টিকটিকি আবার মানুষকে তাড়া করে? আর অত মোটা!
চল ওপরে যাই।
আমার যেতে ইচ্ছে করছে না দাদা।
বাঃ এতদূর এসে দোতলাটা দেখে যাব না? দেখব না সত্যিই ম্যাকবেথের তরোয়ালটা আছে কিনা? কিংবা স্বয়ং ম্যাকবেথের আত্মা সেটা পাহারা দিতে আসে কিনা। সাবধানে আমার পিছু পিছু আয়।
এক ধাপ এক ধাপ করে ওরা উঠতে লাগল। সিঁড়িটা বাঁ দিকে বেঁকে গেছে। বহু পুরনো আমলের নড়বড়ে সিঁড়ি। আর ক ধাপ উঠতেই ওরা দোতলায় এসে পৌঁছল। এটাও নিচের মতোই হলঘর। ওপরেও অনেকগুলো ঘর। ওরা সামনের দিকে এগোচ্ছিল, হঠাৎ দুজনেই কান খাড়া করল, সিঁড়ি দিয়ে ধীরে ধীরে কেউ যেন উঠে আসছে। খসখসখস–কে আসছে? কোথা থেকে আসছে? কেন আসছে? যেই আসুক ঐ পায়ের শব্দ যে কোনো মানুষের নয় সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু
সে সব চিন্তার আগে দরকার কোথাও লুকনো। কোথায় লুকনো যাবে? সিঁড়ি দিয়ে নামা যাবে না। কারণ ঐ সিঁড়ি দিয়েই কেউ উঠে আসছে।
হঠাৎ লক্ষ্য পড়ল ওদিকে আর একটা সিঁড়ি রয়েছে। তাড়াতাড়ি ঐদিকে ছুটে গেল তারা। সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগল। কিন্তু সিঁড়িটা মাঝপথেই একটা ঘরের সামনে শেষ হয়ে গেছে। আর পালাবার জায়গা নেই।
ওদিকে সেই খস খস শব্দ আসছেই–আসছেই–
উপায় নেই দেখে সামনের দরজায় জোরে ধাক্কা দিল অভিজিৎ! দরজা খুলে গেল। জোরে ধাক্কা দেওয়ায় দুজনেই ছিটকে ভেতরে পড়ে গেল। কোনোরকমে উঠে দাঁড়াতেই যে দৃশ্য চোখে পড়ল তাতে তারা আঁতকে উঠল। পর পর ঝুলছে কংকাল। কোনোটারই মাথা নেই। পশ্চিম দিকের একটা ঘুলঘুলি দিয়ে এক ফালি পড়ন্ত বেলার রোদ এসে পড়েছে একটা কংকালের ওপর। তাতেই দেখা গেল থিক থিক করছে পোকা কংকালটার গায়ে। আরও আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে, ঘরে এক ফোঁটা বাতাস নেই। কিন্তু কংকালগুলো দুলছে। কংকালগুলো কি প্রথম থেকেই দুলছিল, না এদের দেখে দুলতে লাগল?
ঘটনার আকস্মিকতা একটু সামলে নিতে না নিতেই আবার একটা ভয়ংকর দৃশ্য। দেওয়ালে ম্লান অক্ষরে বড়ো বড়ো ইংরেজি হরফে লেখা–SLAUGHTER HOUSE যার বাংলা হলো কসাইখানা। লাল হরফে লেখা–কিন্তু অক্ষর বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে–ও কি লাল কালি? না–
উঃ মাগো! এত রক্ত! আর্তনাদ করে উঠল জুলি। পালিয়ে চল দাদা, পালিয়ে চল– দুজনে পালাবার জন্যে পিছু ফিরতেই থমকে গেল। আপাদমস্তক সাদা চাদরে ঢাকা একটা থুথুড়ে বুড়ো–যার পিঠটা কুঁজো হয়ে গেছে বয়সের ভারে, পাকা ধপধপে দাড়ি লুটোচ্ছে। মাটিতে, কুকুতে সবুজ চোখে যার সাপের দৃষ্টি–একটা লাঠি হাতে করে দাঁড়িয়ে আছে দরজা আগলে।
কে এই বুড়ো? শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই-ই কি বাস করে আসছে এই বাড়ির দোতলার ঘরে? এই কি পাঁচশো বছর আগের মৃত ম্যাকবেথ যার মোকাবিলা করতে চেয়েছিল। সাহেব? সাহেব কি এখানে পৌঁছতে পেরেছে?
দুজনে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল সেই বুড়োর দিকে। বুড়ো এগিয়ে এল না, তার ঠোঁট দুটো একটি বারের জন্যেও নড়ল না। শুধু ঘরের বাইরে শকুনের পায়ের মতো তার দুটো বীভৎস পা রেখে কসাইখানার দরজাটা আস্তে আস্তে বন্ধ করে দিল। অভিজিৎ দরজা খোলবার জন্যে পাগলের মতো ছুটে গেল। কিন্তু ততক্ষণে দরজাটা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। অভিজিৎ দরজাটা খোলার জন্যে প্রাণপণ চেষ্টা করল। কিন্তু শক্ত কাঠের দরজা এতটুকু ফাঁকও হলো না। অভিজিৎ মেঝের ওপর আছড়ে পড়ে ডুকরে কেঁদে উঠল–হ্যায় ভগবান!
কিন্তু আশ্চর্য স্থির জুলি। সে বিহ্বল। ভয় পাবার ক্ষমতাটুকুও বুঝি তার নেই। এই কশাইখানার বন্ধ ঘরে এর পর তাদের কী ভয়ংকর পরিণতি হবে তা বুঝতে বাকি নেই।
একটা খটাখট শব্দে দুজনেই চমকে উঠল। দেখল সার সার ঝুলন্ত কংকালগুলো যেন মহা উৎসাহে দুলতে দুলতে একটা অন্যের সঙ্গে ঠোকাঠুকি খেলা শুরু করেছে।
এদিকে বেলা পড়ে আসছে। একটি মাত্র ঘুলঘুলি দিয়ে যে এক ফালি রোদ আসছিল সেটুকুও আর নেই। ঘরে অন্ধকার জমাট বাঁধতে শুরু করেছে।
আর কতক্ষণ তাদের পরমায়ু? কখন কবে তাদের শিরচ্ছেদ হবে? আজ রাত্রেই না কাল সকালে? কোথায় কত দূরে তাদের গোয়ালপাড়া গ্রামে মা-বাবার কথা মনে করে জুলির চোখে জল এল।
এমনি সময়ে দরজাটা নিঃশব্দে একটু একটু করে খুলে যেতে লাগল। ঘাতক আসছে। তাহলে? মৃত্যুর জন্যে প্রস্তুত হয়ে অভিজিৎ উঠে দাঁড়াল।
দরজাটা খুলে গেল।
না, সেই বুড়োটা নয়, একটা অস্পষ্ট ছায়ামূর্তি। জুলি আর অভিজিৎ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। ছায়ামূর্তিটা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠল। অমনি দুজনেই চমকে উঠল–চঞ্চল!
কিন্তু এ কী চেহারা হয়েছে চঞ্চলের! হাড়সর্বস্ব রোগা! মুখটা ঝাপসা। চঞ্চল যেন ইশারায় ওদের বেরিয়ে আসতে বলল। অভিজিৎ আর দেরি করল না, জুলির হাত ধরে টেনে নিয়ে দরজার বাইরে এসে দাঁড়াল। দরজাটা আবার বন্ধ হয়ে গেল।
তারপর তারা চঞ্চলের ছায়ামূর্তির পিছু পিছু যেতে লাগল। কোন ঘরের কোন গোপন দরজা দিয়ে, কোন সুড়ঙ্গপথ ধরে কি ভাবে যে তারা রাস্তায় এসে দাঁড়াল তা তারা ভেবে পেল না।
ভাবার সময়ও ছিল না, দরকারও ছিল না। সঙ্গে যে রয়েছে বিশ্বস্ত বন্ধু চঞ্চল। তারই। পিছু পিছু তারা চলল মাঠ জঙ্গল পেরিয়ে। তারা কি হাঁটছিল? না উড়ছিল?
একবার অভিজিৎ-এর মনে হলো তারা বোধ হয়, বেঁচে নেই। শরীরমুক্ত আত্মা হয়ে তারা চঞ্চলের পিছু পিছু হাওয়ায় ভেসে চলেছে। নইলে এত জোরে কেউ হাঁটতে পারে?
