কে তুমি? বলেই টর্চ ফেললাম।
এ কী রেণু!
ও ঠোঁটের উপর আঙুল চেপে চুপ করে থাকতে ইশারা করল। তারপর ফিফিস্ করে বললবাবুকে একটু দেখবেন। ওঁকে এখানে একা ফেলে রেখে যাবেন না। খুব খারাপ সময়। বলেই তরতর করে নিচে নেমে গেল।
আমি তো হতভম্ব। রেণু অমন চুপি চুপি ওপরে উঠে এল কেন? কেনই বা বলে গেল, খুব খারাপ সময়। বাবুকে দেখবেন? এর আগে তো কখনো এমন করে বলেনি। হঠাৎ কী এমন ঘটল যে জলধর গম্ভীর হয়ে আছে? সারা বাড়ি যেন থথম্ করছে?
একটু পরে সদর দরজায় খিল্ দেওয়ার শব্দ শুনতে পেলাম। বুঝলাম রেণু চলে গেল। জলধর দরজা বন্ধ করে উঠে আসছে।
সোফায় আরও কিছুক্ষণ বসে রইলাম। জলধর চোখ বুজিয়ে সিগারেট খেতে লাগল। কথা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। তাই বললাম, রেণু চলে গেল?
হ্যাঁ।
ওর আজকে তাড়া আছে দেখলাম।
এবারও জলধর সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল, হ্যাঁ।
তারপর বলল, চলো শোওয়া যাক।
আমি আবার ঘড়িটার দিকে তাকালাম। সবে রাত নটা। মনে মনে ভাবলাম–হ্যায় কপাল! এখুনি শুতে হবে। শুধু তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়ার জন্যেই কি ও নেমন্তন্ন করে আনল?
কিন্তু প্রতিবাদ করলাম না। প্রতিবাদ করতে ইচ্ছেও করল না। কেননা, আজকে এই জলধর যেন আমার চিরপরিচিত জলধর নয়। ও হঠাৎ কিরকম বদলে গিয়েছে। ওর হাসিখুশি ভাবটাই নেই। সবসময়ে ও যেন কিছু চিন্তা করছে।
যাই হোক আমরা বিছানায় গিয়ে ঢুকলাম। বড়ো খাট। স্বচ্ছন্দে চারজন শুতে পারে। নিখুঁতভাবে বিছানা পাতা, মশারি টাঙানো। এর আগেও এই বিছানায় আমরা শুয়েছি পাশাপাশি। আজও শুলাম। আগে গল্প করতে করতেই রাত কাবার হয়ে যেত। কিন্তু আজ ও চুপচাপ শুয়ে আছে।
আমি লক্ষ্য করলাম একটা বেডসুইচ ওর ডান হাতের কাছে ঝুলছে। এটা আগে ছিল না।
বেডসুইচটা নতুন করালে?
হ্যাঁ, রাত্রে উঠতে হলে এটা কাজে দেয়।
এ তো সবাই জানে। কিন্তু হঠাৎ আজ কেন?
তবু সে কথা জিজ্ঞেস করতে পারলাম না। জিজ্ঞেস করে লাভ নেই।
একটু পরে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার কি হয়েছে বলো তো।
ও বললে, জানি না।
তুমি যদি এইভাবে আমাকে এড়িয়ে যাও তাহলে ডাকলে কেন? শুধু মাংস-ভাত খাওয়ানোর জন্যে নিশ্চয় নয়?
ও বলল, রাতটা কাটুক। কাল সকালে বলব।
বলে পাশ ফিরে শুলো।
আগেই বলেছি, এর আগেও অনেকবার এ বাড়িতে খেয়েছি, শুয়েছি। কিন্তু এবার এবার সবই যেন অদ্ভুত।
জলধর বেলা সাড়ে আটটার আগে কখনো ওঠে না। আজ নটা বাজতে না বাজতেই ফোন করল। সাতসকালে উঠে আমাকে ফোন করার কারণ বুঝতে পারলাম না।
এ বাড়িতে যখন আসতাম তখন দুপাশে ঝোপে-ঝাড়ে, অজস্র ফুল ফুটে থাকত। এবার দেখলাম, ফুলগুলো যেন ঝরে যাচ্ছে।
জলধরের একটা পোষা দিশি কুকুর আছে। সে রোজ বিকেলে দরজার কাছে বসে থাকত। আমায় দেখলেই আনন্দে লেজ নাড়ত। আজ কুকুরটাকে দেখলাম না।
বাড়িতে ঢুকেই কেমন যেন অস্বাভাবিক থমথমে ভাব লক্ষ্য করলাম। অথচ বাড়িতে জলধর আছে, অনেক দিনের পুরনো রেণুও আছে।
সিঁড়িতে উঠতে উঠতে পাখির খাঁচাগুলোর দিকে তাকিয়েছিলাম। অন্ধকারে যদি ভুল দেখে না থাকি তাহলে মনে হয়েছে পাখিগুলো যেন হঠাৎ ভয় পেয়ে জড়োসড়ো হয়ে আছে।
রেণুর তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে যাওয়া–লুকিয়ে আমার সঙ্গে দেখা করা–সবই অদ্ভুত।
আর সবচেয়ে আমায় স্তম্ভিত করে দিয়েছে জলধরের গুম হয়ে থাকা। গল্প করা তো দূরের কথা–দু-একটা মামুলি হা না করে ঘুমিয়ে পড়েছে। এসবের মানে কি?
ভাবতে ভাবতে কখন এক সময়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ মনে হলো কে যেন আমায় দু হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরেছে..তাকালাম। দেখি-জলধর।
কি হয়েছে?
জলধর চাপা গলায় বলল, কিছু শুনতে পাচ্ছ?
কই? না।
ভালো করে কান পেতে শোনো।
এবার শুনতে পেলাম। সোঁ সোঁ করে ঝড়ের আওয়াজ। যেন দুরন্ত কালবৈশাখী ঝড় উত্তর দিকের মাঠগুলোর ওপর দিয়ে ছুটে আসছে।
শুনতে পাচ্ছ?
হ্যাঁ, ঝড় উঠেছে।
না। ঝড় নয়। এদিকে জানলার দিকে তাকিয়ে দ্যাখো।
দেখলাম। জমাট কালো অন্ধকার। সার সার নারকেল গাছগুলো নিশ্চল প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে। ঝড়ের চিহ্নও নেই।
অদ্ভুত তো!
আমি উঠে বসলাম।
তাহলে কিসের শব্দ ওটা?
অপেক্ষা করো। আরও কিছু শুনবে।
হঠাৎ মেঠো ঝড়টা থেমে গেল। তারপরেই দুম্ দুম্ করে শব্দ।
শুনতে পাচ্ছ?
হ্যাঁ। কিন্তু কিসের শব্দ?
সেটাই তো জানবার জন্যে তোমায় রাতে থাকতে বলা। আজ তিন দিন ধরে প্রতি রাত্রে এই রকম শব্দ। বললে হয়তো বিশ্বাস করতে না। তাই ডেকে এনেছি।
শব্দটা যে একটানা হচ্ছিল তা নয়, মাঝে মাঝে থেমে যাচ্ছিল।
শব্দটা নিচ থেকে আসছে বলে মনে হচ্ছে।
হ্যাঁ।
তুমি কোনোদিন নিচে নেমে দেখেছ?
না। সত্যি কথা বলছি সাহস হয়নি।
এমনি সময়ে আবার সেই দুম দুম্ শব্দ।
চলো দেখে আসি।
দরকার নেই। এখন কী কর্তব্য বলো।
বললাম, ভালো করে না দেখে কি করে বলব? তুমি না যাও, আমিই যাচ্ছি। বলে আমি মশারির ভেতর থেকে বেরিয়ে এলাম। সুইচ অন করলাম। কিন্তু আলো জ্বলল না।
জানি জ্বলবে না। পুরো বাড়ি অন্ধকার।
হোক অন্ধকার। টর্চ আছে।
আমি টর্চ জ্বেলে নিচে নামতে লাগলাম। দেখি পিছনে পিছনে জলধরও নামছে।
তুমি আবার আসছ কেন?
কি করব? তোমায় একা ছেড়ে দিতে পারি?
তোমার একটা কুকুর ছিল না? সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে জিজ্ঞেস করলাম।
এখনও আছে। তবে কদিন ধরে কিরকম হয়ে আছে। বোধহয় রোগে ধরেছে। আর বাঁচবে না। ঐ যে–
