হ্যাঁ, শোনো। রেণু বলছে তুমি একটু তাড়াতাড়ি এসো। ও তো রাত্রে বাড়ি চলে যায়। আজ সাড়ে আটটার মধ্যেই খাইয়ে-দাইয়ে চলে যাবে।
আচ্ছা! বলে ফোন ছেড়ে দিলাম।
মুশকিল। আটটার সময় কি ক্ষিধে পায়? তার মানে ভালো করে খাওয়াই হবে না।
.
জলধরের আচরণ
জলধরের বিরাট দোতলা বাড়িটা শহরের একেবারে বাইরে। পেছনে মাঠের পর মাঠ। বড়ো রাস্তা থেকে একটা সরু পথ এসেছে বাড়িটার কাছে। এই পথের দুধারে ঝোপঝাপ। বুনো ফুলে ভরে থাকে। বাঁ দিকে একটা ভাঙা শিবমন্দির। এদিকে-ওদিকে কয়েক ঘর আদিবাসী আর চাষীর ঘর। বলাই বাহুল্য জায়গাটা খুবই নির্জন। ভাবতে ভাবতে অবাক লাগে এইরকম জায়গায় কেন জলধরের বাপ-ঠাকুর্দা বাস করতেন। এখনই এইরকম অবস্থা–যাট-সত্তর বছর আগে তাহলে কী অবস্থা ছিল সহজেই তা অনুমান করা যায়। জলধর বলে–পিছনের এই মাঠগুলো একসময়ে সবই ঠাকুর্দার ছিল। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও ফসল ফলাতে পারেননি। এ একটা আশ্চর্য ব্যাপার। জলধর অবশ্য অর্ধেক জমি বেচে দিয়েছে একজন কারখানার মালিককে। যে টাকা পেয়েছে তাতে পায়ের ওপর পা দিয়ে বসে খাচ্ছে। আর মনের আনন্দে পুরনো জিনিস কিনে বেড়াচ্ছে।
আমি যখন টর্চ নিয়ে ওদের বাড়ি পৌঁছলাম তখন ঠিক সন্ধ্যে। বিকেলের দিকে বড়ো একটা যাই না। যদি একান্তই যেতে হয় তা হলে টর্চ নিয়ে যাই। জায়গাটা খারাপ। অন্তত সাপের ভয় খুব। কিন্তু একথা জলধরকে বলার উপায় নেই। বললেই চটে যায়। রাগ করে বলে–যত ভয় তোমারই। কই এতকাল আমরা রয়েছি, সাপে কাটা তো দূরের কথা–চোখেও পড়েনি কখনও। তবে হ্যাঁ, শেয়াল, বনবিড়াল আছে। তারা তো আর তেড়ে আসে না।
আমি এ নিয়ে তর্ক করি না। নিজে সাবধান থাকি।
কড়া নাড়তেই জলধর নিচে নেমে এসে দরজা খুলে দিল। অন্যবার প্রাণ খুলে হাসে। এবারও একটু হাসল। কিন্তু তাতে প্রাণের স্পর্শ নেই।
তোমার কথাই ভাবছিলাম। এসো।
আমার কথা ভাববার কি আছে? আসব বলেছি যখন আসবই। তা ছাড়া নেমন্তন্ন বলে। কথা।
আমার এই সরস মন্তব্যের জলধর কোনো উত্তর না দিয়ে ওপরে উঠতে লাগল। সিঁড়ির পাশে দেখলাম বিরাট বিরাট খাঁচা ঝুলছে। আমি জানি ওগুলোতে সব নানা জাতের পাখি আছে। একতলার উঠোনের ওদিকে একটা ঘরে আলো জ্বলছে। দেওয়ালে একটা ছায়া নড়ছে। হঠাৎ দেখলে গাটা ছমছম করে ওঠে।
কিন্তু ওটা যে জলধরের রাঁধুনী রেণুর ছায়া তা আমি জানি।
দোতলায় বেশ বড়োসড়ো চৌকোনো জায়গা। এখানে চারদিকে চারটে পুরনো অর্থাৎ বাপ-ঠাকুর্দার আমলের সোফা। মাঝখানে একটা সেন্টার টেবিল। টেবিলের ওপর ফুলদানি। একটা অ্যাশ-ট্রে। হঠাৎ লোডশেডিং হলে জ্বালাবার জন্যে একটা মোটা মোমবাতি কাচের স্ট্যান্ডে লাগানো। পাশেই দেশলাই। এসব ছাড়াও বেশ কয়েকটা ছোটো-বড়ো নতুন ধরনের পাথর। ওর পাথরের collection আমি নিচের ঘরে দেখেছি। তবু বোধহয় লোককে দেখাবার জন্যেই কয়েকটি নমুনা সেন্টার টেবিলে যত্ন করে রেখে দিয়েছে।
মুখোমুখি দুটো সোফায় আমরা বসলাম। ও বলল, চা না কফি?
আমি জানি একে ক্ষিধের বালাই নেই। তার ওপর যদি এখন চা কফি খাই তা হলে ক্ষিধের বারোটা বেজে যাবে। তাই বললাম, কিছু না।
ও তার জন্য দুঃখিত হলো বলে মনে হলো না। বরঞ্চ যেন নিশ্চিন্ত হলো।
আমি বললাম, তা হঠাৎ নেমন্তন্ন করার কারণ কী?
ও একটু গম্ভীর হয়ে বলল, সে তো সকালেই বলেছি চুপচাপ একা থাকি। ভালো লাগে না।
ব্যস্ এর পর আর কথা চলে না। তবু আমার মনে হচ্ছিল এই হঠাৎ নেমন্তন্ন করার পিছনে কোনো কারণ নিশ্চয় আছে। ও চেপে যাচ্ছে। নইলে সকাল নটা বাজতে না বাজতেই ফোন করল কেন? একটু বেলাতে করতে পারত।
যাই হোক ও প্রশ্ন আর করলাম না। অন্য প্রসঙ্গ নিয়ে গল্পগুজব চলল।
একসময়ে হঠাৎ ও চকিত হয়ে উঠল। বলল, এবার খাওয়াটা সেরে নিই কি বল?
গির্জার আকারে পুরনো দেওয়াল ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখলাম সবে পৌনে আটটা। অনিচ্ছা সত্ত্বেও বললাম, বেশ তো।
তা হলে চলো নিচে যাই।
আমি জানি খাবার ব্যবস্থা নিচের ঘরে। ওপরেও ব্যবস্থা ছিল, কিন্তু রেণুর পক্ষে দুজনের খাবার বয়ে আনা অসুবিধে।
অন্যবার খাবার সময় জলধর এক নাগাড়ে বক্ করে যায়। বিষয় সেই একই কোথায় কোন প্রাচীন জিনিসের সন্ধান পেয়েছে তারই ফিরিস্তি। এই সব collection নিয়ে একটা একজিবিশান করার ইচ্ছেও ও বারে বারে প্রকাশ করেছে। কিন্তু আজ একেবারেই চুপ। একবার শুধু বলল, আর কি নেবে চেয়ে নিও।
মনে মনে রাগলাম। সন্ধ্যেরাতে কি ক্ষিধে হয় যে বেশি খেতে পারব?
খাওয়ার পর ও বলল, তুমি ওপরে গিয়ে বসো। আমি যাচ্ছি।
আমি জানি ও এখন ওর পাখিদের পরিচর্যা করবে। সব খাঁচাগুলো খুলে খুলে দেখবে যথেষ্ট দানাপানি আছে কিনা।
শীতকাল হলে খাঁচাগুলো ওপরে হালকা কিছু দিয়ে ঢাকা দিয়ে দেয়। তারপর খাঁচার দরজাগুলোর ছিটকিনি ভালো করে পরীক্ষা করে। এখানে খটাসের খুব উৎপাত। সারা রাত পাখির খাঁচার দিকে ছোঁক ছোঁক করে ঘুরে বেড়ায়। সমস্ত একতলাটা তো তখন একদম খাঁ-খাঁ করে।
আমি ওপরে এসে সোফায় সবে বসেছি, হঠাৎ মনে হলো সিঁড়ির দরজার আড়াল থেকে কে যেন উঁকি মারল।
আমি চমকে উঠলাম।
কে ওখানে? চাপা গলায় জিজ্ঞেস করলাম।
উত্তর দিল না কেউ।
আমি তখন উঠে গেলাম। দরজার পাটটা ঠেলে খুলে দিলাম। কেউ একজন দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
