বললাম, খুব ভালো। একদিন তোমার বাবুর কাছে নিয়ে এসো। আমিও থাকব।
.
সারাদিন অপেক্ষা করে ছিলাম কখন জলধরের ফোন আসে। ফোন এল সন্ধ্যেবেলায়।
চাবিটা পেয়েছি।
কোথায় ছিল?
সিঁড়িতে পড়ে ছিল। বিশুই পেয়েছে।
ঐ আলমারির চাবি সিঁড়িতে পড়ে থাকল কী করে?
কি জানি!
এর মধ্যে আলমারিটা খুলেছিলে?
একদিনও না।
আশ্চর্য! ঠিক আছে। আমি যাচ্ছি।
রাত্রে এখানেই থাকবে কিন্তু।
অবশ্যই। বলে টেলিফোন রেখে দিলাম।
কিন্তু তখনই যাওয়া হলো না।
কলকাতা থেকে আমার এক পুরনো বন্ধু তার স্ত্রীকে নিয়ে দেখা করতে এল। তাকে এসব ঘটনা বলতে পারলাম না। শুনে হয়তো হাসবে। কাজেই ওদের সঙ্গে গল্প করতে লাগলাম। ওরা যখন উঠল রাত তখন নটা বাজে।
আজ আর যাব না কথাটা জানিয়ে দেবার জন্যে ফোন করতে যাচ্ছি, ঠিক তখনই জলধর ফোন করল, কী ব্যাপার! তুমি এখনো এলে না কেন?
আমি সব কথা জানিয়ে ওকে যখন বলতে গেলাম কাল সকালেই যাব-ও একেবারে হাঁ হাঁ করে উঠল। বলল, না। এখুনি এসো। রাত্রে আমার এখানে থাকবে।
অগত্যা যেতেই হলো।
সত্যি কথা বলতে কি আমার নিজেরও গা-টা কেমন ছছ করছিল। বিশেষ করে এত রাত্রে ঐ নির্জন পথ দিয়ে যাওয়া। আমি কোনদিন ভৌতিক কাণ্ডকারখানা দেখিনি। ওসব বিশ্বাসও হয় না। কিন্তু জলধরের বাড়িতে কদিন ধরে যা ঘটছে তা আমাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছে। কিছুই না। তবু ঐ আলমারির চাবিটার কথাই ধরা যাক। চাবিটা দোতলায় টেবিলের ড্রয়ারে থাকত। কেউ কোনোদিন হাতও দেয়নি। হাত দেবেই বা কেন? সেই চাবিটা হঠাৎ হাওয়া। পাওয়া গেল সিঁড়িতে। এর মানে কী? মানে কিছুই নেই। সবই রহস্য। একবার ভেবেছিলাম পুলিশে খবর দিতে বলব। কিন্তু ভেবে দেখলাম পুলিশই বা কী করবে? অগত্যা মাঝে মাঝে জলধরকে সঙ্গ দেওয়া ছাড়া আমার আর কোনো কাজ নেই।
আমি যখন সাইকেল নিয়ে বড়ো রাস্তা থেকে ওর বাড়ির দিকের কঁচা রাস্তায় নামলাম, রাত তখন কাঁটায় কাঁটায় সাড়ে নটা।
চারদিক নিস্তব্ধ। শুধু দুপাশের বন-ঝোপের মধ্যে থেকে কোনো পোকা-মাকড় চিক্ চিক্ করে ডাকছে। কিছু দূরে সেই ফসলশূন্য ধু-ধু মাঠটা যেন বিশাল একটা সাদা চাদর মুড়ি দিয়ে পড়ে আছে। দেখলে কেমন গা-ছমছম করে।
আমি জোরে সাইকেল চালিয়ে কঁচা রাস্তা দিয়ে চলেছি। সাইকেলের চাকা কখনও ধুলোয় বসে যাচ্ছে, কখনো খোয়র ওপর পড়ে লাফিয়ে লাফিয়ে উঠছে।
হঠাৎ মনে হলো আমার সামনে দিয়ে একটা লোক হেঁটে যাচ্ছে।
অবাক হলাম–এত রাত্রে এই পথে লোক এল কোথা থেকে? তা ছাড়া একটু আগেও তো দেখতে পাইনি।
লোকটার বিশাল চেহারা। কঁধ পর্যন্ত ঝাঁকড়া চুল–খালি গা–পরনে একটা কপনি মাত্র।
আমি বেল দিলাম। কিন্তু লোকটা শুনল না। তেমনি সামনে সামনে চলেছে।
আমি আবার বেল দিলাম। কিন্তু লোকটার হুঁশ নেই।
এ কিরকম লোক? আমি কি ভুল দেখছি?
বাঁ হাত দিয়ে চোখ কচলে নিলাম। না–ভুল নয়। লোকটা এবার জোরে জোরে হাঁটছে। আর আমার মনে হলো ওর জোরে হাঁটার সঙ্গে সঙ্গে আমার সাইকেলটাও ছুটে চলেছে। আমায় প্যাডেল করতে হচ্ছে না। শুধু হ্যাঁন্ডেলটা ধরে আছি।
কিছুক্ষণের জন্যে আমি বোধহয় বাহ্যিক জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম। হঠাৎ একটা চেঁচামেচিতে আমার সম্বিৎ ফিরল। টর্চের আলো এসে পড়ল আমার মুখে। তারপরই দেখি বিশু ছুটতে ছুটতে আসছে।
এ কী স্যার! কোথায় যাচ্ছিলেন?
ভালো করে তাকিয়ে দেখি আমি সেই মাঠের কাছে দাঁড়িয়ে আছি। সাইকেলটা পড়ে আছে।
এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখলাম। কিন্তু সেই লোকটাকে খুঁজে পেলাম না। যেন মাঠের মধ্যেই অদৃশ্য হয়ে গেছে।
বিশুকে আসল কথা না বলে শুধু বললাম, অন্ধকারে দিকভুল হয়ে গিয়েছিল।
দেখুন দিকি কী সাংঘাতিক ব্যাপার! এই রাত্রে মাঠের মধ্যে গিয়ে পড়লে–আর রক্ষে থাকত না।
তুমি কোথায় ছিলে?
আপনার দেরি হচ্ছে দেখে দাদাবাবু টর্চ দিয়ে পাঠালেন। ভাগ্যি বেরিয়ে পড়েছিলাম।
জলধরকেও সত্যি ঘটনাটা বলিনি। বললে ও বেচারা খুব ভয় পেত।
আমাকে পেয়ে ও খুশি হলো। বলল, এত রাতে আর আলমারি খুলে দরকার নেই। খেয়ে নিয়ে শোবে চলো।
তাই করলাম।
রেণু আগেই চলে গেছে। বিশুও রান্নাঘরে খেয়ে নিল।
ওপরে এসে বললাম, বিশু শোয় কোথায়?
জলধর বলল, ও নিচেই শুতে চেয়েছিল। আমিই ওকে পাশের ঘরে ব্যবস্থা করেছি। খুব সাহসী ছেলে।
ভালো করেছ। বলে মশারির মধ্যে ঢুকে পড়লাম।
নিচে দরজায় খিল বন্ধ করার শব্দ শুনলাম। আগে এ কাজটা জলধরকেই করতে হতো। এখন বিশু করে।
খিল বন্ধ করার শব্দটা শুনে মনে হলো–এবার বোধ হয় গভীর রাতের পালা শুরু হবে। জানি না আজ রাত্রে তেমন কিছু ঘটবে কিনা।
আর কিছু ঘটুক বা না ঘটুক–আসবার সময় যা দেখলাম আর যা ঘটতে যাচ্ছিল তা ভাবতেও শিউরে উঠলাম। আমি চোখ বুজিয়ে অনেকক্ষণ চিন্তা করতে লাগলাম–সত্যিই কি কিছু দেখেছিলাম? নিশ্চয় দেখেছিলাম। এখনও তো তার সেই বিরাট শরীরটা চোখের সামনে ভাসছে, আর যদি চোখের ভুলই হয় তাহলে আমি মাঠের ধারে চলে গিয়েছিলাম কি করে? জলধরের বাড়ি তো আমি কম দিন আসছি না যে সত্যিই পথ হারিয়ে ফেলব?
ঠিক করলাম কাল সকালে রেণুকে আড়ালে ডেকে জিজ্ঞেস করব ঐরকম চেহারার কোনো লোকের কথা শুনেছে কি না।
.
ভাবতে ভাবতে কখন এক সময়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে গেল। অনেক দূরে কোথাও যেন একটা শব্দ হচ্ছে। এ শব্দ আগের দিনের মতো নয়। এ শব্দটা যেন কোনো ভারী জিনিস টানার শব্দ।
