয়ে গেছে। একটু থেমে বলল, বোধ হয় সাপে কামড়েছিল।
কথাটা যে সেও বিশ্বাস করে না তা ওর গলার টোন শুনেই বোঝা গেল।
এটাও আমার কাছে নতুন তথ্য। বিষে নীল হয়ে যেত। এমনি সময়ে হঠাৎ একজন প্রহরী ব্যস্ত হয়ে নিশীথকে ডেকে নিয়ে গেল। নিশীথ চা খাচ্ছিল, অর্ধেক খেয়েই আমি আসছি বলে উঠে গেল। আমি হতভম্বর মতো বসে রইলাম। না জানি আবার কী রহস্যজনক খবর শুনব।
খবরটা রহস্যজনকই বটে। সেদিন দুপুরে দরজা খোলা পেয়ে অম্বুজা যখন পালাচ্ছিল তখন সে প্রহরীর টুটি কামড়ে দিয়েছিল, হাসপাতাল থেকে খবর এসেছে সে এই মাত্র মারা গেছে।
অত অল্প ক্ষতে মরবার কথা নয়, রক্তপাতও বেশি হয়নি। তবু মরল। ডাক্তাররা বলেছে তীব্র বিষক্রিয়ায় মৃত্যু।
আমি চমকে উঠলাম। অম্বুজার দাঁতে এত বিষ! কি করে?
.
আবার দোতলায়
গভীর রাতে সেদিন যখন আমি দোতলার সিঁড়ির মুখে গিয়ে দাঁড়ালাম তখন ভরা অমাবস্যার ঘুটঘুঁটে অন্ধকার। সন্ধ্যের পর থেকেই বাড়ি নিস্তব্ধ হয়ে যায়। মনে হয় গোটা বাড়িটাই যেন কোনো অশুভ শক্তির মুঠোর মধ্যে চলে গেছে। কারও কিছু করার নেই। শুধু অপেক্ষা। করে থাকা কবে সেই চরম সর্বনাশের মুহূর্তটি আসবে।
এ কদিনে অম্বুজা সম্বন্ধে আমার এই ধারণাই হয়েছে–দশ-এগারো বছরের বালিকাটি নিমিত্তমাত্র। তার আড়ালে লুকিয়ে আছে একটা ভয়ানক দানব। সেই দানবটিকে দেখতে চাই।
সমস্ত প্রাসাদটা নিঝুম। মাঝে মাঝে বাগানের কোনো গাছে রাতজাগা পাখি ডানা ঝটপটিয়ে উঠছে। তারাও কি কোনো কিছুর ভয় পাচ্ছে?
আমি হাতের মুঠোয় টর্চটা ধরে সিঁড়ি দিয়ে নিঃশব্দে উঠতে লাগলাম। সেদিন দিনের বেলায় নিশীথের সঙ্গে এসে সিঁড়ি, ঘরগুলো সব চিনে রেখেছি।
নিঃশব্দে একটার পর একটা সিঁড়ি দিয়ে উঠছি। হঠাৎ হঠাৎ থেমে যাচ্ছি। মনে হচ্ছে আমার পিছনে কেউ যেন আসছে। যে কোনো মুহূর্তে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। কিন্তু পিছু ফিরে দেখি কেউ নেই।
থাকবেই বা কে? সবাই তো ঘুমে অচেতন।
আরো কয়েক ধাপ উঠতেই একেবারে আমার গায়ের কাছে বাঁ দিকে কেমন যেন একটু শব্দ হলো। আমি চমকে তাকাতেই দেখলাম সেই তালা দেওয়া একটা ঘুপচি ঘরের দরজার ওপর দুটো চোখ জ্বলছে। একটু ঠাওর করতেই আঁৎকে উঠলাম। কাক। সেই ভয়ংকর কাক।
