জলধর কি বলতে যাচ্ছিল এমন সময়ে বিশু এসে বলল, বাবা নিচে এসে বসে আছে, ওপরে উঠতে পারবে না। আপনারা আসুন।
আমরা তখুনি নিচে নেমে গেলাম। আমাদের এই অবস্থায় রেণুর বাবা কোনো হদিস দিতে পারে কিনা দেখা দরকার।
রেণু বা বিশুর বাবার অনেক বয়েস। সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। ছোটো ছোটো পাকা চুলে ভরা মাথাটা কেবলই দুলছে, যেন জরাজীর্ণ দুর্বল শরীরটা মাথার ভার সইতে পারছে না। নাম সদাশিব দাস।
আমাদের দেখে লাঠিটা পাশে রেখে কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়াল। দুহাত জোড় করে বিনম্র নমস্কার করে বলল, কর্তাবাবুরা, এ বাড়িতে কদিন ধরে যা ঘটছে রেণুর মুখে সব শুনে আর চুপ করে থাকতে পারলাম না। তাই আমি যা জানি–মানে বাবার মুখে যা শুনেছি তাই বলতে এলাম।
আমরা দুখানা চেয়ার নিয়ে ওর সামনে বসে ওকে বলতে বললাম।
সদাশিব প্রথমে চোখ বুজিয়ে কারও উদ্দেশ্যে প্রণাম জানাল। তারপর বলল, বাবুমশাইরা, এসবই ঠাকুরবাবার খেলা।
ঠাকুরবাবা কে?
এর উত্তরে সদাশিব ফোকলা মুখে অস্পষ্ট উচ্চারণে কাটা কাটা অসংলগ্ন কথার মধ্যে দিয়ে যা বলতে চাইল তা এইরকম–
প্রায় তিনশো বছর আগে এই সব জায়গা নন্দগড়ের রাজার অধীন ছিল। রাজা সারদাচরণ রাজ্যশাসনে যেমন কঠোর ছিলেন, উল্টোদিকে তেমনি আবার খুব ধর্মপ্রাণ মানুষ ছিলেন। অনেক দেব-দেউল, অতিথিশালা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
রাজসভায় সেদিন কাজের অবসরে সারদাচরণ খুশমেজাজে রাজজ্যোতিষীর সঙ্গে ভাগ্যফল নিয়ে আলোচনা করছিলেন। পাশে বসেছিল তাঁর পোষ্যপুত্র যুবরাজ মঙ্গলাচরণ। এমনি সময়ে জয় তারা! বলে হুংকার দিয়ে বিকটাকার এক সন্ন্যাসী রাজার সামনে এসে দাঁড়ালেন। খালি গা, পরনে কনি মাত্র, মাথায় জটা, কপালে সিঁদুর, গলায়-হাতে মোটা মোটা রুদ্রাক্ষের মালা। ডান হাতে মস্ত বড় খাঁড়া কাঁধের ওপর রাখা। তাঁকে দেখে সভার সকলে ভয়ে চমকে উঠল। রাজা উঠে দাঁড়িয়ে প্রণাম জানালেন।
সন্ন্যাসী দূর থেকে তাকে আশীর্বাদ জানিয়ে বললেন, ভিক্ষাং দেহি।
সারদাচরণ বিনীতভাবে বললেন, ভিক্ষা বলবেন না, ঠাকুর। আদেশ করুন কী চান।
সন্ন্যাসী যেন জানতেনই রাজাকে কি বললে রাজা তার কি উত্তর দেবেন। তাই তার উত্তরও তৈরি ছিল। হাত দিয়ে ঐ সব মাঠ দেখিয়ে বললেন, ঐ ভূমি আমায় দান করলে আমি যাগ-যজ্ঞ করতে পারি। আশ্রম তৈরি করে আমার বহু শিষ্যদের স্থায়ীভাবে এখানে নিয়ে এসে রাখতে পারি। তাতে তোমার রাজ্যেরই কল্যাণ হবে।
সারদাচরণ তাই হবে বলে নায়েবকে ডেকে জমির বিলি ব্যবস্থা করে দিতে বললেন। আর সন্ন্যাসীর থাকার, সেবার আয়োজনও যাতে সেই দিন থেকেই শুরু হয় সেইরকম নির্দেশ দিলেন।
সন্ন্যাসী খুশি হয়ে রাজাকে আবার একদফা আশীর্বাদ করে রাজসভা থেকে বেরিয়ে গেলেন।
সন্ন্যাসী চলে গেলে সারদাচরণ জ্যোতিষীকে হেসে জিজ্ঞাসা করলেন, কেমন ব্যবস্থা করলাম? ভালোই বলো। সন্ন্যাসীর কী রকম চেহারা দেখেছ? খুব উঁচুদরের তান্ত্রিক বলে মনে হলো।
জ্যোতিষী চুপ করে রইলেন।
সারদাচরণ বললেন, আর ঐ মাঠ? শুধু শুধু পড়ে পড়ে নষ্ট হচ্ছিল–
জ্যোতিষী বাধা দিয়ে বললেন, সে কী মহারাজ! কত গরিব চাষী আপনার ঐ জমিতে ফসল ফলিয়ে জীবনধারণ করছিল–তাদের মুখের অন্ন কেড়ে নিলেন?
তার কাজের কেউ নিন্দে করলে সারদাচরণ সহ্য করতে পারতেন না। বিরক্ত হয়ে বললেন, চাষীদের পেট ভরানোর চেয়ে ঠাকুরমশাইয়ের আশীর্বাদ পাওয়া আমার ঢের লাভের। বুঝেছ? তাছাড়া রাজ্যের কল্যাণ
জ্যোতিষী বললেন, আমি ভালোভাবেই বুঝেছি মহারাজ। তবু বলে যাচ্ছি, কাজটা ভালো হলো না। ফল অশুভ। বলে রাজসভা থেকে বেরিয়ে গেলেন।
সারদাচরণ তখনই আদেশ করলেন–এই জ্যোতিষী যেন কোনোদিন আর রাজসভায় ঢুকতে না পরে।
জ্যোতিষী চলে যেতেই যুবরাজ মঙ্গলাচরণও উঠে গেল। সারদাচরণ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। তার মনে হলো তার ছেলেও তার এই কাজ পছন্দ করছে না। রাগে মুখটা থঙ্কম্ করতে লাগল।
তারপরই শুরু হলো সন্ন্যাসীর কর্মযজ্ঞ। দশ দিনের মধ্যেই কোথা থেকে নিয়ে এলেন শ দুয়েক শিষ্যশাগরেদ। জমি দখল করে নিলেন। কিন্তু কাজটা খুব সহজে হয়নি। গরিব চাষীরা দলবদ্ধভাবে তাদের পেটের অন্ন যোগায় যে জমি তা রক্ষা করবার জন্যে ঝাঁপিয়ে পড়ল। একদিকে স্বয়ং রাজার পাইক-বরকন্দাজ আর সন্ন্যাসী ঠাকুরের শিষ্যরা, অন্য দিকে চাষীরা। সন্ন্যাসী ঠাকুরের পাশে ছিল তার প্রধান আর প্রিয় শিষ্য প্রলয়ানন্দ। বয়েস ত্রিশের মতো। বড় নিষ্ঠুর। সে নিজে খাঁড়া নিয়ে কত চাষীর মুণ্ডু কাটল তার হিসেব নেই। চাষীরাও চুপ করে মার খেল না। তারা দলে দলে তীর-ধনুক নিয়ে সন্ন্যাসী নিধনে নেমে পড়ল। সন্ন্যাসীরা সারা মাঠ জুড়ে যে সব আশ্রম তৈরি করেছিল, সব জ্বালিয়ে দিল চাষীরা। আর চাষীদের নিয়ে সন্ন্যাসীদের বিরুদ্ধে যে যুবকটি লড়াই পরিচালনা করছিল, সে হচ্ছে মঙ্গলাচরণ। তারও বয়েস ত্রিশের মতো।
সারদাচরণ ভাবতেও পারেননি যে তাঁরই ছেলে এইভাবে তার বিরুদ্ধাচরণ করবে। যখন জানতে পারলেন তখনই হুকুম দিলেন মঙ্গলকে বন্দী করো।
বরকন্দাজরা যখন মঙ্গলকে বন্দী করতে এল তখন দেখা গেল মাঠের মধ্যে মঙ্গল মুখোমুখি যুদ্ধ করছে প্রলয়ানন্দের সঙ্গে। প্রলয়ানন্দের হাতে খাঁড়া, মঙ্গলের হাতে তরোয়াল।
