বলে টর্চটা সিঁড়ির নিচে ফেলল। দেখলাম, একটা প্যাকিং বাক্সের আড়ালে কুকুরটা কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে। মুখটা দেওয়ালের দিকে। যেন এদিকের কিছু দেখবে না– শুনবে না।
কুকুরটাকে আমি কয়েক মুহূর্ত লক্ষ করলাম।
দুম্ দুম্ শব্দটা কিছুক্ষণের জন্য থেমেছিল। আবার শুরু হলো।
আমি টর্চ জ্বালিয়ে তরতর করে নিচে নেমে এলাম। প্রথমে মনে হয়েছিল শব্দটা রান্নাঘরের পাশ থেকে আসছে। সেই দিকে ছুটে গেলাম কিন্তু তখনই মনে হলো শব্দটা বাঁ দিকের ভাড়ার ঘর থেকে আসছে। সেখানে গিয়ে যখন দাঁড়ালাম তখন মনে হলো শব্দটা বাইরে থেকে আসছে। ছুটলাম মাঠের দিকে। যেমন করে হোক শব্দটার কারণ আবিষ্কার করতেই হবে।
আমি হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে মাঠের দিকে ছুটছি তো ছুটছি পিছনে জলধর চিৎকার করে উঠল, রমেন, কোথায় যাচ্ছ? ফিরে এসো।
আমি থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম। তাই তো পাগলের মতো কোথায় ছুটছিলাম! এখানে তো কোনো শব্দ নেই। ঠিক তখনই আবার গুন্ গুন্ শব্দ। এবার মনে হলো বাড়ির মধ্যে থেকেই শব্দটা আসছে। ছুটে এলাম বাড়িতে।
কোথায় যাচ্ছিলে? শব্দ তো কাছেই। ঐ শোনো! এই যে–এই যে–এই ঘরে–
জলধর এসে দাঁড়ালো ওর সংগ্রহশালার দরজার সামনে। ও যা কিছু পুরনো জিনিস আজ পর্যন্ত কিনেছে সব এই ঘরে রাখা।
দাঁড়াও। তালাটা খুলি। বলে জলধর ফতুয়ার পকেট থেকে চাবি বের করে তালা খুলতে লাগল। আমি টর্চটা জ্বালিয়ে ধরে রইলাম। দেখলাম ভয়ে উত্তেজনায় ওর হাত কাঁপছে।
ঝনাৎ করে শেকলটা দরজার ওপর আছড়ে পড়ল। আমি দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই শব্দটা থেমে গেল। আর একটা ঠাণ্ডা বাতাস কাঁপুনি ধরিয়ে দিল।
এ ঘরের বাতাসটা দেখছি খুব ঠাণ্ডা।
ও কোনো উত্তর দিতে পারল না।
একটা জিনিস পরিষ্কার হয়ে গেল জলধর, এই ঘরটা থেকেই শব্দটা হয়। তুমি বাইরে গিয়ে শোনো শব্দটা আর অন্য কোথাও হচ্ছে না।
জলধর একবার বাইরে থেকে ঘুরে এসে বলল, ঠিকই বলেছ। শব্দটা কোথাও নেই।
কিন্তু যে দু মিনিট জলধর বাইরে ছিল সেই দু মিনিট একলা এই ঘরে দাঁড়িয়ে আমার শরীরের মধ্যে কেমন অস্বস্তি হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল কেউ যেন আমার গলা টিপে নিশ্বাস বন্ধ করে দেবার চেষ্টা করছিল। সে কথাটা অবশ্য জলধরকে বললাম না। ও তা হলে ভয় পাবে। ওকে তো একা এ বাড়িতে থাকতে হয়।
আমি টর্চের আলোটা চারদিকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ফেলতে লাগলাম। জিনিসপত্রে ঘর ঠাসা। সবই পুরনোকালের জিনিস। আর এই সব পুরনো জিনিসের একটা বিশেষ গন্ধ আছে। সেই গন্ধটা পাচ্ছিলাম।
তিন-চারটে পুরনো সোফা, দুটো ছেঁড়া কোচ–ভেতরের স্প্রিং বেরিয়ে এসেছে। একটা কাঠের মস্ত রাজকীয় চেয়ার। অসাধারণ কারুকার্য। মস্ত একটা পাথরের খোদাই করা কালীমূর্তি। দেখলে ভয় করে। দেওয়ালে দেওয়ালে টাঙানো বাইসনের শিং, হরিণের শিং, বাঘছাল। সবগুলিরই গায়ে টিকিট লাগানো। কবে কোথায় এই জিনিসগুলি পাওয়া গিয়েছে–এগুলি কতকালের পুরনো জলধর তা লিখে রেখেছে। ওদিকে দেখলাম সেই অকেজো পিয়ানোটা অনেকখানি জায়গা জুড়ে পড়ে রয়েছে–
কিন্তু–এটা কি?
আমি চমকে দু পা পিছিয়ে এলাম।
ঘরটা অন্ধকার বলেই ঠাওর করিনি আমার সামনেই–একরকম পথ আগলে দাঁড়িয়ে রয়েছে কুচকুচে কালো একটা কিছু।
টর্চ ফেললাম। একটা বিরাট উঁচু আলমারি।
এটা আবার কবে আমদানি করলে?
জলধর বলল, গত সপ্তাহে।
কোথায় পেলে?
কাল সকালে বলব।
আমি আলমারিটার চারপাশ ঘুরে দেখলাম। টোকা মেরে কাঠ পরীক্ষা করলাম। লোহার পাতের মতো শক্ত। এ ধরনের আলমারি আমি তো কখনও দেখিইনি, খুব কম জনেই দেখেছে। আলমারিটা যে খুব ধনী কোনো ব্যক্তির শখের জিনিস তা বলাই বাহুল্য। কেননা এত বড়ো আলমারি কারোর কোনো কাজে লাগে না। আমি একটু নড়াতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু পারলাম না।
বললাম, খুব ভারী মনে হচ্ছে। ভেতরে কি আছে?
কিছুই না। খালি আলমারি। একটা তাকও নেই। খুলব?
এখন দরকার নেই। কাল দেখব। চলো শুইগে। ঘুম তো আর হবেই না। চোখে খুঁজে পড়ে থাকা যাবে ঘণ্টা দুয়েক।
আমরা দরজা বন্ধ করে ওপরে এসে শুয়ে পড়লাম।
.
নন্দগড়ের রাজবংশ
রেণু খুব সকালেই আসে। এদিনও তার ব্যতিক্রম হয়নি। চা, টোস্ট আর ডিমসেদ্ধ দিয়ে যখন চলে যাচ্ছিল তখন রেণুকে বললাম, তোমায় কতকগুলো কথা জিজ্ঞেস করব। ঠিক ঠিক উত্তর দেবে। একটি কথাও লুকোবে না।
রেণু বলল, লুকোবো কেন? আমি তো কোনো অন্যায় করিনি। যা দেখেছি, যা বুঝেছি তাই বলব।
একটু থেমে বলল, আপনি কি এখুনি জিজ্ঞেস করবেন?
হ্যাঁ, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব জানা দরকার।
বলুন। বলে রেণু মাটিতেই গুছিয়ে বসল।
তুমি রাত্রে সাধারণত কখন বাড়ি ফের?
দাদাবাবুকে খাইয়ে, বাসন মেজে, রান্নাঘর পরিষ্কার করে রাত নটা নাগাদ।
কিন্তু কয়েকদিন তুমি তাড়াতাড়ি চলে যাচ্ছ। কেন?
রেণু একটু চুপ করে থেকে বলল, এ বাড়ি ভয়ের কারণ হয়ে উঠেছে।
কিরকম?
কিছুদিন ধরে সন্ধ্যেরাতেই ঐ মাঠে ঝড়ের লক্ষণ দেখতে পাই। পরে শুনেছি গভীর রাতে ঝড়ের শব্দ ওঠে। আমি এখানকার মেয়ে। আমার বাবা নামকরা ভূতের ওঝা। বাবা বলেন–ঐ মাঠে যখন দোঠেলা বাতাস বইবে তখন সাবধান থাকবে।
বললাম, দোঠেলা বাতাসটা কি?
রেণু বলল, দুমুখো বাতাস যা বড়ো একটা ঘটে না।
ঘটলে কি হয়?
আসলে দোঠেলা বাতাসে ভর করে খারাপ আত্মারা ঘুরে বেড়ায়। যেখানে নামে সেখানে সর্বনাশ করে দেয়।
