নিশীথ বলল, এর রোগটা মানসিক বলেই মনে হয়। আর সেইজন্যেই রাজাবাবুকে তোমার কথা বলেছিলাম।
বললাম, কিন্তু ডাক্তার দেখলেই যদি ক্ষেপে যায় তা হলে আমি কাছেই বা যাব কি করে, চিকিৎসাই বা করব কি করে?
নিশীথ বলল, তুমি যে ডাক্তার একথা বলা হবে না। তারপর ওকে দেখে ওর সঙ্গে কথা বলে তুমি যা করতে পার কোরো।
কিন্তু আমার সঙ্গে দেখা হবে কি করে? কি বলেই বা আলাপ করব?
সে কথাও আমরা ভেবে রেখেছি। ওকে বলা হবে কলকাতা থেকে একজন এসেছে। যে কাক ধরতে পারে।
আমি কাক ধরতে পারি! শুনে তো হতভম্ব।
হ্যাঁ। ও কাক খুব পছন্দ করে। ওর মর্জিমতো কত যে কাক দূর দূর পাহাড়ের দেশ থেকে ধরা হয়েছে তা দেখলে তুমি অবাক হয়ে যাবে।
বললাম, কিন্তু আমি কাক ধরব কি করে?
নিশীথ বলল, তার ব্যবস্থাও হয়েছে। এ ঘরে এসো।
ও আমাকে নিয়ে পাশের ছোট্ট একটা ঘরে ঢুকল। ঘরটা অন্ধকার। তার মধ্যেই গোটা তিনেক খাঁচা চোখে পড়ল। তিনটে খাঁচাতেই বোধহয় কাক রয়েছে।
নিশীথ বলল, এসবই অম্বুজার কাক। তিনটে লুকিয়ে নিয়ে এসে রেখেছি।
আমি খুবই হতাশ হয়ে পড়লাম। এইভাবে ধাক্কা দিয়ে কি রোগীর চিকিৎসা করা যায়? অসম্ভব।
নিশীথ বলল, এবার তুমি স্নান করে খেয়ে নাও। ঐদিকে বাথরুম। চৌবাচ্চাভর্তি জল আছে। তারপর ঠাকুর এ ঘরেই খাবার দিয়ে যাবে। তোমায় কোথাও যেতে হবে না। আমি এখন যাচ্ছি।
সবেমাত্র নিশীথ চৌকাঠের বাইরে পা রেখেছে হঠাৎ দুমদাম শব্দ। শব্দটা এল দোতলার কোনো ঘর থেকে। আমি চমকে উঠলাম। নিশীথ বলল, ও কিছু নয়। অম্বুজা দরজা ঠেলছে।
অম্বুজা?
রাজকুমারীর নাম। জলের ধারে পাওয়া গিয়েছিল বলে ঐ নাম দেওয়া হয়েছে। অম্বু মানে তো জল।
নাম নিয়ে আমার মাথা ঘামাবার দরকার নেই। বললাম, ও কি ঘরে আটকে আছে?
হা, যখন-তখন পালিয়ে যায় বলে ওকে ঘরে বন্ধ করে রাখা হয়।
বলেই নিশীথ চলে গেল। আর সঙ্গে সঙ্গেই একটা চিৎকার, দরজা খোলোদরজা খোলো
বললে কেউ বিশ্বাস করবে না গলাটা পুরোপুরি একটা রাগী পুরুষের।
ঐ গলা শোনা মাত্র বাড়ির পিছনের গাছে গাছে যে-সব পাখিরা কিচমিচ করছিল তারা থেমে গেল। উঠোনে একটা কুকুর চোখ বুজিয়ে ঘুমোচ্ছিল, হঠাৎ সোজা হয়ে কান খাড়া করে উঠে দাঁড়াল। আমি শব্দ লক্ষ্য করে দোতলার সার সার ঘরগুলোর দিকে তাকালাম। কিন্তু কোন ঘর থেকে অম্বুজা চিৎকার করেছিল তা বুঝতে পারলাম না।
খাওয়া-দাওয়ার পর লম্বা হয়ে শুয়ে বিশ্রাম করছিলাম। বিশ্রাটা হচ্ছিল শরীরের, মনের নয়। একটা চিন্তাই মনের মধ্যে ঘোরাফেরা করছিল–যে কণ্ঠস্বরটা শুনলাম সে কি একটা দশ-এগারো বছরের মেয়ের? মেয়েদেরও গলার স্বর কারো কারো মোটা হয়, কিন্তু এ যে কোনো ক্রুদ্ধ দানবের গলা। তা হলে এ তো কেবলমাত্র একটি মানসিক রোগগ্রস্ত মেয়ে নয়, অন্য কিছু। সে অন্য কিছুটা কী? আমি তার কী-বা চিকিৎসা করব?
নিস্তব্ধ দুপুর। আজ থেকে প্রায় ষাট বছর আগের একটা গ্রাম মাত্র। যারা পাড়াগাঁয়ে থাকে একমাত্র তারাই জানে দুপুরের নিস্তব্ধতা ওসব জায়গায় কেমন।
আমি আর শুয়ে শুয়ে চিন্তা করতে পারলাম না। উঠে পড়লাম। ঘরটা ভালো করে দেখলাম। সে আমলের মোটা মোটা কড়ি। আলকাতরা মাখানো। ঘরখানা ছোটোই। তিনদিকে জানলা। জানলার গায়ে লোহার জাল দেওয়া। বাড়ির পিছন দিকে অর্থাৎ পশ্চিম দিকে ঘন জঙ্গল। সে জঙ্গল কতদূর পর্যন্ত গেছে কে জানে। একবার ওদিকের জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমি বরাবর শহরে-থাকা মানুষ। ঘরের গায়ে একেবারে জানলার ধারেই এমন জঙ্গল কখনো দেখিনি। গা-টা কেমন ছমছম করে উঠল। কিসের ভয় তা জানি না। তবু ভয়। মনে হলো কিছু একটা ঘটবে। এখানে আসা আমার উচিত হয়নি। এই জঙ্গলের ধারে– এই ঘরে আমাকে একা রাত কাটাতে হবে।
এ ঘরের মাঝখানে যে খাটটা সেটা রাজবাড়িরই উপযুক্ত। কালো বার্নিশ করা মোটা মোটা পায়। খুব উঁচু। পুরু গদি। কবেকার গদি। জায়গায় জায়গায় ছিঁড়ে ছোবড়া বেরিয়ে গেছে।
এবার চারপাশের জায়গাটা কিরকম দেখার জন্য দরজায় তালা লাগিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।
কোন দিকে যাব?
ঠিক করলাম বাড়িটার চারদিক আগে দেখা দরকার। বিশেষ করে দোতলার কোন ঘরে অম্বুজাকে আটকে রাখা হয়েছে সেটার যদি হদিস পাওয়া যায়।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে পাশেই কাছারিবাড়ি। সেখানে নায়েব-গোমস্তারা একটা করে কাঠের বাক্স নিয়ে তার ওপর হিসেব-পত্তর কষছে। কিন্তু সবাই যেন বোবা হয়ে রয়েছে। কাছারিবাড়ির পাশ দিয়ে বাঁদিকে চললাম। গোড়ালি-ডোবা ঘাস। ওদিকে কলাবাগান। সজনে গাছ। কুল গাছ। একটু দূরে লম্বা লম্বা কতকগুলো দেবদারু গাছ।
আশ্চর্য হলাম সব গাছগুলোই যেন শুকিয়ে গেছে। দুটো নারকেল গাছ। একটাতেও পাতা নেই। পায়ের নিচে ঘাসগুলো কেমন হলুদবর্ণ। এমন কেন হলো?
ক্রমে গোটা বাড়িটা ঘুরে দেখলাম। অনেকখানি জায়গা নিয়ে বাড়িটা। কত যে ঘর তার হিসেব নেই। সব ভেঙে পড়ছে। ভেবে পেলাম না এখানে মানুষ কী করে থাকতে পারে।
হঠাৎ কি যেন একটা পায়ের কাছ দিয়ে ছুটে বেরিয়ে গেল। চমকে লাফিয়ে উঠলাম। একটা বেঁজি।
কিন্তু এই যে বাড়ির চারিদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছি–ঠিক কী যে খুঁজছি তা আমি নিজেও জানি না। আমি তো এই রাজবাড়ির একটি মেয়ের চিকিৎসা করার জন্যে এসেছি। তবে কেন একজন গোয়েন্দার মতো চারিদিক লক্ষ্য করে বেড়াচ্ছি?
