কেমন সন্দেহ হওয়ায় আবার টর্চ জ্বালোম। আঁৎকে উঠলাম। কাকটা মশারির চাল ফুটো করে গলা আর বুক ঢুকিয়ে দিয়েছে। দুটো লম্বা ঠোঁট আমার দিকে এগিয়ে আসছে। আমি আর এতটুকু দেরি না করে টর্চ দিয়ে জোরে এক ঘা বসিয়ে দিলাম। আঘাতটা বোধহয় মাথায় না লেগে পিঠে লাগল। দারুণ যন্ত্রণায় ডানা ঝাঁপটে মশারি থেকে উড়ে গিয়ে সশব্দে মেঝেতে পড়ল।
আমি তবু বেরোতে পারলাম না। মশারির মধ্যেই কুণ্ডলি পাকিয়ে শুয়ে রইলাম। হাতের মুঠোয় ধরা টর্চটা। ঐ রাক্ষুসে কাকের হাত থেকে পরিত্রাণ পাবার ওটাই এখন আমার একমাত্র অস্ত্র।
সকালে উঠেই মেঝের দিকে তাকালাম। কাকটা নেই। অবাক হলাম। যে কাকটা প্রচণ্ড আঘাত পেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ল, সে উড়ে পালাল কি করে? কাকটা ঘরে ঢুকলই বা কি করে? তখনই মনে পড়ল–তাই তো পাশের ছোটো ঘরটায় তিনটে খাঁচায় তিনটে কাক ছিল। বোধহয় একটার খাঁচা খোলা ছিল। বেরিয়ে পড়েছিল।
পাশের ঘরে ঢুকতে যেতেই ধাক্কা খেলাম। দরজায় তো শেকল তোলা।
তা হলে?
শেকল খুলে ভেতরে ঢুকে দেখি তিনটে খাঁচারই দরজা বন্ধ। আর তার মধ্যে তিনটে কাকই ঘাড় বেঁকিয়ে বিরক্ত হয়ে আমাকে দেখছে।
একটু বেলায় নিশীথ এসে যখন জিজ্ঞেস করল, রাতে কোনো অসুবিধে হয়নি তো? তখন সব ঘটনা খুলে বললাম। শুনে ওর মুখ-চোখের ভাব এমনিই হয়ে গেল যে আমি রীতিমতো ভয় পেয়ে গেলাম। বললাম, কি হলো? এত কী ভাবছ?
নিশীথ বললে, ভাবছি অনেক কিছু।
বললাম, আমি অবাক হচ্ছি এই ভেবে যে কাকটা পালাল কোথা দিয়ে? সব দরজা জানলাই তো বন্ধ ছিল।
ও বলল, যেদিক দিয়ে ঢুকেছিল সেই দিক দিয়েই বেরিয়ে গেছে। বলে আঙুল দিয়ে কোণের ঘুলঘুলিটা দেখিয়ে দিল।
কিন্তু ব্যাপারটা অন্য। নিশীথ বলতে লাগল, আমি ভাবছি অম্বুজা তোমার ওপর চটল কেন? তোমাকে এখনও দেখেইনি। তুমি যে ডাক্তার সে কথাও বলিনি। তাহলে?
আমি অবাক হয়ে বললাম, ও আমার ওপর চটেছে বুঝলে কি করে?
নিশীথ গম্ভীর গলায় বলল, কাকগুলো সব ওর পোষা। ঐ কাকটাকে ও-ই পাঠিয়েছিল তোমার টুটি ছিঁড়ে দেবার জন্যে। একটু থেমে বলল, শোনো ভাই, তুমি না হয় কলকাতায় ফিরেই যাও। এখানে থেকে দরকার নেই।
বললাম, এসেছি যখন তখন দুদিন থেকেই যাই। রাজনন্দিনী অম্বুজাকে একবার অন্তত চোখের দেখা দেখে যাব।
চোখের দেখা হলো সেদিন বেলা দশটা নাগাদ। ভাগ্যিস হলো, না হলে আমার ওপর রাগের কারণ জানতেই পারতাম না।
নিশীথই সঙ্গে করে এনেছিল।
সে দেখল আমায় অবাক হয়ে। তার চঞ্চল দৃষ্টি আমার গলার কাছ পর্যন্ত এসে থমকে গেল। কেমন যেন হতাশ হলো। ক্রুদ্ধ হলো। বোধহয় ও নিশ্চিত ছিল ওর পাঠানো কাকটা গত রাতে আমার চোখ খুবলে নিয়েছে, নয় তো টুটি কামড়ে দিয়েছে।
আমিও ওকে ভালো করে দেখলাম। এই কি সেই পরমাসুন্দরী মেয়ে যাকে মহারানী কুড়িয়ে পেয়েছিলেন? দেখলে কে বলবে দশ-এগারো বছরের মেয়ে। ফর্সা রক্ত। কিন্তু মুখটা যেন ইটের তৈরি। শক্ত কঠিন। সরলতা বা লাবণ্যের ছিটেফোঁটা নেই। চোখ দুটো যেন সবসময়ে অপ্রসন্ন। কপালে ভ্রূকুটি সেঁটেই আছে। ঐটুকু মেয়ের চুল কোমরের নিচে পর্যন্ত ঝুলছে। খসখসে চুল। পরনে লুঙ্গির মতো করে পরা শাড়ি। গায়ে বেনিয়ান।
নিশীথ বিনীতভাবে বললে, রাজকুমারী, এই আমার বন্ধু অসিত। কলকাতায় থাকে। ওর ব্যবসা পাখি ধরার। চিড়িয়াখানায় যোগান দেয়। আর কাক ধরতেও ওস্তাদ। কাক ধরবার জন্যে পশ্চিমে পাহাড় পর্যন্ত যায়। এই দ্যাখো, কয়েকটা নমুনা এনেছে। বলে খাঁচা তিনটে এনে সামনে রাখল।
রাজকুমারী কিন্তু সেদিকে ফিরেও তাকাল না। কর্কশ পুরুষ কণ্ঠে বললে, তুমি কি জন্যে এখানে এসেছ?
বললাম, আপনি কাক পছন্দ করেন। আমি কাক ধরতে পারি। তাই নিশীথ আসতে বলেছিল।
রাজকুমারী হুংকার দিয়ে বললে, মিথ্যে কথা। তুমি অন্য কোনো উদ্দেশ্যে এসেছ।
বললাম, না-না, আমার অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই।
উদ্দেশ্য নেই? অম্বুজার দুচোখ জ্বলে উঠল। উদ্দেশ্য নেই তো কাল সারা দুপুর চোরের মতো আমার ঘরের নিচে ঘুরছিলে কেন?
আশ্চর্য! এই কি একটা দশ-এগারো বছর বয়েসের মেয়ের কথা?
বললাম, আপনার কোন ঘর তা তো জানি না। আমি নতুন এসেছি। এত বড়ো ঐতিহাসিক রাজপ্রাসাদ–তাই ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম।
রাজকুমারী পুরুষের গলায় বলল, ওসব জানি না। যত শীগগির পার এখান থেকে চলে যাও। বলে বাঁ হাতটা তুলে বাইরের পথটা দেখিয়ে দিয়ে চলে গেল।
বাইরের পথটা আমার তখন দেখার অবসর ছিল না। আমি দেখছিলাম ওর বাঁ হাতটা। বেঁটে বেঁটে মোটা আঙুল। আর হাতটা ছিল লোমে ঢাকা।
নিশীথের মুখটা ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল। বললে, কাজ নেই ভাই, তোমার এখানে থেকে। তুমি চলেই যাও।
আমি হেসে বললাম, এসেছি যখন তখন অত সহজে যাব না। তুমি এক কাজ করো। ওকে গিয়ে বলে আমার জ্বর এসে গিয়েছে। নড়তে পারছি না। যা হোক করে দুতিনটে দিন আমায় থাকতেই হবে।
সন্ধ্যেবেলায় টেবিলের ওপর উঠে ঘুলঘুলিটা একটা ইট দিয়ে বুজিয়ে দিলাম। তবুও ভয়ে ভয়ে রাতটা কোনোরকমে কাটালাম। চোখের সামনে কেবলই ভেসে উঠছিল অম্বুজার সেই বীভত্স হাতটা। ও কি মানুষের হাত? এইরকম একটা হাত দেখেও রাজবাড়ির সকলে নিশ্চিন্তে ঘুমোয় কি করে?
সেদিনও দুপুরবেলায় ফের রাজবাড়ির পিছনের দিকে যেতে হয়েছিল। ইচ্ছে করে যাইনি। খাওয়া-দাওয়ার পর চেয়ারটা ঘরের বাইরে টেনে নিয়ে বসে বসে আমার কর্মপন্থার কথা ভাবছিলাম। থেকে তো গেলাম। কিন্তু কেন থাকলাম? অম্বুজার রহস্য-উদঘাটন? তা সম্ভব কি করে? ওর তো দেখা পাওয়াই ভার। তখন ঠিক করলাম যেমন করে তোক দোতলায় আমায় একবার গোপনে উঠতেই হবে। কিন্তু
