সেদিনের রাতের ঘটনার পর থেকে আমার কেমন কাকের ওপর ভয় ধরে গেছে।
আমি নিঃশব্দে আরও দুধাপ উঠে এলাম। আবার একটা ঘুপচি ঘর। আবার একটা কাক। এইরকম পরপর পাঁচটা। কাকগুলো কোনো শব্দ করছে না। শুধু আমায় লক্ষ্য করছে।
একই ধরনের এত কাক এলো কোথা থেকে?
তখনই মনে পড়ল অম্বুজার কাক পোর কথা। শুধু পোষাই নয়, কাকগুলো সিঁড়ির ধাপে ধাপে বসে যেন পাহারা দিচ্ছে।
আমি দোতলার টানা বারান্দায় উঠে এলাম। সেই ঘরগুলো যেখানে আগের দিন মানুষজন দেখেছিলাম সব বন্ধ। শুধু দরজাই বন্ধ নয়, জানলাগুলোও। এত ভয়?
আমি এগিয়ে এসে দাঁড়ালাম অম্বুজার ঘরের সামনে। দরজা বাইরে থেকে তালা বন্ধ। আমি দরজায় কান পেতে শুনলাম ঘরের ভেতরে একটা মৃদু শব্দ হচ্ছে–ধূপ ধুপ ধুপ
এত রাতে অম্বুজা একা কী করছে?
আমি তখনই এদিকের সেই শেকলবাঁধা জানলাটার কাছে চলে এলাম। একটা খড়খড়ি সামান্য একটু ফাঁক করে দেখতে লাগলাম। ঘরের মধ্যে একটা পিলসুজের ওপরে মস্ত একটা পেতলের প্রদীপ জ্বলছে। আর একটা লম্বা ধূপ নিঃশব্দে পুড়ছে। অম্বুজা মাতালের মতো নাচছে।
তার সেই অদ্ভুত নাচ দেখতে দেখতে আমার চোখ পড়ল ধূপকাঠিটার দিকে। ওটা সাধারণ ধূপকাঠি নয়। গলগল করে ধোঁওয়া বেরোচ্ছে। আর আশ্চর্য-সেই ধোঁওয়া অম্বুজার নাচের তালে তালে একটা অস্পষ্ট মূর্তি ধরে কেঁপে কেঁপে নাচছে। সে মূর্তি কোনো মেয়ের কি ছেলের, মানুষের কি দানবের বোঝা গেল না।
আমি বাহ্যজ্ঞান হারিয়ে সেই ধূপের ধোঁওয়ার অলৌকিক নাচ দেখছিলাম। কতক্ষণ ঐভাবে আচ্ছন্নের মতো কেটেছে জানি না। একসময়ে ধূপটা নিঃশেষ হয়ে গেল। একগাদা ছাই মেঝের ওপর পড়ে রইল। অম্বুজা সেই ছাই কপালে মেখে হঠাৎ মাটিতে উপুড় হয়ে পড়ে তিনবার কাকে যেন প্রণাম করল। আমি তখনও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে যাচ্ছি।
হঠাৎ এ কী……এ কী!
অম্বুজা ছুটে গেল খোলা জানলাটার দিকে। তারপর মুহূর্তের মধ্যে ঝাঁপ দিল দুহাত তুলে। এদিকে ওর ঘরের দরজায় তালা ঝুলছে।
অম্বুজাকে ধরবার এই মস্ত সুযোগ মনে করে আমি তখনই সিঁড়ির দিকে ছুটে গেলাম। কিন্তু–এ আবার কী!
গোটা কুড়ি বিদকুটে দেখতে কাক লাইন করে সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে।
কি করব–কোন দিক দিয়ে পালাব ভাবছি, কাকগুলো সার বেঁধে তাদের লম্বা লম্বা ঠোঁট ফাঁক করে আস্তে আস্তে আমার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। বুঝলাম এখনি ওরা আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে আমায় খুবলে খুবলে শেষ করে দেবে। অগত্যা আমি আমার একটি মাত্র অস্ত্র টর্চটাকে সহায় করলাম। বোতাম টিপলাম। টর্চের জোরালো আলো ওদের চোখে পড়তেই ওরা যেন একটু ঘাবড়ে গেল। সেই সুযোগে দালান থেকে সিঁড়ির ধাপ লক্ষ্য করে জোরে লাফ মারলাম। ওই কাকগুলোকে ডিঙিয়ে একটা চওড়া সিঁড়ির ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়লাম। কাঠের সিঁড়ি। জোর শব্দ হলো। ভাবলাম এখনি বুঝি লোকজন ছুটে আসবে। কিন্তু কেউ এল না। ভয়ে সবাই দরজায় খিল এঁটে শুয়ে রইল।
আমি উঠে নিচের তলায় আসার আগেই কাকগুলো আক্রমণ করল। মাথার ওপর, কাঁধে, পিঠে কালো কালো ডানার ঝাঁপটা–উঃ কী দুর্গন্ধ ওদের পাখায়! আমি টর্চটা হাতের মুঠোয় ধরে এলোপাথাড়ি ওদের পিটোতে পিটোতে কোনোরকমে নিচে নেমে ছুটে ঘরে ঢুকে খিল বন্ধ করে দিলাম।
খিল বন্ধ করেও নিশ্চিন্ত হতে পারিনি। সারারাত কাকগুলো আমার দরজা ঠুকরেছে।
.
পরের দিন সকালবেলায় চা খাবার সময়ে নিশীথ এল। তার প্রথম কথাই হলো, কবে যাচ্ছ?
হেসে বললাম, আর দুএকটা দিন।
ও খুশি হলো না। বলল, যে জন্যে তোমাকে আনালাম তার তো কিছুই হলো না।
বললাম, রোগীকে ভালো করে দেখতেই পেলাম না তো চিকিৎসা করব কী?
তা শুধু শুধু এখানে বসে করছটা কি?
বললাম, তোমাদের অম্বুজার রহস্য ভেদ করবার চেষ্টা করছি।
নিশীথ অবাক হয়ে বললে, এ কি খুন-খারাপির ব্যাপার যে রহস্যভেদ করবে?
বললাম, খুন-খারাপি হয়নি? রানীমার মৃত্যু হলো কিসে? রাত্তিরে ওর পাশে যে-ই শোয় তার মৃত্যু হয় কেন? কেন ওদের ঠোঁট বিষে নীল হয়ে যায়? কেন প্রহরীটা মরল? কেন ডাক্তার বললে, বিষক্রিয়ায় ওর মৃত্যু হয়েছে? রাজবাড়ির কেউ একবারও ভাবল না কেন– কোথা থেকে এই বিষ এল? একবারও তোমরা চিন্তা করে দেখলে না কেন-কেমন করে একটা দশ-এগারো বছরের মেয়ের গলার স্বর পুরুষের মতো হতে পারে? কেমন করে তার বাঁ হাতের আঙুলগুলো অস্বাভাবিক মোটা মোটা হয়? শুধু ঐ হাতটাই বা কেন বনমানুষের মতো লোমশ? কেন তোমরা কেউ তলিয়ে দেখলে না ঘর থেকে পালিয়ে কোথায় যেতে চায় অম্বুজা? ঘরের ভেতরে একা ও কী করে তারও কি খোঁজ রাখ? রাখ না। তা যদি রাখতে তা হলে বুঝতে মেয়েটা সামান্য একটা রোগী নয়। সে আরও ভয়ংকর। একটা বাচ্চা নিষ্পাপ মেয়ের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে একটা দানবশক্তি। সেই দানবের আমি তল্লাশ করব। দেখব কোথা থেকে সে এল, কেন এল?
নিশীথ হাঁ করে আমার কথাগুলো শুনে গেল–যেন কথাগুলো বিশ্বাস করবে কি করবে না বুঝতে পারছিল না। হঠাৎ ও বললে, কাল অনেক রাতে দোতলায় সিঁড়িতে একটা জোর শব্দ পেয়েছিলে?
মনে মনে হেসে বললাম, কই না তো।
ওরে বাপরে! মনে হলো কেউ যেন কাউকে সিঁড়ির ওপর আছড়ে ফেলল।
তুমি বেরিয়েছিলে নাকি দেখতে?
নিশীথ শুধু একটা কথাই বলল, পাগল!
