জঙ্গল–তবে এই জঙ্গল সুন্দরবনের জঙ্গল নয়। পাহাড়ি জঙ্গল। পদে পদে পাথরের ঠোক্কর। সূর্য ক্রমশ মাথার ওপরে উঠল। জঙ্গল যেখানে পাতলা, সেখানেই রোদের দেখা মেলে। নইলে অন্ধকার। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ একসময়ে জুলির মনে হলো, সে যেন অন্য পথে এসে পড়েছে। কিন্তু এটাও বুঝল সে ইচ্ছে করে অন্য পথে চলে আসেনি। কেউ যেন নিজেকে লুকিয়ে রেখে আগে আগে চলেছে পথ দেখিয়ে। কে নিয়ে যাচ্ছে? কেন নিয়ে যাচ্ছে? কোথায়–কোন সর্বনাশের মুখে টেনে নিয়ে যাচ্ছে? যেই নিয়ে যাক সেই আকর্ষণ থেকে নিজেকে সরিয়ে আনা যে কিছুতেই সম্ভব নয় ওরা তা ভালো করেই বুঝতে পারছে।
আর একটা আশ্চর্যের ব্যাপার–এরা কেউ কথা বলছে না। মুখ যেন ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। শুধু লতাপাতা, বনঝোপ ঠেলে তারা হাঁটছে তো হাঁটছেই। একধরনের বুনো গন্ধ নাকে আসছে। কখনও কোনো ফুলের তিক্ত কষা গন্ধ।
চলতে চলতে তারা একটা ফাঁকা জায়গায় এসে পড়ল। যেন অন্ধকার থেকে আলোর দেশে এসে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। রোদের রঙ বুঝিয়ে দিলো বেলা এখন দুপুর। একটু দূরেই দেখা গেল নুড়িবিছানো সরু জলস্রোতের ধারা। আর তার ডানদিকে হাতিছড়া, দলু ও দামছড়ার ঘন দুর্ভেদ্য জঙ্গল যেন গা-ঘেঁষাঘেঁষি করে মাইলের পরে মাইল জুড়ে কালো পাঁচিলের মতো দাঁড়িয়ে। অরণ্যের সেই স্তব্ধ ভয়ংকর চেহারা দেখলে ভয় পায় না এমন মানুষ বোধহয় নেই।
ওরা গোড়ালিডোবা জল স্বচ্ছন্দে পেরিয়ে ওপারে চলে গেল। ঠিকানা জানা নেই, সঙ্গে ম্যাপ নেই তবু ওরা আন্দাজে নাক-বরাবর সোজা এগিয়ে চলল। আবার শুরু হলো বন। তবে এ বন ওপাশের বনগুলোর মতো তেমন গভীর নয়। এখানে ঢুকতেই আশ্চর্য, কেমন হিমেল বাতাস বইতে শুরু করল। বেশ শীত করতে লাগল।
বড্ড শীত করছে না? অভিজিৎ যেন নিজের মনেই কথা বলল।
হ্যাঁ, বোধহয় আমরা মৃতের দেশে এসে পৌঁছলাম।
ঐ দিকটা তাকিয়ে দেখ।
জুলি দেখল বাঁ দিকে পাহাড়ের একটা খাঁজকাটা অংশ যেন খাঁড়ার মতো ঝুলছে। আর তার পিছনে ঘন কুয়াশা। অথচ এখানে কুয়াশার চিহ্নমাত্র নেই। আর একটু জোরে হাঁট বোন। আমরা বোধহয় এসে পড়েছি।
জুলি বলল, আমার পা দুটো অবশ হয়ে যাচ্ছে।
তা হোক। এত দূর এসেছি যখন তখন শেষ না দেখে যাব না।
অভিজিৎ যেন হঠাৎ প্রচণ্ড শক্তির অধিকারী হয়ে উঠেছে। জুলিও জোরে হাঁটবার যথাসাধ্য চেষ্টা করতে লাগল।
খাঁড়ার মতো পাহাড়টাকে বাঁ দিকে রেখে মোড় বেঁকতেই ঘন কুয়াশার মধ্যে দেখা গেল অনেকখানি পাঁচিল ঘেরা জায়গা। নামেই পাঁচিল। আসলে জীর্ণ ভাঙা কতগুলো ইট পরপর সাজানো।
ওরা পাঁচিলের কাছে আসতেই দেখল অনেকগুলো দীর্ঘ সুপুরিগাছ–আর তারই আড়ালে দোতলা একটা বাড়িযে বাড়িটার ছাদ দুদিকে এমনই ঢালু যেন মনে হয় কাছিমের পিঠ।
জুলির হাত এমনই কাঁপতে শুরু করল যে যতক্ষণ না অভিজিৎ তার হাতটা নিজের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরল ততক্ষণ কাঁপুনি থামল না।
অভিজিৎ বলল, আমরা তাহলে সেই ছবির বাড়িটা খুঁজে পেলাম। ঐ দেখ–
জুলি দেখল বাড়ির গায়ে সেই একটা বিকট মুখ বসানো। মুখটার মাথার দুপাশে শিং। ভয়ংকর দুটো চোখ–যে দিক দিয়েই দেখ না কেন মনে হবে তারই দিকে তাকিয়ে আছে। বিকট হাঁ-এর মধ্যে বড়ো বড়ো বাঁকানো দাঁত।
দাদা, ফিরে চল। অনেক পথ হাঁটতে হবে।
অভিজিৎ বলল, এতদূর এলাম। ভেতরটা দেখব না?
বাড়িটা তো দেখা হলো—
কিন্তু ম্যাকবেথের তরোয়াল দেখব না? দেখব না, দোতলায় কে থাকে?
দাদা, ভেতরে ঢোকা মানেই মৃত্যু। একবার মা-বাবার কথা মনে করে দ্যাখ।
সে কথার উত্তর না দিয়ে অভিজিৎ বলল, ঐ দিকে তাকা। ঐ দ্যাখ জানলার দুপাট খোলা! হুবহু সেই ছবিটা। চলে আয়।
অভিজিৎ বোনের হাত ধরে ভাঙা পাঁচিলের এক পাশ দিয়ে বাড়িটার সিঁড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। চওড়া সিঁড়ি। সিমেন্ট বালির চিহ্নমাত্র নেই। তবু ওরা আট ধাপ সিঁড়ি পার হয়ে বন্ধ দরজার সামনে পা রাখল।
দরজাটা ঠেলব? ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল অভিজিৎ।
উত্তর না দিয়ে যেন মরীয়া হয়ে জুলি নিজেই দরজাটা ঠেলে দিল। সঙ্গে সঙ্গে একটা উৎকট শব্দ করে বিরাট দরজাটা খুলে গেল।
দুজনেই অবাক হলো। দরজাটা শুধু ভেজানোই থাকে নাকি?
এক পা এক পা করে তারা ভেতরে ঢুকল। কনকনে মেঝে। এত ঠান্ডা যে পা রাখা যায় না।
বিরাট হলঘর। কিন্তু বসার কোনো ব্যবস্থা নেই। জায়গাটা অবশ্য বসার জন্যে নয়। দেওয়ালে টাঙানো নয়, ছাদ থেকে ঝুলছে বিরাট বিরাট জন্তুর কংকাল। কোথাও বাঘের মাথা, কোথাও মোষের বিরাট মাথা। কবে থেকে ঝুলছে কে জানে–কিন্তু দেখলে মনে হয় যেন সেগুলোকে সদ্য বধ করে মুণ্ডুগুলো ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। অনেকগুলো দরজা। দোতলায় ওঠার একটা বাঁকানো সিঁড়ি। কিন্তু জনপ্রাণীর সাড়া নেই।
ওরা কিছুক্ষণ এ দরজা ও দরজায় উঁকি মেরে দেখল। তারপর অভিজিৎ চেঁচিয়ে বলল, কেউ আছেন?
অভিজিতের গলার স্বর নিস্তব্ধ ঘরে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে এল।
কেউ নেই দাদা, চল ফিরে যাই।
দোতলায় কেউ আছেই। দাঁড়া আর একবার ডাকি। বলে অভিজিৎ ফের ডাকল, কেউ আছেন?
উত্তর নেই। কিন্তু থপ করে একটা মোটা টিকটিকি কোথা থেকে মেঝেতে পড়েই ওদের দিকে তেড়ে এল। অভিজিৎ জুলির হাত ধরে টান দিয়ে এক লাফে সরে দাঁড়াল। টিকটিকিটা সিঁড়ির পাশ দিয়ে কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল।
