শব্দটা ঠিক কোথায় হচ্ছে প্রথমটা বুঝতে পারিনি। তারপরেই বুঝলাম শব্দটা একতলা থেকে আসছে।
ধড়মড় করে উঠে বসলাম। পাশে জলধর তখন অকাতরে ঘুমোচ্ছে। আমি পাশে শুয়ে আছি জেনেই ও বোধহয় এত নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পেরেছে।
আমি আস্তে ঠেলা দিয়ে ওকে জাগালাম।
আঁ-আঁ কী হয়েছে! বলে ও চমকে উঠে বসল।
সাহস দিয়ে বললাম, কিছু না। একটা শব্দ হচ্ছে না?
ও কান পেতে শুনে বলল–হ্যাঁ। নিচের ঘরে।
আমি স্বচক্ষে আজ দেখব। বলে মশারি থেকে বেরিয়ে এলাম।
দাঁড়াও। আমিও যাব। বলে জলধরও বেরিয়ে এল। দেখি ওর পা দুটো কাঁপছে।
সুইচে হাত দিলাম। ঠিক আগের মতোই আলো জ্বলল না। দুজনে দুটো টর্চ হাতে নিয়ে সিঁড়ির মুখে এসে দাঁড়ালাম–কিন্তু সিঁড়ির ঠিক শেষ ধাপে কেউ যেন দাঁড়িয়ে রয়েছে।
চমকে দু পা পিছিয়ে এলাম।
টর্চ জ্বালোম। দেখি বিশু। শিকারী বেড়ালের মতো ও নিচে নামছে।
টর্চের আলোয় ও চমকে উঠে পিছন ফিরে তাকাল। তারপর ইশারায় নিঃশব্দে নামতে বলল। বুঝলাম শব্দটা ও-ও শুনেছে। অতি সাহসী তো। তাই একাই দেখতে যাচ্ছিল ব্যাপারটা।
দুটো টর্চ নিভিয়ে, শুধু একটা মাত্র টর্চ জ্বালিয়ে আমরা তিনজনে সেই ঘরটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ঘরের ভেতরে শব্দটা তখনও হচ্ছে। কেউ যেন ভারী কাঠের দুখানা পা নিয়ে ঘেঁষটে ঘেঁষটে অনেক কষ্টে এগিয়ে আসার চেষ্টা করছে।
জলধরের কাছ থেকে চাবি নিয়ে আমিই দরজাটা খুললাম। তালা খোলার শব্দ হতেই ভেতরের শব্দটা থেমে গেল।
আস্তে করে দরজাটা ঠেলোম। দরজাটা খুলে গেল। একটা ঠাণ্ডা কনকনে বাতাস যেন আমাদের চুল এলোমেলো করে দিয়ে বেরিয়ে গেল।…..ভেতরে জমাট অন্ধকার।
আমরা পায়ে পায়ে এগোতে লাগলাম। এবার তিনটে টর্চই জ্বলছে।
ঘরের চারিদিকে টর্চের আলো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ফেললাম।
না, কোনো জীবন্ত প্রাণীর অস্তিত্ব নেই।
আমরা আলমারিটার কাছে এসে দাঁড়ালাম। দেখলাম আরো এক হাত আলমারিটা এগিয়ে এসেছে। আর–ইস্! এটা কী?
দেখি আলমারিটার কাছে একটা মস্ত ইঁদুর চেপ্টে থেঁতলে পড়ে আছে। যেন ভারী কোনো জিনিসে চাপা পড়ে মরেছে।
টর্চের আলোয় বিরাট আলমারিটা ভালো করে দেখলাম। আলমারিটাকে একটা ভয়ংকর দৈত্যের মতো লাগছিল।
সেটার সারা গায়ে ঘুষি মেরে দেখলাম। কোনো কিছু ব্যতিক্রম চোখে পড়ল না।
তখন আমি বললাম, জলধর, আলমারিটা খোলো।
জলধর তোতলাতে তোতলাতে বলল, খুলে কি হবে? ওর ভেতরে আমি কিছুই রাখিনি।
যা বলছি তাই করো। তুমি না রাখলেও আগে থেকে কিছু থাকতে পারে।
জলধর নিজে খুলল না। চাবিটা আমার হাতে দিল।
কাঁচ্ শব্দ করে বিরাট দুটো পাট খুলে গেল। একটা বিশ্রী ভ্যাপসা গন্ধ…তিনটে টর্চের আলো বর্শার ফলার মতো গিয়ে পড়ল।
না, কিছু নেই। ফাঁকা আলমারিটা যেন আমাদের গেলবার জন্য হাঁ করে আছে।
আমার মুখ থেকে একটা অস্ফুট শব্দই শুধু বেরিয়ে এল–আশ্চর্য!
তারপর বিশুকে দিয়ে একটা টুল আনিয়ে তার ওপর দাঁড়িয়ে আলমারিটার ভেতরটা দেখতে লাগলাম। আমার কেমন ধারণা ছিল যে ভেতরে নিশ্চয় কিছু থাকবেই।
আমি টুলের ওপর দাঁড়িয়ে। নিচে ওরা দুজন। তিনটে টর্চই জ্বলছে। আর পাশে পিছনে জমাট অন্ধকার। মনে হচ্ছে ঘরের মধ্যে সবকটা মৃত আসবাবপত্র যেন ভুকুটি করে আমাদের কাজকর্ম লক্ষ করছে।
খুট করে একটা শব্দ হলো। সঙ্গে সঙ্গে তিনটে টর্চ ঘুরে গিয়ে পড়ল জীর্ণ একটা সোফার ওপরে।
একটা ছুঁচো।
চোখে আলো পড়ায় ছুঁচোটা ছুটে পালাল।
আমি আলমারির ভেতরের গাগুলো ভাল করে দেখছি। আরে—
ওটা কী?
বাঁ দিকের গায়ে গোলমাথা পেরেকের মতো একটা বোতাম।
কিছু না ভেবেই আমি বোতামটা টিপলাম। সঙ্গে সঙ্গে আলমারির ভেতরের কাঠটা সরে গেলে।
তারপরই যা দেখলাম তাতে আমার মাথাটা ঝিমঝিম্ করে উঠল। তাড়াতাড়ি কাঠটা বন্ধ করে নেমে পড়লাম।
…একটা মড়ার খুলি। দুচোখের কোটরে জীবন্ত মানুষের মতো জ্বলজ্বল করছে চোখ।
হঠাই টর্চগুলো নিভে গেল। আমরা তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বেরোতে গেলাম। কিন্তু অন্ধকারে দরজাটা খুঁজে পেলাম না।
জলধর কেবলই গোঙাচ্ছে–আলো-আলো নিয়ে এসো।
কিন্তু আলো আনবে কি করে?
দরজাটা কোনদিকে তাই ঠাওর হচ্ছে না।
এদিকে আবার সেই শব্দটা শুরু হয়েছে–ঘ্যা-স–ঘ্যাস–ঘ্যাস—
এবার খুবই স্পষ্ট।
কাঠের আলমারিটা পায়ে পায়ে এগিয়ে আসছে..হয়তো ঐ ইঁদুরটার মতোই আমাদের পিষে মারবে।
.
সদাশিবের বিবরণ
ভোর হবার সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞান ফিরে আসে আমাদের। দরজা খুঁজে পাই। আলমারিতে আর দরজায় চাবি লাগিয়ে আমরা ওপরে গিয়ে বসি।
সকাল সাতটা নাগাদ রেণু চা দিয়ে গেল। এরই মধ্যে এক ফাঁকে রেণুকে জিজ্ঞেস করে নিয়েছি লম্বা-চওড়া ঝাকড়া চুল কোনো লোককে এখানে কখনো দেখেছে কিনা। রেণু বলেছে তেমন কাউকে কোনোদিন দেখেনি। কেননা ঐরকম চেহারার লোক একবার দেখলে ভুলত না।
বিশু এরই মধ্যে নিচে দিব্যি তার রোজকার কাজ শুরু করে দিয়েছে। গতরাতের কথা যেন তার মনেও নেই। অসম্ভব অবসন্ন লাগছে জলধরুক। দুচোখের নিচে কালি পড়ে গেছে। ক্লান্ত স্বরে বলল, এখন কি করব রমেন?
বললাম, আমিও বুঝতে পারছি না।
জলধর বলল, ঐ মড়ার খুলিসুদ্ধ আলমারিটা নিয়ে আমি আর এ বাড়িতে থাকতে পারব না।
বললাম, অন্তত খুলিটা ফেলে দেওয়া দরকার। তারপর দেখা যাবে আর কোনো ঘটনা ঘটে কিনা।
