চলতে চলতেই অভিজিৎ নিজের হাতে চিমটি কাটল। না, বেঁচেই আছে।
জুলি, হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে? এতক্ষণে অভিজিৎ কথা বলল।
না। ছোট্ট উত্তর দিল জুলি। হঠাৎ এক সময়ে তারা দেখল চঞ্চল নেই। চঞ্চল-চঞ্চল চেঁচিয়ে ডাকল অভিজিৎ।–কোথায় তুমি? সাড়া পেল না।
এখন এই সন্ধের মুখে কোন দিকে যাবে? লারসিংগার বাংলোটা কতদূর?
হঠাৎ জুলি আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল, দাদা, রেলস্টেশন।
তাই তো। এগিয়ে গেল তারা স্টেশনের দিকে। শিলচর স্টেশন! যাক তবু এখানে জীবন্ত মানুয আছে।
এখানে যখন এসে পড়েছে তখন আর ভাবনা নেই। একটা ঘোড়ায় টানা টাঙ্গা গোছের গাড়ি দাঁড়িয়েছিল। তাদের দিকে গাড়োয়ান এগিয়ে এল। অভিজিৎ জিজ্ঞেস করল, লারসিংগার বাংলো কত দূর?
উত্তর দিল গাড়োয়ান–পনেরো মাইল।
ভাড়া যাবে?
গাড়োয়ান গাড়ির দরজা খুলে দিল। গাড়ি চলতে শুরু করল। বরাইল পাহাড়ের মাথার উপর তখন সূর্য ডোবার লালচে আলো চিকচিক করছে।
কি ভাবছিস জুলি?
চঞ্চলদা এখানেও দেখা দিয়ে গেল। বলতে বলতে তার চোখ দুটো জলে ভরে উঠল।
তাহলে সে এখানে এই বাড়িতে পৌঁছেছিল?
জুলি উত্তর দিল না। সূর্য ডুবে যাচ্ছে। অন্ধকারে ঢেকে যাবে চরাচর।
[শারদীয়া ১৪০৯]
রহস্যময় আলমারি
সাতসকালে ফোন
বেলা তখন নটা।
সবে দ্বিতীয়বার চা খেয়ে কাগজটা পড়ছি, এত সকালে টেলিফোন করছে কে?
মফস্বর শহরে এখন ঢালাও টেলিফোন দিচ্ছে–এমনকি s.T.D.-ও। আমিও নিয়েছি একটা। লোকদেখানো ছাড়া আর কি? কেননা এই ছোটো শহরে কে আর কত ফোন করবে? দরকার হলে পনেরো কুড়ি মিনিট পায়ে হেঁটে কিংবা সাইকেলে চেপে দেখা করে আসা যায়।
তবে একজন আমাকে মাঝে মাঝেই ফোন করে। সে আমার বন্ধু জলধর গাঙ্গুলি। নামটা যেমন সেকেলে, রঙটাও তেমনি জলধরের–মানে জলভরা মেঘের মতোই কালো। মোটাসোটা চেহারা। ছোটো ছোটো চুল। বিয়ে-থাওয়া করেনি। পৈতৃক বাড়িতে একাই থাকে। একমাত্র আমি ছাড়া ওর কোনো বন্ধু নেই। কারো সঙ্গে ও মেশে না। অন্যেও ওর সঙ্গে মিশতে চায় না। তার কারণ আছে। জলধর মানুষটা একটু অন্য ধরনের। তার অদ্ভুত কতগুলো শখ আছে। যেমন নানারকমের পাখি পোষা, পাহাড়-পর্বতে ঘুরে নানারকম পাথর সংগ্রহ করা আর পুরনো আমলের জিনিস কেনা। যেমন এখান থেকে সত্তর মাইল দূরে এক পাদ্রী তার ঠাকুরদাদার পিয়ানোটা বিক্রি করবেন শুনেই জলধর গিয়ে সেটা কিনে নিয়ে এল। যদিও সে কস্মিনকালেও পিয়ানো বাজাতে জানত না। ঐ রকম একটা পিয়ানো কিনে সে দারুণ খুশি। সেদিন আমায় ডেকে পিয়ানোটা দেখাল। সবচেয়ে তাজ্জব ব্যাপার হচ্ছে সেটা বাজেই না।
এ কথা জলধরকে বলায় সে হেসে বলেছিল, তাতে কি? আমি তো আর বাজাব বলে ওটা কিনিনি। একটা ঐতিহাসিক জিনিস বলেই কিনেছি।
ঐ একটা কথা ও শিখে রেখেছে–ঐতিহাসিক। একটা কোনো পুরনো জিনিস পেলেই ও বলে–জানো, দারুণ একটা ঐতিহাসিক জিনিস সস্তায় পেয়ে গেছি।
সঙ্গে সঙ্গে সেটা তার ঐতিহাসিক সংগ্রহশালায় ঠাঁই পেয়ে যায়। সারা দিন সে এই সব নিয়েই ব্যস্ত থাকে। পুরনো আসবাবপত্রগুলো ঝাড়পোছ করে। পোষা জন্তুকে লোকে যেমন আদর করে তেমনি ভাবে এই পুরনো জিনিসগুলোর গায়ে হাত বুলোয়। আবার খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দ্যাখে কলকাতায় কোথাও কোনো পুরনো জিনিস বিক্রি হচ্ছে কিনা। তেমন বিজ্ঞাপন চোখে পড়লে ও আমাকে নিয়ে কলকাতায় যাবে। জিনিসটা ভালো করে দেখবে। নিজের মনে ওর মাথা নাড়া দেখলেই বুঝতে পারি জিনিসটা ওর পছন্দ হয়েছে। তারপর ও যখন জিজ্ঞেস করে–কি হে, জিনিসটা কেমন? আমি তৎক্ষণাৎ বলি–চমৎকার।
ব্যাস্! ওর ঐতিহাসিক সংগ্রহশালায় আর একটি বস্তু এসে ঢোকে।
তা এইরকম মানুষের সঙ্গে কে আর মিশতে চায়? ওরও কারোও সঙ্গে ভাব জমাবার দরকার হয় না।
তবু হঠাৎ ও টেলিফোন নিয়ে বসল। নিজেই বলল, যাক এখন তোমার সঙ্গে কথা বলার সুবিধে হবে। তাই আমি নিশ্চিত জানি এখন টেলিফোন করছে শ্রীমান জলধর ছাড়া আর কেউ নয়। কিন্তু সাতসকালে!–নিশ্চয় কোথাও আবার কোনো ঐতিহাসিক জিনিসের সন্ধান পেয়েছে। তাই ডাকছে।
হ্যালো!
ওপার থেকে জলধরের জলদগম্ভীর গলা পেলাম–শোনো, আজ রাত্রে তুমি আমার বাড়িতে খাবে।
হেসে বললাম–সে তো আনন্দের কথা। কিন্তু হঠাৎ আমাকে আজই নেমন্তন্ন করার উদ্দেশ্য?
ও কিন্তু হাসল না। বলল-উদ্দেশ্য আর কী? রোজ একা একা খাই। আজ একসঙ্গে খাব।
খুব ভালো কথা। কি মেনু করছ?
কি খাবে বলো। মাংস-ভাত?
বেশ। তোমার কাজের মেয়েটি তো ভালোই মাংস রাঁধে।
ও যেন একটু অন্যমনস্কভাবে বলল-হ্যাঁ।
একটু চাটনি করবে তো? মাংসের সঙ্গে একটু চাটনি না থাকলে
ও তেমনি নিস্পৃহভাবে বলল করব। আর শোনো অত রাতে বাড়ি ফিরতে দেব না। আমার এখানেই থাকবে।
আমি একটু ইতস্তত করে বললাম, কত আর রাত হবে? ফিরে আসতে পারব।
জলধর বলল–থাকতে আপত্তি কী? অত রাতে এক মাইল পথ ঠেঙিয়ে ফিরবে কেন? এখানে থাকার কোনো অসুবিধে হবে না।
হেসে বললাম, তথাস্তু।
ফোন ছেড়ে দিলাম। একটু অবাক হলাম। যদিও ও মাঝে মাঝেই উপলক্ষ ছাড়াই নেমন্তন্ন করে, তবু এবার যেন ওর গলার স্বরটা কিরকম। যেন জলধর নয়, অন্য কেউ কথা বলছে। খুব অন্যমনস্কভাবে কথা বলছিল।
সবে মাত্র এসে কাগজটা তুলে নিয়েছি আবার ফোন বেজে উঠল। বিরক্ত হয়ে ফোন ধরলাম। জলধরই।
