আমি হাসি লুকিয়ে বললাম, কিন্তু সে তো গভীর রাত্তিরে। তুমি তো সে ঝড় দেখনি। তাহলে আগে চলে যাও কেন?
রেণু বলল, তেনাদের কেউ যে এ বাড়িতে নেমেছেন।
অবাক হয়ে বললাম, কিসে বুঝলে?
ও কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, সন্ধ্যেরাতে আমি একা রান্নাঘরে কাজ করি। এর মধ্যে দুদিন শুনেছি ঐ পুরনো জিনিসপত্তরের ঘরের দরজা কে যেন ঠেলছে।
তারপর?
সঙ্গে সঙ্গে কেন্টু চেঁচিয়ে উঠত।
কেন্টু কে?
এ বাড়ির কুকুর।
চেঁচিয়ে উঠে দরজার দিকে ছুটে যেত। তারপরই খুব ভয় পেয়ে সিঁড়ির নিচে ঐ বাক্সের পাশে লুকোত।
রেণু থামল।
তারপর? আর কিছু?
হ্যাঁ, পরশুদিন আমি রাত্রে দাদাবাবুর দুধ নিয়ে ওপরে উঠছি–হঠাৎ দেখি ঐ ঘরের দরজার বাইরে কেউ যেন পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। চিৎকার করে ডাকলাম। দাদাবাবু নেমে এলেন। কিন্তু কিছুই নেই। অথচ আমি আমার ছেলের দিব্যি দিয়ে বলতে পারি– আমি ভুল দেখিনি।
একটু থেমে বলল, এ বাড়িতে আমি আর কাজ করব না ঠিক করেছিলাম। কিন্তু দাদাবাবুর খাওয়ার কি হবে ভেবে চলে যেতে পারিনি। এ বাড়িতে ওঁর একা থাকাও ঠিক নয়।
ঠিক আছে রেণু, আর একটা কথা জিজ্ঞেস করব।
রেণু তাকাল।
কবে থেকে তুমি এরকম দেখছ শুনছ বা ভয় পাচ্ছ?
দিন তিনেক।
ঠিক আছে। তুমি যাও।
রেণু চলে গেলে জলধরকে বললাম, আলমারিটা কত দিন হলো কিনেছ?
দিন দশেক আগে।
বেশ। এবার বলো হঠাৎ আলমারিটার খোঁজ কোথায় পেলে?
জলধর একটু চুপ করে থেকে বলল, তুমি তো নন্দগড়ের রাজাদের কথা জানই। রাজা মানে খুব বড়ো জমিদার ক্লাসের।
হ্যাঁ, জানি। প্রচণ্ড দাপট ছিল তাদের। পাইক-পেয়াদা-বরকন্দাজ নিয়ে প্রায় স্বাধীনভাবে রাজত্ব করত। প্রজাদের ওপর খুব অত্যাচার করত।
হ্যাঁ, অত্যাচার যেমন করত তেমনি পুজো-আচ্চা, দান-ধ্যানও করত।
জলধর বলল, নন্দগড়ে গঙ্গা ছিল না। তাই প্রায় তিনশো বছর আগে জমিদার সারদাচরণ গুপ্তিপাড়ায় গঙ্গার ধারে বিরাট রাজবাড়ি তৈরি করেছিলেন। মাঝে মাঝে গঙ্গাস্নান করার জন্যে গুপ্তিপাড়ায় আত্মীয়-স্বজনদের নিয়ে আসতেন।
হ্যাঁ, এসব বাবার মুখে শুনেছি।
রাজা আসা-যাওয়া করেন, অতএব এখানেও ছোটোখাটো অফিস বসল। সেরেস্তাদার, গোমস্তা আর সবার ওপর থাকত নায়েব। রাজারা এখানে অনেক মন্দির, দানশালা খুলেছিলেন, দোলনন্দোৎসব হতো। সেসব দেখাশোনা, খরচপত্তর দেখতেন ঐ নায়েব। তিনিই ছিলেন এরকম রাজার প্রতিনিধি।
জলধর বলতে লাগল, তারপর একদিন জমিদারি প্রথা উঠে গেল। রাজাদের অবস্থা পড়ে গেল। তারা নন্দগড় ছেড়ে কেউ কলকাতায়, কেউ বিলেতে চলে গেলেন জিনিসপত্র জলের দরে বেচে দিয়ে।
গুপ্তিপাড়াতেও কম জিনিস ছিল না। নায়েব সনাতন চৌধুরী খুব চৌকস লোক ছিলেন। তিনি চুপিচুপি অনেক জিনিস হাতিয়ে নিলেন। আর কিছু আসবাবপত্র নিজের জানাশোনা লোকের কাছে বিক্রি করে দিলেন চড়া দামে। বুঝতেই পারছ রাজবাড়ির জিনিস–তার কদরই আলাদা। সবাই কিনতে চায়।
তাই তুমিও কিছু কিনতে চাইলে?
হা, কিন্তু সনাতন চৌধুরীর সঙ্গে আমার আলাপ ছিল না। আর উনিও চট করে কাউকে পাত্তা দিতেন না। রাজ-এস্টেটের নায়েব তো। খুব উঁট।
তারপর কি করলে বলো।
নন্দগড়ের শেষ রাজা দেবকুমারের কুলপুরোহিত সদানন্দ ব্রহ্মচারীর সঙ্গে বাবার খুব ঘনিষ্ঠতা ছিল। তিনি নবদ্বীপে থাকেন। এখন তো আর রাজ-এস্টেট নেই, পুজো-পার্বণ উঠে গেছে। সদানন্দ নবদ্বীপে নিজেই পুজো-আর্চা নিয়ে থাকেন। বাবা যৌবনকালে তার কাছে প্রায়ই যেতেন। বাবাকে তিনি খুব ভালোবাসতেন।
রাজবাড়ির জিনিসপত্র বিক্রি হচ্ছে শুনে আমি একদিন নবদ্বীপে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করলাম।
অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, তিনি এখনও বেঁচে আছেন?
জলধর বলল, হ্যাঁ, দিব্যি আছেন। বয়েস চুরানব্বই। কিন্তু বয়স তাকে ছুঁতে পারেনি। আমি তাকে পরিচয় দিয়ে আমার ইচ্ছের কথা বললাম। তিনি তখনই সনাতন চৌধুরীকে চিঠি লিখে দিলেন–যে জিনিস আমি পছন্দ করব তাইই যেন ন্যায্য দামে দেন।
সদানন্দ আরও বললেন, তুমি যেদিন গুপ্তিপাড়ায় কিনতে যাবে, আমায় নিয়ে যেও। আমি জিনিসগুলো একবার দেখব। কেননা রাজবাড়ির সব আসবাবপত্রের তালিকা ইতিহাস আমার কাছে আছে।
জলধর একটু থামল। তারপর বলল, আমায় যেতে একটু দেরি হলো। কিনব বলে টাকা-পয়সা যোগাড় করে যখন নবদ্বীপে গেলাম, তার দুদিন আগে সদানন্দ ব্রহ্মচারী কাশী চলে গেছেন। ফিরতে মাস তিনেক দেরি হবে। আমার আর তর সইছিল না। পাছে ভালো ভালো জিনিস হাতছাড়া হয়ে যায়–তাই ব্রহ্মচারীজির চিঠিটা নিয়েই গুপ্তিপাড়া চলে গেলাম। দেখলাম কুলপুরোহিত বলে সদানন্দ ব্রহ্মচারীকে সবাই এখনও খাতির করে। সনাতন চৌধুরী সাদরে আমাকে রাজবাড়ির জিনিসপত্রের ঘরে নিয়ে গেলেন। সেই ঘরেই আমি ওই আলমারিটা দেখলাম। দেখামাত্রই পছন্দ হয়ে গেল। কেননা এত বড়ো আবলুশ কাঠের আলমারি বড়ো একটা চোখে পড়ে না। দরদস্তুর করে টাকা দিয়ে–লরির ওপর চাপিয়ে আলমারিটা নিয়ে এলাম।
জলধর একটু থামল। তারপর বলল, নিয়ে তো এলাম। কিন্তু তারপর থেকেই এই তো অবস্থা দেখছ!
বললাম, এখনও পর্যন্ত যা জানলাম তাতে মনে হচ্ছে যেহেতু ঐ আলমারিটা আনার পর থেকেই শব্দটব্দ হচ্ছে তখন রহস্যের মূলে ঐ আলমারিটাই।
হা, আলমারিটা যে ভৌতিক তাতে আমার কোনো সন্দেহ নেই। ওটাকে বিদেয় করব।
