হঠাৎ সোঁ সোঁ করে কিসের একটা আওয়াজ শুনে চমকে ওপর দিকে তাকালাম। বিশাল একটা কাকের মতো কী যেন সেই চরের দিক থেকে সাঁ করে উড়ে এসে রাজপ্রাসাদের পিছন দিকে চলে গেল। জিনিসটা কি দেখার জন্যে তখনই সেই দিকে ছুটলাম। কিন্তু সেখানে গিয়ে কিছুই দেখতে পেলাম না।
আমি গোটা বাড়িটার চারিদিক ঘুরে ঘুরে দেখলাম। প্রত্যেকটি গাছের ডালের দিকে তাকাতে লাগলাম। তারপর দোতলার ঘরগুলোর দিকে–যদি কোনো জানলা খোলা থাকে হয়তো তার ভেতর দিয়েই ঢুকে পড়েছে। জানলাগুলোও তো সাবেক আমলের মতো বড়ো বড়ো। গরাদ নেই। শুধু বিবর্ণ রঙের পাল্লা। কোনো কোনোটার পাল্লা ভেঙে ঝুলছে। তবু নাকি এটা রাজপ্রাসাদ। সেখানে একজন রাজাও থাকেন যাকে বড়ো একটা দেখা যায় না। গলার স্বরটুকু পর্যন্ত শোনা যায় না।
হতাশ হয়ে ফিরে আসছিলাম। ভিজে ঘাস–কোথাও মাটি। পায়ে একটা পিঁপড়ে কামড়াতেই দাঁড়িয়ে পড়ে দু-আঙুলের চাপে পিঁপড়েটার ভবলীলা সাঙ্গ করে দিলাম। আর তখনই চোখে পড়ল মাটিতে কয়েকটা পায়ের ছাপ। সে ছাপ বেশ বড়। সাধারণ মানুষের মতো নয়। ছাপগুলো দেখে মনে হলো পায়ের আঙুলগুলো অস্বাভাবিক বেঁটে বেঁটে।
দোতলার একটা ঘরের ঠিক নিচে এই পায়ের ছাপ এল কি করে?
আমি পায়ের ছাপের বিশেষজ্ঞ নই। তবু এটুকু বুঝতে পারলাম এই পায়ের অধিকারী যে সে দৌড়ে বনের দিকে গেছে। কিন্তু কোথা থেকে এসেছিল তার কোনো চিহ্ন নেই।
আমি সেখানে বেশিক্ষণ আর দাঁড়াতে সাহস পেলাম না। কি জানি দোতলা থেকে যদি অম্বুজা দেখে ফেলে তাহলে আর রক্ষে নেই। চিন্তা-ভারাক্রান্ত মনে ঘরে ফিরে এলাম।
একে তো অম্বুজার চেহারা, তার অদ্ভুত গলার স্বর, আচরণ আমায় ভাবিয়ে তুলেছিল, তার ওপর এই এক উটকো চিন্তা মাথায় ঢুকল। অত বড়ো কালো পাখির মতো জন্তুটা মাথার ওপর দিয়ে উড়ে এসে হঠাৎ কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল! ঐ পায়ের ছাপগুলোই বা কার? আমি কি কোনো অলৌকিক জগতে বাস করছি? আমি কি ভুলে যাচ্ছি আমি কলকাতায় থাকি আর আমি একজন ডাক্তার?
সন্ধ্যের পর নিশীথ এল দেখা করতে। মুখটা যেন দুশ্চিন্তায় কালো।
চা খেয়েছ?
বললাম, হ্যাঁ।
কি ঠিক করলে?
বললাম, দুতিন দিনের মধ্যে যাচ্ছি না। তুমি অম্বুজাকে বলেছ তো আমি অসুস্থ?
তা বলেছি। কিন্তু বিশ্বাস করেছে বলে মনে হলো না।
আচ্ছা, রাজাবাবুর সঙ্গে কাল সেই একবার দেখা হয়েছিল। আর তো দেখিনি এর মধ্যে?
নিশীথ আমার প্রশ্নে তেমন গুরুত্ব না দিয়ে বললে, মেয়েটিকে নিয়ে তো ওঁর সব সময়েই মাথা খারাপ। দিন দিনই কিরকম হয়ে যাচ্ছে। অথচ কোনো উপায় নেই।
রানীমা?
নিশীথ কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, দেড় বছর হলো উনি মারা গেছেন।
কেন জানি না শুনে যেন ধাক্কা খেলাম। বুঝতে পারলাম কেন রাজাবাবু নিজেকে গুটিয়ে রেখেছেন।
আচ্ছা, রানীমা—
নিশীথ আমায় থামিয়ে দিয়ে বলল, প্লিজ ভাই, আর প্রশ্ন কোরো না।
আচ্ছা, আমায় একটু সাহায্য করবে?
নিশীথ যেন বিব্রত হয়ে বলল, কি বলো।
আমায় একবার দোতলায় নিয়ে যেতে পার?
দোতলায় কেন?
এলাম যখন পুরনো রাজপ্রাসাদের দোতলাটাও দেখে যেতে ইচ্ছে করছে। জীবনে তো নতুন বা পুরনো কোনো রাজবাড়িরই দোতলায় ওঠা সম্ভব হয়নি।
নিশীথ ভুরু কুঁচকে বলল, তোমার মতলবটা কী বলো দেখি।
আমি হেসে বললাম, অম্বুজার ঘরটা একবার দেখতে চাই।
ঐ সাংঘাতিক মেয়েটার ঘর দেখবে! তুমি কি এখনও ওকে বুঝতে পারনি?
বললাম, কিছুটা পেরেছি। পুরোটা পারিনি।
নিশীথ বললে, না ভাই, ও আমি পারব না।
বললাম, আমার এ অনুরোধ তোমায় রাখতেই হবে। বেশ, আমি ওর মুখোমুখি হতে চাই না। আড়াল থেকে ওর একটা ছবি তুলতে চাই।
বাঃ! চমৎকার! তারপর কাগজে কাগজে ছবিটা ছেপে রাজাবাবুর মাথা হেঁট করে দাও। ছিঃ!
আমি ওর হাত ধরে বললাম, আচ্ছা, কথা দিচ্ছি ছবি তুলব না। কিন্তু তুমি আমায় একটিবার দোতলায় নিয়ে চলো। না হয় ওকে যখন ঘরে তালা এঁটে রাখা হয় তখনই নিয়ে যেও। আমি দোতলাটা শুধু একবার দেখব।
নিশীথ অনিচ্ছাসত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত আমার অনুরোধ ঠেলতে পারল না। রাজী হলো।
ও চলে যাচ্ছিল, আমি ডেকে বললাম, আচ্ছা, তোমাদের এখানে কাকজাতীয় বিরাট কোনো কিছু উড়তে দেখেছ?
নিশীথ অবাক হয়ে বলল, সে আবার কী! এতকাল এখানে আছি অমন কিছু তো দেখিনি। কেন? তুমি কিছু দেখেছ নাকি?
বললাম, ঐরকম যেন কিছু দেখলাম দুপুরবেলায়।
কোন দিক থেকে এল?
আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বললাম, ঐ দিক দিয়ে।
তার মানে পুরনো চরার দিক থেকে। কোথায় গেল?
কি জানি। হঠাৎ যেন অদৃশ্য হয়ে গেল।
নিশীথের মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল। শুধু বলল, এবার আমাকেও বোধ হয় চাকরি ছেড়ে চলে যেতে হবে।
.
রাজপুরী নয়তো যেন মৃতের পুরী
পরের দিন দুপুরে নিশীথ আমাকে দোতলায় নিয়ে চলল। ও একটা কথাও বলছিল না। বুঝতে পারছিলাম ও চাইছে না আমি ওপরে যাই।
চওড়া চড়ড়া কাঠের সিঁড়ি। সিঁড়িগুলো ভাঙা ভাঙা। দেওয়ালেও অজস্র ফাঁক-ফোকর। সিঁড়িটা অনেক ঘুরে ওপরে উঠেছে। এক-একটা বাঁকে ছোটো ছোটো খুপরি ঘর–বেশির ভাগই তালাবন্ধ। মর্চে ধরা পুরনো তালা। কবে যে সে তালা শেষ লাগানো হয়েছে তা কেউ বলতে পারে না। সেসব ঘরের দরজাগুলোও ভেঙে পড়ার মতো। কি আছে ওসব ঘরে কে জানে।
