কিছুক্ষণ দাঁড়াবার পর ও উবু হয়ে বসল। তারপর তার হাতের লাঠিটা চালিয়ে দিল কবরের মাটির নিচে। এক সময়ে লাঠিটা সরিয়ে নিয়ে হাত ঢুকিয়ে দিল।
আমি তো ভয়ে কাঁটা। সাপে কামড়াবে যে! পাগল আর কাকে বলে?
কিছুক্ষণ কবরের মাটি হাতড়াবার পর ও উঠল। আমার দিকে তাকিয়ে খুশ মেজাজে বলল, ঠিক হ্যায়।
কি ঠিক হ্যায় তা আর জিজ্ঞেস করার প্রবৃত্তি হলো না।
এরপর সে জানতে চাইল পুরনো কবরখানা আর কোথায় আছে। হুগলিতে ডাচেদের সময়ের অনেক কবর আছে শুনে সেখানে যাবার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠল।
এদিকে বাড়িতে যেন কেমন একটু গোলমাল শুরু হয়েছে। ছেলেমেয়েদের তো পড়াশোনা মাথায় উঠেছে। তারা কেশবকে আঙ্কেল বলে ডাকে। আর গল্প শোনে। সবই ভূতের গল্প। কেশব লোকটার এই একটা গুণ–নির্জন পাহাড়ে দেশের লোক হলেও সে বেশ মিশতে পারে। ছেলেদের সঙ্গে এই মেশবার ক্ষমতা কোথা থেকে পেল কে জানে! গুহায় বাস করে এমন শার্ট-প্যান্টই বা পায় কোথা থেকে কে বলবে!
যাই হোক রোজ সন্ধ্যের সময়ে ছেলেমেয়েরা ওকে ঘিরে ধরত।–গল্প বললো আঙ্কেল। ভূতের গল্প। তোমার নিজের চোখে দেখা ভূতের গল্প।
আঙ্কেল অমনি গল্প শুরু করে দিত। এক-একদিন শুনতাম দানিকেন-ড্রাকুলাও এসে পড়েছে। মনে মনে হাসতাম।
কিন্তু নিছক হাসির ব্যাপার যে ছিল না তা সপ্তাহ খানেক পর থেকেই টের পেতে লাগলাম।
আমার ঘুমটা বরাবরই খুব পাতলা। একটু শব্দেই ঘুম ভেঙে যায়।
কদিন থেকেই রাত দুপুরে ঘুম ভেঙে যাচ্ছে। আর শুতে পাচ্ছি নিচের যে ঘরে কেশব থাকে সেই ঘরে টুন টুন্ করে কিসের যেন শব্দ। ঠিক যেন কে ঘণ্টা নেড়ে পুজো করছে।
একদিন দিদিমাও সেই শব্দ শুনলেন। পরের দিন সকালে বললেন, তোর ঐ কেশবের ঘরে ঘণ্টা বাজাচ্ছিল কে?
আমি হেসে উড়িয়ে দিলাম।–ধ্যেৎ, অত রাতে খামকা ঘণ্টা বাজাতে যাবে কে?
উড়িয়ে দিলাম বটে কিন্তু মনে খটকা বিঁধে রইল। কেশবই কি গভীর রাতে পুজো করে? কার পুজো? তবে কি ও ওর ঠাকুর–সেই বিকট খুলিটা এখানে নিয়ে এসেছে।
ভাবতেও গা শিউরে উঠল। কিন্তু এসব কথা কেশবকে জিজ্ঞেস করার উপায় নেই। ও বলবে না। উল্টে চটে যাবে।
সেদিন আর এক কাণ্ড! দুপুরবেলা বাড়িতে কেউ ছিল না। কেশবের ঘরে তালা বন্ধ। ওকে নিয়ে হুগলির একটা গ্রামে গিয়েছিলাম। বলা হয়নি–ইদানিং ও ধরেছিল গ্রাম দেখবে। গ্রাম দেখবে না ছাই! খুঁজবে গ্রামের পুরনো কবরখানা।
যাই হোক, বাড়িতে কেউ নেই। ছেলেমেয়েরাও ইস্কুলে। নিচে নামছিলেন। দিদিমা তো ঘুমোচ্ছেন। কেশবের ঘরের কাছে আসতেই উনি থমকে দাঁড়ালেন। স্পষ্ট শুনলেন সেই বন্ধ ঘরের মধ্যে খট্ খট্ করে কী যেন চলে বেড়াচ্ছে।
মায়ের মুখে এ কথা শুনে আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল।
আমার স্থির বিশ্বাস হলো কেশব সেই খুলিটা এখানে নিয়ে এসেছে।
পরের দিনই–কেশব যখন স্নান করতে গিয়েছে তখন চুপি চুপি ওর ঘরে ঢুকলাম। আমার সন্দেহ ছিল ওর পুঁটলিটায় কিছু আছে। সেটা খুলে ফেললাম। দেখলাম ভেতরে কালো কাপড়ে জড়ানো কী রয়েছে। আমার হাত কেঁপে উঠল। কোনো রকমে পুঁটলিটা বেঁধে বেরিয়ে এলাম।
তারপর মনে মনে কেবলই চিন্তা করতে লাগলাম লোকটা কবে এখান থেকে যাবে।
আমি ওর চলে যাবার জন্য ব্যস্ত হলে কী হবে? ছেলেরা ওকে ছাড়তে চায় না। ওরা কেবল জেদ ধরে–আঙ্কেল, সত্যি ভূত বলে কিছু আছে? সত্যি তুমি ভূত দেখেছ? তা হলে আমাদের ভূত দেখাও।
এই ভূত দেখাবার কথা হলেই ওদের আঙ্কেল কিন্তু সত্যি সত্যি চটে যায়। ধমকে উঠে বলে, ছেলেমানুষি নাকি? ভূত দেখাব বললেই দেখানো যায়? নাকি দেখব বললেই দেখা যায়?
কথাটা একটু ধমকানির সুরেই বোধহয় বলেছিল যার জন্যে আমার যে ভাইঝিটি ওকে সবচেয়ে ভালোবাসত সে কেঁদে ফেলল। কাঁদতে কাঁদতে চলে গেল। বলে গেল, আঙ্কেল, তোমার সঙ্গে আড়ি-জন্মের মতো আড়ি। আর কখনো তোমার কাছে গল্প শুনব না।
আচ্ছা জেদী মেয়ে এই রুণা। তারপর কতবার কেশব সাধ্যসাধনা করেছে, ও আর আঙ্কেলের কাছে আসেনি। ভূত দেখতেও চায়নি।
এর কদিন পরেই কেশব হঠাৎ বলল, চললাম।
আঃ! এর চেয়ে সুখবর বুঝি আর কিছু হয় না!
মুখে বললাম, এরই মধ্যে যাবেন কেন?
কেশব বললে, অনেক দিন তো থাকলাম। আর নয়।
–কোথায় যাবেন? ইস্ট ইউরোপ?
না, আগে নেপাল।
কেন হঠাৎ নেপাল যাবেন তা আর জিজ্ঞেস করতে সাহস হলো না।
যাবার দিন বিদায়ের পালা। ছেলেমেয়েদের চোখ ছলছল। রুণাও এসেছে। কেশব ওকেই বোধহয় সবচেয়ে বেশি ভালোবাসত। তাই একটু আদর করল। ওর চোখেও জল। রুণা কাদো কাঁদো হয়ে বলল, আঙ্কেল, তুমি আবার আসবে তো?
কেশব তার স্বভাব মতো হাসল–আমার ওপর রাগ পড়েছে তো দিদিমণি?
বা, তুমি তো ভূত দেখালে না?
কেশবের মুখটা শুকিয়ে গেল। বিমর্ষ হয়ে পড়ল। ভূত কি কাউকে দেখানো যায়? এ কি সম্ভব?
আমি রুণাকে একটু বকলাম। রুণা মুখ ভার করে রইল।
–আবার আসবে তো? ছেলেরা জিজ্ঞেস করল।
কেশব কি ভেবে বলল, কথা দিচ্ছি না। তবে আসবার চেষ্টা করব যদি মরে না যাই।
আমার ভাগ্নেটি একটু ভেঁপো। বলে উঠল–তুমি মরে গেছ কিনা জানব কি করে? আমরা তো তোমার জন্যে অপেক্ষা করে থাকব।
কেশব কী ভাবল। তারপর হঠাৎ ঘরে গিয়ে পুঁটলি খুলে কি একটা গোল করা কাগজ এনে আমার হাতে দিল। সেটা খুলে দেখি একটা ক্যালেন্ডার। ক্যালেন্ডারের ছবিটা অদ্ভুত। ছাপা নয়। কেশবই বোধহয় নিজে হাতে গোটাকতক ছক কেটে ক্যালেন্ডারের সঙ্গে এঁটে রেখেছে।
