কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল জুলি টের পায়নি। হঠাৎ একসময়ে ঘুমটা ভেঙে গেল। টর্চ জ্বেলে ঘড়িটা দেখল। রাত দুটো। এরকম মাঝরাতে তার ঘুম ভাঙে না বড়ো একটা। ভেঙেছিল ক মাস আগে বাড়িতে তিনবার কলিংবেলের শব্দে। বেশ কিছুদিন পরে, চঞ্চলের কথা মনে পড়ল যে প্ল্যানচেটে সাবধান করে দিয়েছিল। কোথায় গেল ছেলেটা? সে কি সত্যিই অসমে এসেছিল?
হঠাৎ জুলি চমকে উঠল, কিসের শব্দ?
জুলি কান পেতে রইল। কে যেন খুব জোরে ঘোড়া ছুটিয়ে আসছে। কয়েক মুহূর্তে শব্দটা কাছে এসে পড়ল, একেবারে বাংলোটার কাছে। তারপর শব্দটা এগিয়ে গেল গভীর জঙ্গলের দিকে। ক্রমে মিলিয়ে গেল। অবাক হলো জুলি। এত রাতে ঘোড়ায় চড়ে কে ঘুরে বেড়াচ্ছে জঙ্গলের মধ্যে?
শব্দটা আর শোনা গেল না। জুলি আবার ঘুমিয়ে পড়ল। সকালে চা খেতে খেতে অভিজিৎকে জিজ্ঞেস করল, কাল রাতে কোনো শব্দ শুনেছিলি?
অভিজিৎ জেলি মাখানো টোস্টে কামড় দিয়ে নিশ্চিন্ত মনে বলল, নাঃ। এক ঘুমে রাত কাবার।
তবে কি তারই শোনার ভুল?
পরে দুপুরবেলা কেয়ারটেকারকে জিজ্ঞেস করল, কাল রাতে ঘোড়ায় চড়ে এদিকে কে এসেছিল? কেয়ারটেকার তখনই তার উত্তর দিলো না। কয়েক মুহূর্ত জুলির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর শুধু বলল, ও কিছু না।
উত্তরটা শুনে জুলি খুশি হলো না। যেন সত্যিই কেউ এসেছিল। কিন্তু সে কথাটা চেপে গেল।
পরের দিন দুপুরে জুলি অভিজিৎকে বলল, চল, একটু ঘুরে আসি।
অভিজিৎ আলিস্যি ভেঙে বলল, দূর! জঙ্গলের মধ্যে কোথায় ঘুরব? তার চেয়ে ঘুমুলে কাজ দেবে।
অভিজিৎ-এর কথায় জুলি অবাক হলো। এখানে এসে পর্যন্ত দাদার যেন কেমন পরিবর্তন হয়েছে। জায়গাটা তার যেন মোটেই ভালো লাগছে না। শেষে জুলি একাই বেরিয়ে পড়ল।
বেলা দেড়টা। জুলি প্রথমে বাংলোর পিছনের দিকে খানিকটা ঘুরল। তারপর জঙ্গলের পথ ধরল। এ এমন ঘন জঙ্গল যে রোদ পর্যন্ত ঢোকে না। তার লক্ষ্য মাটির দিকে। খুঁজছে। ঘোড়ার খুরের ছাপ চোখে পড়ে কিনা। কিন্তু শুকনো পাতা আর কয়েকটা জোঁক ছাড়া আর কিছু চোখে পড়ল না। সরু বনপথ ধরে এগিয়ে চলল জুলি। কোথায় যাচ্ছে তা নিজেও জানে না। তার মনে হতে লাগল একটা অদৃশ্য শক্তি তাকে যেন টেনে নিয়ে যাচ্ছে। কেবলই মনে হতে লাগল আর একটু এগোন যাক। আর একটু-তাহলেই দেখতে পাবে ছবির সেই রহস্যময় বাড়িটাকে। আবার মনের জোরে জুলি এগোতে লাগল। হঠাৎ কোথা থেকে আঁকে ঝকে মাছি এসে মাথার ওপর ভন ভন করে উড়তে লাগল। চোখে মুখে ঢুকতে লাগল। এ তো মহাজ্বালা!
অগত্যা ফিরতে হলো। কিন্তু এর মধ্যেই জঙ্গল অন্ধকার হয়ে এসেছে। রিস্টওয়াচটা দেখল। সবে বেলা তিনটে। এরই মধ্যে অন্ধকার হয়ে গেল! তা তো হবেই। একে জঙ্গলের পথ। তার ওপর সূর্য পাহাড়ের আড়ালে নেমে যাচ্ছে। জুলির ভয় করল। পথ চিনতে পারবে তো? তাড়াতাড়ি যেভাবে এসেছিল ঠিক সেই ভাবেই হাঁটতে লাগল।
বাংলোয় পৌঁছল যখন তখন প্রায় সন্ধে। দেখল দাদা বাংলোর সামনের রাস্তায় অধৈর্য হয়ে ঘুরছে। জুলিকে দেখতে পেয়ে ধমক দিয়ে বলল, কোথায় গিয়েছিলি একা একা?
সব বলছি. ওপরে চল।
চা খেতে খেতে অভিজিৎকে সব বলল। তারপর দুজনে গেল কেয়ারটেকারের ঘরে। যেতেই বৃদ্ধ বলল, কোথায় গিয়েছিলে দিদি? একা একা হাতে অস্ত্র না নিয়ে কখনও জঙ্গলে যেও না। এখানে হিংস্র লেপার্ড আছে। তারা ডোরাকাটা বাঘের চেয়েও ভয়ংকর।
কিন্তু জুলি বাঘের কথা শুনতে চায় না। শুনতে চায় অন্য কিছুর কথা–আরও ভয়ংকরের কথা। জানতে চায় কে তাকে আকর্ষণ করে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল–কেন নিয়ে যাচ্ছিল?
এক সময়ে নিরিবিলিতে জুলি কেয়ারটেকারকে জিজ্ঞেস করল, আংকেল, শুনেছি এখানে কোথায় যেন একটা পুরনো বাড়ি আছে। সেখানে কেউ যেতে সাহস পায় না।
বৃদ্ধ আংকেল চমকে উঠে বলল, চুপ চুপ, ও বাড়ির নাম উচ্চারণ কোরো না।
কেন?
ওখানে ভয় আছে দিদি। কত বিদেশী কত কাল ধরে ও বাড়িটাকে দেখবার জন্যে গিয়েছিল, তারপর তাদের আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।
কি আছে ওখানে?
লোকে বলে কোনো খুনে সাহেব রাজার প্রেতাত্মা। সন্ধেবেলা ও নাম করতে নেই।
একটু থেমে বলল, তুমি ঘোড়ার খুরের শব্দ শুনেছ। তা মিথ্যে নয়। সেদিন বলিনি, আজ বলছি, ঐরকম শব্দ প্রায়ই শোনা যায়। লোকে বলে–সাহেব রাজা টহল দিয়ে বেড়ায়। তখন যদি কেউ চোখের সামনে পড়ে তাহলে পরের দিন তার লাশ পড়ে থাকে জঙ্গলের মধ্যে। যাও, তোমাদের ঘরে যাও। আর যত শিগগির পার দেশে ফিরে যাও। একটু থেমে বলল, তুমি কি আজ ঐদিকেই গিয়েছিলে নাকি?
জুলি বলল, বাড়িটা কোন দিকে তা তো জানি না। এমনি হাঁটছিলাম। মনে হচ্ছিল, কেউ যেন টেনে নিয়ে যাচ্ছিল।
হ্যাঁ, সব্বোনাশের পথেই চলছিলে। খুব ভাগ্য আর এগোওনি। রাগ করো না দিদি আসলে তোমাদের বয়েস অল্প, মতিগতি ভালো নয়। বিপদে পড়তে পার।
.
মতিগতি সত্যিই ভালো নয় ওদের। নইলে বুড়ো আংকেলের কাছে সব শুনেও দুই ভাইবোনে পরের দিনই কেন বেরিয়ে পড়বে সেই রহস্যময় বাড়ির সন্ধানে। অভিজিৎ প্রথমে রাজি হয়নি। জুলিই জোর করে ওকে রাজি করাল। বলল, তুই না যাস, আমি একাই যাব।
.
অগত্যা অভিজিৎকেও যেতে হলো।
আজ বেলা দশটার মধ্যে লাঞ্চ খেয়ে ভাইবোনে বেরিয়ে পড়েছে। বুড়ো আংকেলের কথায় বুঝেছে যে পথে গতকাল গিয়েছিল, সেই পথটাই ঠিক জায়গায় পৌঁছে দেবে।
