সে তোমার যা ইচ্ছে তাই করবে। বিদেয় করব বললেই তো আর অত বড়ো আলমারিটা বিদায় করা সম্ভব নয়। কে কিনবে? অত বড়ো আলমারি সে কোথায় রাখবে? সবাই তো আর তোমার মতো পাগল নয়। কিন্তু আমি ভাবছি অন্য কথা–মাঠের ঐ অদ্ভুত ঝড়ের সঙ্গে ঘরের শব্দর সম্পর্ক কী?
জলধর বেজার মুখে বলল, সম্পর্ক নিয়ে তুমি মাথা ঘামাও। আমি বুঝতে পারছি ভূত প্রেতের পাল্লায় পড়েছি। এবার মরতে হবে।
আমি হেসে ওকে সাহস দিয়ে উঠে পড়লাম। কাল রাত্তির থেকে আমি ঘর-ছাড়া। এখন বাড়ি যাই।
নিচে নামতেই রেণু আমার পিছু পিছু রাস্তা পর্যন্ত এল।
কিছু বলবে?
রেণু মাথা নিচু করে বলল, আজ রাত্তিরেও এখানে থাকবেন তো?
রোজ কি আর থাকা সম্ভব?
রেণুর মুখটা শুকিয়ে গেল।
তা হলে উনি একা কি করে এই বাড়িতে থাকবেন?
আমি ভেবে বললাম, তোমার ভাই-টাই তো আছে। তাদের থাকতে বলো। দুবেলা খাবে, থাকবে। আমি না হয় জলধরকে বলে দেব।
রেণু আর কিছু না বলে ফিরে গেল।
.
গভীর রাতের পালা
কদিন পর সকালে বাড়িতে বসে জলধরের কথা ভাবছিলাম। ওর বাড়িতে সেই এক রাত্তিরের অভিজ্ঞতা যা আমার হয়েছিল, তা জীবনে ভুলব না। সত্যিই রহস্যময় অলৌকিক ব্যাপার। তারপর সেদিন আর একটা কাণ্ড ঘটেছিল। সক্কালবেলাতেই জলধরের ফোন। কাঁপা কাঁপা গলায় ও বললে, রোজকার মতো ঐ ঘরটা ঝাট দিতে গিয়ে রেণু দেখে আলমারিটা খানিকটা সরে গেছে। অত ভারী আলমারি সরাবে কি করে? ভীষণ ভয় পেয়ে গেছে জলধর। আমি তখনই সাইকেল নিয়ে ছুটলাম। দেখি রেণু সিঁড়িতে চুপচাপ বসে। ভয়ে মুখ ফ্যাকাশে।
দাদাবাবু কোথায়?
ও কোনোরকমে আঙুল তুলে দোতলা দেখিয়ে দিল। আমি যেতেই ও বলল, এসব কী হচ্ছে রমেন? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। ওকে নিয়ে আমি একতলায় নেমে এসে ঘরটায় ঢুকলাম। দেখলাম সত্যিই আলমারিটা আঙুল চারেকের মতো সরে এসেছে।
এটা কি করে সম্ভব হলো, কিছুতেই ভেবে পেলাম না।
তারপর দুদিন আর কিছু ঘটেনি। কালও সকালে ফোন করেছিলাম। ও বলল, কাল রাত্রে ও ভালেই ঘুমিয়েছে। রেণু ও ঘরে আর ঢুকতে চাইছে না। তবে রেণুর একটা ভাই এসেছে। সে নাকি খুব ডাকাবুকো। সেই ঘরটা পরিষ্কার করেছে।
আমি নিশ্বাস ফেলে বেঁচেছি। যাক রেণু আমার কথা শুনেছে। একটা জিনিস এই বুঝেছি মানুষ যখন নির্জন জায়গায় একা থাকে তখনই যতরকমের ভয় পেয়ে বসে। যেখানে মানুষের পাশে মানুষ সেখানে ভয় ঘেঁষতে পারে না।
কালকের রাতটা জলধর কেমন কাটাল জানার জন্যে ফোন করব ভাবছি এমন সময়ে টেলিফোনটা ঝঝন্ করে বেজে উঠল। মনে হলো যেন ফোনটা অস্বাভাবিক জোরে বাজল। তাড়াতাড়ি রিসিভারটা তুলে নিলাম।
হ্যাঁ, জলধরই কথা বলছে। ভয়ে ওর গলা শুকিয়ে কাঠ।
আজ প্রায় এক হাত সরে এসেছে আলমারিটা।
বল কী!
হ্যাঁ। শীগগির এসো।
.
ওর বাড়িতে গিয়ে যখন পৌঁছলাম তখন দেখি জলধর সামনের রাস্তায় মাথা নিচু করে পায়চারি করছে। আমায় দেখে কিছু বলল না। শুধু আমার সঙ্গে সঙ্গে বাড়িতে ঢুকল।
আমি প্রথমেই সেই ঘরটার দিকে এগোলাম। দেখি দরজাটা খোলা। একটা উনিশ-কুড়ি বছরের ছেলে ঘর ঝাঁট দিচ্ছে। তাগড়া চেহারা। দেখে মনে হলো ছেলেটার ভয়-ডর বলে কিছু নেই।
বললাম, ঐ কি রেণুর ভাই?
জলধর বলল, হ্যাঁ। দুদিন হলো ও এখানে থাকছে। খুব চটপটে। নাম বিশু।
আমি ভেতরে ঢুকলাম। বিশু ফিক করে এমনভাবে হাসল যেন আমি ওর কত দিনের চেনা।
বললাম, বিশু, তুমি তো দুদিন হলো এ বাড়িতে এসেছে। ভয়ের কিছু দেখেছ বা শুনেছ?
ও তেমনি হেসে বলল, কিছু না।
একটু থেমে বলল, বাবা একদিন আপনার সঙ্গে দেখা করবে।
তোমার বাবা?
হুঁ। খুব বুড়ো। চোখে ভালো দেখতে পায় না। লাঠি ছাড়া চলতে পারে না। তা ও সঙ্গে লোক চাই।
তা তিনি আমার সঙ্গে দেখা করবেন কেন?
ও ঠোঁট উল্টে চলে গেল। অর্থাৎ ওর বাবা কেন আমার সঙ্গে দেখা করবে তাও জানে না।
জলধরকে নিয়ে আমি আলমারিটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। সত্যিই আলমারিটা প্রায় এক হাত সরে এসে একেবারে পিয়ানোটার ঘাড়ের ওপর পড়েছে। মনে হলো কেউ যেন আলমারিটাকে টেনে আনবার চেষ্টা করেছে। অথচ এত ভারী আলমারি কোনো একজন মানুষের পক্ষে টেনে আনা সম্ভব নয়।
তা হলে?
বললাম, জলধর, আলমারিটা খোলো তো দেখি।
আলমারিতে তালা দেওয়া ছিল। জলধর ওপরে উঠে গেল চাবি আনতে। কিন্তু দশ মিনিট কেটে গেল তবু জলধর চাবি নিয়ে এল না।
এদিকে বন্ধ ঘরের মধ্যে থেকে কিরকম একটা গ্যাস উঠছিল। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। আমি বাইরে এসে দাঁড়ালাম। কিছুক্ষণ পরে জলধর শুকনো মুখে নেমে এলো। বলল, কী মুশকিল! চাবিটা খুঁজে পাচ্ছি না।
সে কী? চাবিটা রাখতে কোথায়?
ওপরে টেবিলের ড্রয়ারে।
হতাশ হয়ে বললাম, তাহলে আর কী হবে? চাবিটা পেলে আমায় ফোন কোরো। চলে আসব। মোট কথা আলমারিটা খুলে দেখতে চাই। আর তা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।
চলে আসবার সময়ে রেণুর সঙ্গে দেখা হলো। বললাম, তোমার ভাইকে এনে খুব ভালো করেছ।
কিন্তু দাদাবাবু, বিপদ তো বেড়েই চলেছে। ঐ আলমারিটা দূর করতে না পারলে রেহাই নেই।
তা ঠিকই। কিন্তু মাঠের ওপর ঝড়টা?
রেণুর মুখটা শুকিয়ে গেল।
বলল, বাবাকে বলেছি। বাবা একদিন আপনার সঙ্গে দেখা করবে।
তোমার বাবা তো ওঝা ছিলেন?
হ্যাঁ। এখন বুড়ো হয়ে গেছে। এখন আর ঝাড়ফুক করে না। তবু দেখা করবে।
