মঙ্গল তরোয়াল ঘোরাতে ঘোরাতে বললে, এখন তোমরা আমার কাছে এগিও না। আগে একে বধ করি। তারপর
এই পর্যন্ত বলে সদাশিব চুপ করেছিল। জিজ্ঞেস করলাম, তারপর
তারপরের কথা কেউ বলতে পারে না বাবুমশাই। শোনা যায় মঙ্গলকে বন্দী করে একটা মস্ত বড়ো কাঠের আলমারির মধ্যে আটকে রাখা হয়েছিল। এটা করা হয়েছিল স্বয়ং সারদাচরণের আদেশেই।
আমরা চমকে উঠলাম।
আলমারির মধ্যে যে খুলিটা রয়েছে সেটা তাহলে মঙ্গলাচরণেরই?
তাই সম্ভব।
আর সেই তান্ত্রিক সন্ন্যাসী?
সদাশিব বলল, সন্ন্যাসীকে সবাই ঠাকুরবাবা বলত। ঘোর তান্ত্রিক। এখানে এসেই কালীমূর্তি প্রতিষ্ঠা করে প্রতি অমাবস্যায় নরবলি দিয়েছেন। কাউকে ভয় করতেন না। কিন্তু তিনিও শেষ পর্যন্ত বাঁচেননি। চাষীরা তার ঘরে আগুন দিয়ে তাকে পুড়িয়ে মারে।
সেই থেকে তাঁর অশান্ত আত্মা মাঝে মাঝেই দোঠেলা বাতাসে ভর করে সারা মাঠ দাপিয়ে বেড়ায়। কিছু যেন খোঁজেন।
বলে সদাশিব আবার প্রণাম করল।
কিন্তু এখন ঐ আলমারি আর খুলিটা নিয়ে আমরা কি করব? খুলিটা ফেলে দেব?
সদাশিব আৎকে উঠে বলল, নানা, ওটা আপনারা ছোঁবেন না। আপনারা একদিন দুপুর রাতে মাঠের মধ্যিখানে গিয়ে ঠাকুরবাবাকে একমনে ডাকুন। বলুন, ঠাকুরবাবা, আপনি যা চান তা দয়া করে নিয়ে গিয়ে আমাদের শান্তি দিন। আমরা নিরপরাধ।
.
সদাশিবের কথা মতো সেদিন রাত্তিরেই আমরা তিনজন সেই ধু-ধু মাঠের মাঝামাঝি জায়গায় গিয়ে দাঁড়ালাম। চারদিক থথম্ করছে। গোটা মাঠটাকে মনে হচ্ছিল যেন মরুভূমি।
জলধরই প্রার্থনা করল। তারপর আমরা ফিরে এলাম। সেই ঘরের আর আলমারির তালাচাবি খুলে রেখে আমরা শুয়ে পড়লাম। রাত তখন একটা।
ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
হঠাৎ ঝড়ের শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। দেখি জলধবও উঠে বসেছে। ঝড় উঠেছে মাঠের দিকে। সেই সঙ্গে গুন্ গুন্ শব্দ।
শব্দটা ক্রমেই এগিয়ে আসছে–এগিয়ে আসছে
হঠাৎ শব্দটা থেমে গেল। তারপরই পরিষ্কার খড়মের শব্দ খটখট খট
শব্দটা বাড়ির নিচে পর্যন্ত এসেছে। আমরা ভয়ে কাঠ হয়ে বসে আছি। ওপরে উঠে আসবে নাকি?
না, ওপরে এল না। খড়মের শব্দ যেন সেই ঘরের মধ্যে ঢুকে গেল।
কিছুক্ষণ রুদ্ধ নিশ্বাসে আমরা মশারির মধ্যে বসে রইলাম। তারপর
তারপরই হুড়মুড় করে ভীষণ একটা শব্দ…কিছু যেন পড়ে ভেঙে গেল।
কী ঘটছে তা দেখতে যাবার সাহস আমাদের নেই। আমাদের তেমনিই বসে থাকতে হলো যতক্ষণ না সকাল হলো।
যথেষ্ট বেলা হলে আমরা নিচে গিয়ে দেখলাম, অতবড়ো আলমারিটা ভেঙে চুরমার হয়ে চারদিকে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে রয়েছে।
ভালো করে খুঁজে দেখলাম খুলিটা নেই।
যাক বাঁচা গেল। যে জন্যে এত কাণ্ড সেটা দূর হয়েছে। আলমারিটারও গতি হয়েছে। আপনা থেকেই। আমরা নিশ্চিন্ত হয়ে ওপরে এসে বসলাম।
.
জলধরের বাড়িতে আর উৎপাত হয়নি। তবে একটা খটকা আমাদের মনে থেকেই গেল। খুলিটা যখন মঙ্গলাচরণেরই তখন সেই খুলিটা উদ্ধারের জন্যে ঠাকুরবাবার এত চেষ্টা কেন? মঙ্গলাচরণ তো তাঁর শত্রুপক্ষের লোক!
এ রহস্যের মীমাংসা তখনই হয়নি। হয়েছিল আরও কয়েক মাস পরে।
রাজবাড়ির সেই পুরোহিত সদানন্দ ব্রহ্মচারী কাশী থেকে নবদ্বীপে ফিরে এসেছেন জেনে জলধর গেল দেখা করতে। সঙ্গে আমাকেও যেতে হলো।
সব শুনে বৃদ্ধ সদানন্দ গম্ভীর হয়ে গেলেন। বললেন, আমার ফেরা পর্যন্ত তোমার অপেক্ষা করা উচিত ছিল। আমি থাকলে ঐ আলমারি কখনো কিনতে দিতাম না। ঐ আলমারিটা ব্যবহার নিষিদ্ধ তালিকায় রয়েছে।
তারপর জিজ্ঞেস করলেন, ঘটনাটা সব শুনেছ তো?
জলধর তখন সদাশিবের বিবরণটা বলে গেল। সদানন্দ চোখ বুজিয়ে শুনে গেলেন। তারপর বললেন, সদাশিব যা বলেছে তা তার বাবার কাছে থেকে শোনা কথা। আর আমার কাছে আছে এই বংশের সমস্ত ঘটনাপঞ্জী। সদাশিবের অনেক কথাই ঠিক। শুধু একটাই ভুল। আলমারিতে আটকে রাখা হয়েছিল রাজকুমার মঙ্গলাচরণকে নয়, তান্ত্রিকের প্রধান আর প্রিয়তম শিষ্য প্রলয়ানন্দকে। কেউ বলে রাজার সেপাইরা ভুল করে মঙ্গলাচরণের বদলে প্রলয়ানন্দকে আলমারিতে ঢুকিয়ে দিয়েছিল। আবার কেউ বলে, ভুল নয়। ওরা মঙ্গলাচরণকে খুব ভালোবাসত। তাই ওকে ছেড়ে দিয়ে নিষ্ঠুর হৃদয়হীন প্রলয়ানন্দকেই আলমারির মধ্যে গুম করে রাখে। তবে তারপর থেকে মঙ্গলাচরণকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। রাজবংশের তালিকাতেও তাই বোধহয় মঙ্গলাচরণের নাম নেই।
আমরা ফিরে এলাম। এত দিনে পরিষ্কার হলো কেন সেই অশরীরী তান্ত্রিক হানা দিত এ বাড়িতে। সে বোধহয় মুক্ত করতে চাইত তার প্রিয় শিষ্য প্রলয়ানন্দর বদ্ধ আত্মাকে।
[আষাঢ় ১৪০৪]
রহস্যময় রোগী
হঠাৎ টেলিগ্রাম
প্রায় ষাট বছর আগের কথা বলছি। তখন আমি ডাক্তারি পাশ করে একটা নামী হাসপাতালে ঢুকেছি। সেই সঙ্গে প্রাইভেট প্র্যাকটিসও করছি। ঐ অল্প বয়সেই বেশ নামডাক হয়েছিল। ইংরিজিতে যাকে বলে জেনারেল ফিজিশিয়ান হলেও আমি বেশি চিকিৎসা করতাম মানসিক রোগীদের। আর এতেই আমার খ্যাতি। মানসিক রোগী মানেই পাগল নয়। পাগল না হয়েও কেউ কেউ অস্বাভাবিক আচরণ করে। যেমন–কেউ সবসময়ে গম্ভীর হয়ে থাকে। মোটে হাসে না। আপন মনে দিনরাত কি যেন ভাবে। কেউ কেউ সব সময় বিমর্ষ। কারো সঙ্গে মিশতে চায় না। চুপচাপ ঘরে বসে থাকে। এই রকম নানা লক্ষণ থেকে বোঝা যায় লোকটি মানসিক রোগী হয়ে গেছে।
