আমি এই ধরনের রোগীদের চিকিৎসা করতে বেশি পছন্দ করতাম। মেলামেশা করে তাদের মনে কিসের দুঃখ, কিসের অভাব জেনে নিতাম। তারপর চিকিৎসা করে ভালো করে দিতাম।
হঠাৎ সেদিন আমার নামে একটা টেলিগ্রাম এলো। টেলিগ্রাম এলেই মানুষ ভয় পায়—না জানি কার কী হলো।
টেলিগ্রাম খুলে নিশ্চিন্ত হলাম। না, সেরকম কিছু নয়। তবে অবাক হলাম। আমার বন্ধু নিশীথ টেলিগ্রাম করেছে বাগআঁচড়া থেকে। লিখেছে কয়েক দিনের ছুটি নিয়ে শীগগির চলে এসো এখানে। ভালো একটা কেস আছে।
মনস্থির করা মাত্র পরের দিনই বেরিয়ে পড়লাম। শেয়ালদা থেকে রানাঘাট। সেখান থেকে বাসে বাগআঁচড়া। জায়গাটা কলকাতা থেকে প্রায় একশো কিলোমিটার দূরে। শান্তিপুরের কাছে।
জায়গাটার নাম বাগআঁচড়া কেন সে বিষয়ে নানা মুনির নানা মত।
একসময়ে শান্তিপুরের বর্তমান বাবলা গ্রাম দিয়ে গোবিন্দপুর হয়ে গঙ্গা প্রবাহিত হতো। পরে প্রাকৃতিক কারণে গঙ্গা দক্ষিণে সরে আসাতে গঙ্গার পুরনো খাত জুড়ে চর পড়ে যায়। কারও কারও মতে ঐ চরে কোনো ফসল হতো না বলে লোকে চরটাকে বলতো বাগআঁচড়া। আবার কেউ কেউ বলেন ওখানে খুব বাঘের উপদ্রব ছিল। লোকে প্রায় প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে দেখতে পেত দরজার সামনে বাঘের আঁচড়াবার দাগ। মানুষের গন্ধ পেয়ে খেতে এসে বন্ধ দরজা আঁচড়ে থাবা মেরে খোলবার চেষ্টা করত। সেই থেকেই নাকি এই জায়গার নাম বাগআঁচড়া।
বাঘ ছাড়াও আরও কিছু অন্য ভয় ছিল ওখানে। ঐ যে ধু ধু চরদুপুরের রোদে জ্বলন্ত মরুভূমির মতো। আর রাতে? রাতে ঐ চরের অন্য রূপ। জনমানবশূন্য শুধু বালি আর বালি। ভুল করে কেউ ওদিকে গেলে সে আর বেঁচে ফিরত না। কী করে কী যে হতো কেউ তা বুঝতে পারত না। শুধু সারা চর জুড়ে একটা হু হু করে দমকা বাতাস বইত। তারপর কেমন একটা গোঙানির শব্দ। তারপরই সব চুপ। পরের দিন সকালে দেখা যেত একটা মানুষ কিংবা একটা কোনো নিশাচর পাখি, নিদেন একটা কুকুর মরে পড়ে আছে। কে যেন প্রবল আক্রোশে তাদের জিভ টেনে বের করে দিয়েছে।
এই ভয়ংকর চরে ঢের পরে বসবাস করতে আসেন এক দুর্ধর্ষ সাহসী প্রবল প্রতাপ ব্যক্তি। নাম চাঁদ রায়।
কে এই চাঁদ রায়?
কেউ কেউ বলেন ইনি নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের (কৃষ্ণনগর এঁরই নামে) জ্ঞাতি। কেউ বলেন–না, জ্ঞাতি নয়, চাঁদ রায় ছিলেন মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের দেওয়ান। আবার কারো মতে চাঁদ রায় একজন নিষ্ঠুর দস্যুসর্দার। যাই হোক না কেন তিনি যে একজন সাহসী আর প্রতাপশালী লোক ছিলেন তার প্রমাণ মিলল যখন দেখা গেল ঐ ভয়ংকর চরে এসে তিনি পাকাপাকিভাবে থাকতে লাগলেন। শুধু থাকাই নয়, ঐ চরের খানিকটা জায়গা জুড়ে চাষবাস শুরু করলেন। যে চর বেশ কয়েক শত বছর ধরে ভয়াল ভয়ংকর মৃত্যুফাঁদ হয়ে পড়েছিল, এখন চাঁদ রায়ের চেষ্টায় সেই চরে সোনার ফসল ফলতে শুরু করল। কয়েক বছরের মধ্যেই এই চাষের দৌলতে প্রচুর ধনসম্পত্তির অধিকারী হয়ে উঠলেন চাঁদ রায়। তারপরেই তিনি একজন দোর্দণ্ডপ্রতাপ জমিদার বলে গণ্য হলেন। কেউ কেউ তাকে বলত রাজা রাজা চাঁদ রায়।
এ সব প্রায় তিনশো বছর আগের কথা।
ক্রমে চাঁদ রায়ের দেখাদেখি অনেকে এখানে এসে বসবাস করতে লাগল। আর চাঁদ রায় প্রাসাদ তৈরি করে রীতিমতো রাজার হালে রাজ্য শাসন করতে লাগলেন। সে সময়ে রাজা-জমিদাররা প্রজাদের ওপর অত্যাচার-উৎপীড়ন করলেও নিজেদের নাম চিরস্থায়ী করার জন্যে অতিথিশালা, জল, রাস্তাঘাট নির্মাণ, মন্দির প্রতিষ্ঠা করতেন। চাঁদ রায়ও কয়েকটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেগুলোর ধ্বংসাবশেষ বাগআঁচড়ায় এখনও আছে।
চাঁদ রায় ঐ চড়ার অনেকখানি জায়গা দখল করে রাজপ্রাসাদ তৈরি করলেও যে কারণেই হোক চরের পশ্চিম দিকটা পরিত্যক্তই রেখেছিলেন। পাত্র-মিত্র-মন্ত্রী-পারিষদরা কারণ জিজ্ঞেস করলে উনি উত্তর দিতেন না। এড়িয়ে যেতেন। শুধু তাই নয়, উনি আদেশ জারি করলেন একটা বিশেষ সীমার ওদিকে যেন কেউ না যায়।
চরের পশ্চিম দিকে কী ঘটেছিল–এমন কী ব্যাপার তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন তা কেউ জানতে পারল না আরও আশ্চর্যের ব্যাপার তিনি নাকি পশ্চিম দিকের জানলা রাত্রিবেলায় খুলতেন না।
এরপর তিনি বিভিন্ন জায়গা থেকে বেশ নামকরা কয়েকজন ব্রাহ্মণ আনিয়েছিলেন। আর তাদের বসবাসের জন্যে বাগআঁচড়ার কাছাকাছি একটা জায়গা ঠিক করে দেন যেখানে ব্রাহ্মণরা নিশ্চিন্তভাবে পূজা-অর্চনা করতে পারেন। সেই জায়গাটা ব্রাহ্মণরাই শাসন করতেন, চাঁদ রায় সেখানে নাক গলাতেন না। জায়গাটার নাম হয়েছিল তাই ব্রহ্মশাসন।
কালের নিয়মে এক সময় চাঁদ রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেন। রাজপ্রাসাদ ভেঙে পড়ল। যুগ বদলে গেল। তারপর কোথা থেকে উদয় হলেন এই রাজাবাবু। তার নাম চন্দ্রভানু রায়। ইনি বলেন–উনি নাকি চাঁদ রায়েরই বংশধর। কিন্তু ইতিহাসে তাঁর নাম নেই। চন্দ্রভানু রায় নামেই রাজা, রাজ ঐশ্বর্য আর আগের মতো নেই। থাকেন সেই পুরনো ভাঙা রাজপ্রাসাদেই নতুন করে সারিয়ে সাজিয়ে। যখন তিনি রাজা তখন তাকেও রাজার মতোই চলতে হয়। দাস-দাসী, আমলা, গোমস্তা যেমন আছে তেমনি হাল আমলের মতো রাখতে হয়েছে একজন সেক্রেটারি। সেই সেক্রেটারিই সব রাজার ডান হাত। এই সেক্রেটারিই হচ্ছে আমার বন্ধু নিশীথ।
