জুলি বলল, তরোয়ালটা যে রাখবে তারই যদি সর্বনাশ হয় তাহলে কোন সাহসে সেটা নিতে চাইছ? ম্যাকবেথের প্রেতাত্মাও কি সহজে তোমায় নিতে দেবে?
দেবে না তা জানি। তবু ম্যাকবেথের সঙ্গে আমাকে শেষ লড়াই করতেই হবে। দেখব আজ সে কি করে আমায় খতম করে। পথের মাঝে অন্ধকারে একলা পেয়ে অতর্কিতে আক্রমণ করা এক কথা আর মুখোমুখি লড়াই করা অন্য কথা।
এ কথা শুনে জুলি চমকে উঠল। বলে কী লোকটা? অন্ধকারে একলা পেয়ে তোক লাগিয়ে কাকে খুন করিয়েছিল ম্যাকবেথ? সে তো আর এক মহযোদ্ধা রাজা ডানকানের সেনাপতি, ম্যাকবেথেরই একান্ত বন্ধু ব্যাংকোকে!
মুখে বলল, তুমি কার কথা বলছ সাহেব? বইয়েতে পড়েছি ম্যাকবেথ তো ঐভাবে মেরেছিল তারই বন্ধু ব্যাংকোকে?
হ্যাঁ, সেই ব্যাংকোকেই আজ প্রতিশোধ নেবার জন্যে এতদূর ছুটে আসতে হয়েছে মানুষের রূপ ধরে। যদি ম্যাকবেথের দেখা পাওয়া যায় ভালো। লড়াই হবে। যদি দেখা না হয় তার তরোয়ালটা নিয়ে আসব। এইভাবেই প্রতিশোধ
বলতে বলতে হঠাৎ সাহেবের সর্বাঙ্গ থরথর করে কেঁপে উঠল। তারপর সে যেন কেমন অস্পষ্ট থেকে অস্পষ্টতর হয়ে গেল। তারপর টিলা থেকে নেমে সামনের গভীর জঙ্গলে মিশে গেল।
স্তম্ভিত জুলি কঁপা কাঁপা গলায় বলল, কী দেখলাম রে দাদা? স্বচক্ষেই তো দেখলাম।
অভিজিৎ বললে, এখানে আর এক মুহূর্ত নয়। সন্ধে হয়ে আসছে। তার আগেই বাংলোটা খুঁজে বার করতে হবে।
.
রহস্যপুরী
ব্যাপারটা তাহলে কী হলো? বাংলোর একটা ঘরে বসে জিজ্ঞেস করল জুলি।
ঠিক বুঝতে পারলাম না। কেমন ভয়ে ভয়ে উত্তর দিল অভিজিৎ।
এই কদিন যে সাহেবটার সঙ্গে এত মিশলাম, এত কথা বললাম, সে তাহলে মানুষই নয়?
অভিজিৎ বলল, তাই তো দেখলাম। কিন্তু এও কি বিশ্বাস করতে হবে? বিশ্বাস করতে হবে একটা জলজ্যান্ত ভূতের সঙ্গে গোয়ালপাড়ায় বাস করেছি? তারই সঙ্গে অজানা অচেনা অসমের এই জঙ্গলে বেড়াতে এসেছি?
শুধু ভূতই নয় দাদা, বলে গেল সে নাকি নিজেই ব্যাংকো! অথচ এর আগে আমাদের বুঝিয়েছে সে ব্যাংকের বংশধর!
যাই হোক এই অসম্ভব ঘটনা জীবনে কোনোদিন ভুলব না।
আসল অসমের চায়ের লিকার থেকে চমৎকার গন্ধ বেরোচ্ছিল। পেয়ালায় শেষ চুমুক দিয়ে অভিজিৎ বলল, আর এখানে থেকে কী লাভ? চল কালই আমরা বাড়ি ফিরে যাই।
জুলি বলল, বাঃরে! এত খরচ করে এখানে এলাম। কিছু না দেখেই ফিরে যাব? এখানে আসার উৎসাহ তোরই তো বেশি ছিল।
তা ছিল। কিন্তু সাহেবের ঘটনা দেখার পরই মনটা কিরকম হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে এখানে আর না থাকাই ভালো।
দাদা, তুই একজন ইয়ং সাংবাদিক! খবর খোঁজার জন্যে কোথায় না যেতে হয় তোকে, অ্যাডভেঞ্চার করতে ভালোবাসিস–তুই কিনা ভয় পেয়ে কালই ফিরে যেতে চাইছিস? আমিও তো তোর পাশে দাঁড়িয়ে ঐ দৃশ্য দেখলাম। কই আমার তো ভয় করছে না? আমি ঠিক করে ফেলেছি, টাকা-পয়সা খরচ করে যখন এতদূর এসেছি, দুদিন ঘুরে বেড়িয়ে তবে ফিরব। চা-টা কী ফার্স্টক্লাস–দাঁড়া বাবুর্চি রাতে কী খাওয়াবে খোঁজ নিয়ে আসি।
বাংলোটা এমনিতে ভালোই। তবে বড় নিরিবিলি। বাংলোর মাঝখান দিয়ে চওড়া সিঁড়ি উঠে গেছে দোতলার বারান্দা পর্যন্ত। বারান্দার একপাশ ঘেঁষে সার সার রুম। বেশির ভাগ ঘরই ফাঁকা। নিচে ছোটো ঘরে থাকে বয়-বাবুর্চি-কেয়ারটেকাররা। বাড়ির তিন দিকে গা ছমছম করা ঘন জঙ্গল। দূরে পাহাড়ের হাতছানি।
এত অল্প লোক কেন জিজ্ঞেস করায় বুড়ো কেয়ারটেকার বলল, এখন তো অফ সিজন। অগস্ট থেকে অক্টোবর মেঘ, বৃষ্টি, কুয়াশা আর দুর্যোগের সময়। যখন জাটিঙ্গা উপত্যকায় গভীর রাতে ঝাঁকে ঝুঁকে পাখি এসে আগুনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে সেই রহস্যময় দৃশ্য দেখার জন্য কিছু টুরিস্ট আসে এখানে।
জুলি কলকাতায় মামার বাড়িতে জাটিঙ্গার পাখিদের দলে দলে আগুনে ঝাঁপ দিয়ে মরার রহস্যজনক কাহিনি শুনেছিল। কিন্তু এটা তার কাছে নতুন কিছু বলে মনে হয়নি। আমাদের দেশেও কার্তিক মাসে দেওয়ালি পোকারা আলো দেখলেই কোথা থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে এসে ঝাঁপ দিয়ে মরে। সেও তো এক রহস্য!
তবু জায়গাটা একবার দেখার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু সে তো অক্টোবর মাসের ব্যাপার।
বুড়ো কেয়ারটেকারের সঙ্গে জুলি খুব তাড়াতাড়ি ভাব জমিয়ে ফেলল। কোথায় কী দেখবার আছে তাও জেনে নিল। কেয়ারটেকার সবশেষে বলল, বেশি জঙ্গলে আর্মস ছাড়া না যাওয়াই ভালো।
রাত নটার মধ্যে গরম গরম মাংস ভাত খেয়ে ওরা শুয়ে পড়ল। পাশাপাশি দুটো সিঙ্গল সিটেড রুম ওরা পেয়ে গেছে। দুজনেই খুব খুশি। বেশ যে যার মতো থাকতে পারবে।
রাত দশটা বাজল। চারিদিক স্তব্ধ নিঝুম। জুলি রাতের পোশাক পরে আলো নিভিয়ে মশারির মধ্যে ঢুকে গেল। মাথার কাছে রাখল টর্চটা। কি মনে হলো আবার উঠল। তারপর অ্যাটাচড় বাথরুমটা ভালো করে দেখে নিয়ে আবার শুয়ে পড়ল।
দাদা, ঘুমিয়ে পড়েছিস নাকি? শুয়ে শুয়েই জুলি জিজ্ঞেস করল।
পাশের ঘর থেকে অভিজিৎ উত্তর দিলো, না। নতুন জায়গা। ঘুম আসছে না।
বাথরুমটা ভালো করে দেখেছিস?
হ্যাঁ। টর্চটা হাতের কাছে রাখিস।
একেবারে বালিশের পাশে রেখেছি। তুই ভোরবেলা বেরোবি নাকি?
অভিজিৎ বলল, পাগল! ভোরবেলাতেই তো আসল ঘুম। বলতে বলতে সে যে হাই তুলল সে শব্দটুকুও শোনা গেল।
