নিজেই উত্তর খুঁজে পেলাম। আমি যে রোগীকে দেখতে এসেছি, সে সাধারণ রোগী নয়। এখানে এসে পর্যন্ত অস্বস্তিকর বাতাস, চারিদিকে থমথমে ভাব, সেই ভয়ংকর চড়া, অদ্ভুত বুড়িটা, শুকনো গাছপালা আর–আর রাজকন্যার পুরুষ মানুষের মতো গলা, কাক পোষা, বাড়ি থেকে যখন-তখন পালিয়ে যাওয়া–এসবই যেন কেমন রহস্যময়। শুধু রহস্যময়ই নয়, অশুভ কোনো কিছুর দিকে আঙুল তুলে দেখাচ্ছে। একটা কথাই বারে বারে মনে হচ্ছে মেয়েটা তাহলে আসলে কী? আমার আবার বুড়ির সেই কথাটাই মনে হলো সাবধান!
.
সেই দিন রাতে
নিশীথ সেই যে চলে গিয়েছিল আর পাত্তা নেই। বুঝি তার অনেক কাজ-রাজাবাবুর সেক্রেটারি, তবু অপরিচিত জায়গায় আমাকে এভাবে একা ফেলে রাখাটা ঠিক হয়নি। এই স্তব্ধ নির্জন ঘরে কথা বলারও তো মানুষ চাই।
সারা দুপুর রাজবাড়ির চারিদিক ঘুরে পড়ন্ত বেলায় দরজার তালা খুলে ঘরে এসে ঢুকলাম।
ক্রমে সন্ধ্যে হলো। অমনি মশার ঝাক ঘেঁকে ধরল। বাড়ির চাকর গুটিগুটি এসে একটা লণ্ঠন দরজার কাছে রেখে গেল। আশ্চর্য, সেও একটা কথা বলল না। যন্ত্রের মতো শুধু ঘরে ঘরে, দালানে লণ্ঠন রেখে দিয়ে যাচ্ছে।
একটু পরে বাইরে জুতোর শব্দ হলো। তাকিয়ে দেখি নিশীথ আসছে। আর তারই সঙ্গে বাবুর্চির মতো একটা লোক ট্রেতে করে চা আর ডিমের ওমলেট নিয়ে এসে টেবিলের ওপর রেখে গেল।
আমি কিছু বলার আগেই নিশীথ বলল, জানি তুমি রাগ করেছ। কিন্তু আমার সমস্যা যে কতরকম তা ভাবতে পারবে না। আজকেই একটা কাণ্ড হয়ে গেছে। খাবার জন্যে অম্বুজার দরজা খোলা হয়েছিল আর সেই ফাঁকে দৌড়। ভাগ্যি প্রহরীরা ধরে ফেলেছিল! তবু ঐটুকু মেয়েকেও কায়দা করতে পারছিল না। মওকা বুঝে একজন প্রহরীকে আঁচড়ে কামড়ে এমন ক্ষত-বিক্ষত করে দিয়েছে যে তাকে হাসপাতালে পাঠাতে হয়েছে।
বললাম, ও কি বরাবর এইরকম হিংস্র প্রকৃতির ছিল?
না। যত বড় হচ্ছে ততই যেন হিংস্র হয়ে উঠছে।
একটু থেমে বলল, যাক, একটা কথা বলে নিই। অম্বুজা শান্ত হলে ওকে তোমার কথা বলেছি। তুমি কাক ধরতে পার জেনে ও চুপ করে রইল। কালকে তোমার কাছে নিয়ে আসব বলেছি। সেই সময়ে তুমি ওকে ভালো করে স্টাডি করে নিও।
আমি নিঃশব্দে মাথা দোলালাম। নটার মধ্যেই রাতের খাওয়া সেরে ভালো করে দরজা জানলা বন্ধ করে লণ্ঠনটা একটু কমিয়ে মশারি টাঙিয়ে শুয়ে পড়লাম। বালিশের পাশে রাখলাম টর্চটা যেন দরকার হলেই পাই।
সারা দিনের ক্লান্তি আর চাপা উত্তেজনা ছিল। যতক্ষণ না ঘুম আসছিল ততক্ষণ অম্বুজার কথাই ভাবছিলাম। তাকে এখনও চোখে দেখিনি কিন্তু যা সব শুনলাম তাতে তো বেশ ঘাবড়ে যাচ্ছি। একটা দশ-এগারো বছরের মেয়ে একজন দারোয়ানের টুটি কামড়ে ধরে! তাছাড়া আশ্চর্য ঐ রাজাবাবু মানুষটি। থমথমে মুখ। নিশীথ যখন আলাপ করিয়ে দিল তখন উনি কোনো কথাই বললেন না। শুধু মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানিয়ে উঠে গেলেন। এ আবার কিরকম রাজা! এত বিষণ্ণ কেন?
ভাবতে ভাবতে কখন একসময়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎই কিসের যেন একটা মৃদু শব্দ পেলাম। ঘুমের ঘোরে প্রথমে মনে হয়েছিল এদিকের জানলার ধারে টানা বারান্দা দিয়ে বুঝি কেউ আসছে। কিন্তু তারপরেই মনে হলোনা, শব্দটা বাইরে থেকে আসছে না। ঘরের ভেতরেই। আর তা আমার খাটের কাছেই।
আমার মেরুদণ্ড দিয়ে যেন একটা হিমস্রোত বয়ে গেল। সারা গা কাঁটা দিয়ে উঠল। সব দরজা-জানলা বন্ধ তবু কে ঘরে আসতে পারে? যেইই আসুক সে যে কখনোই মানুষ হতে পারে না এটুকু বুঝতে অসুবিধা হয়নি। আমি নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুয়ে রইলাম।
মৃদু শব্দটা তখন ঘুরছে খাটের এদিক থেকে ওদিক। লক্ষ্য যে আমিই, আমার সমস্ত ইন্দ্রিয় দিয়ে তা অনুভব করতে পারলাম। কিন্তু কী ওটা? পায়ের শব্দ নেই, নিঃশ্বাসের শব্দ নেই, অথচ ঘরের মধ্যেই কিছু একটা আছে। আমি ইচ্ছে করেই টর্চ জ্বালোম না। অন্ধকারের মধ্যেই এতটুকু না নড়ে ঠাওর করার চেষ্টা করলাম। কিছু দেখতে পেলাম না।
হঠাৎ আমার পায়ের দিকের মশারিটা নড়ে উঠল। মনে হলো কেউ যেন মশারিটা তোলবার চেষ্টা করছে। ভয়ে পা দুটো টেনে নিলাম। তারপরেই বস্তুটা যেন জানলার ধারে চলে গেল। গিয়ে পাশ থেকে মশারিটা তোলবার চেষ্টা করতে লাগল। আমি তাড়াতাড়ি বাঁ দিকে গড়িয়ে এলাম। সেও এবার সরে এল মাথার কাছে। এখন কোনো শব্দ নেই। শুধু নিঃশব্দে চেষ্টা চলছে আমার মশারির মধ্যে ঢোকবার। এবার মাথার দিকের মশারিটা তুলছে…আমি বালিশ দিয়ে জোরে মশারির প্রান্তটা চেপে ধরলাম। আর তখনই দেখলাম দুটো ছোট গোল গোল চোখ আমার দিকে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
যা থাকে কপালে ভেবে টর্চটা টেনে নিয়ে জ্বালোম। একটা বিকট কাক। বেশ বড়োসড়ো। বোধহয় পাহাড়ী কাক। এরকম অদ্ভুত কাক দেখা যায় না। কিন্তু ….ঘরের মধ্যে কাক এল কোথা থেকে? সে কথা ভাবার সময় পেলাম না। চোখের ওপর টর্চের আলো পড়া মাত্র কাকটা লম্বা ঠোঁট দুটো ফাঁক করে ফের মশারির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। টর্চ দিয়ে তাড়া করতে এবার মশারির চালে এসে বসল। বসামাত্রই তার ভারে মশারিটা অনেকখানি ঝুলে পড়ল। আমি প্রমাদ গুনলাম। ভয়ংকর কাকটা চালের ওপরে। ক্রমশই চালটা নিচু হচ্ছে। নড়েচড়ে যে আত্মরক্ষা করব তার উপায় নেই। মশারি থেকে বেরোতেও সাহস হয় না। তা হলে তো চোখ দুটো খুবলে নেবে। কোনোরকমে উপুড় হয়ে শুয়ে কি কর্তব্য ভাবতে লাগলাম।
