ক্যালেন্ডারটা হাতে নিয়ে আমি বললাম, এটা নিয়ে কি করব?
ও বলল, দেওয়ালে টাঙিয়ে রাখবেন। যেদিন দেখবেন ক্যালেন্ডারটা উল্টে গেছে সেদিন বুঝবেন আমি আর নেই।
এ আবার কী কথা! অবাক হব, না হাসব, না ভয় পাব বুঝে উঠতে পারলাম না।
.
বছর দুই-তিন কেটে গেছে। কেশবের কথা ভুলেই গেছি। ছেলেমেয়েরাও ইতিমধ্যে বেশ বড় হয়ে গেছে।
সেদিন সন্ধ্যেবেলায় বাইরের ঘরে ওরা পড়াশোনা করছে। আমি একটা ম্যাগাজিন পড়ছি। হঠাৎ মনে হলো কে যেন দরজার সামনে নিঃশব্দে এসে দাঁড়িয়েছে। চমকে তাকিয়ে দেখি–কেশব রাও। দরজায় দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসছে।
ওকে প্রথমে চিনতে পারিনি। সেই কুচকুচে কালো রঙ আর নেই। কেমন যেন ফ্যাকাশে। মুখটা শুকনো। ঘন কালো দাড়ির বদলে পাতলা পাতলা বিবর্ণ দাড়ি ঝুলছে। চুল এলোমেলো। সবচেয়ে অবাক হলাম–ওর হাতে সুটকেসও নেই–সেই পুঁটলিটাও নেই।
–রাও সাহেব না?
কেশব রাও একটু হেসে আমায় নমস্কার করল।
–আসুন–আসুন। স্বাগতম।
ছেলেমেয়েরাও আনন্দে লাফিয়ে উঠল–আঙ্কেল এসেছে–আঙ্কেল এসেছে
তারপরই ওরা ধরল–আঙ্কেল গল্প–অনেক গল্প
আমি ওদের ধমকে শান্ত করলাম।
–আজ উনি ক্লান্ত। দেখছ না ভালো করে দাঁড়াতেও পারছেন না। আসুন মিস্টার রাও।
যেতে যেতে জিজ্ঞেস করলাম–আপনি কি এখন নেপাল থেকেই এলেন?
কেন জানি না রাও তার কোনো উত্তর দিল না।
তারপর কেশবকে সেই ঘরে নিয়ে এলাম। বললাম, খাওয়া-দাওয়া করে আজ বিশ্রাম করুন। কাল সবাই মিলে গল্প শুনব।
কেশব কিন্তু কিছুই খেতে চাইল না। বলল, আমি একটু ঘুমোতে চাই।
আমি ওখানেই ওর শোবার ব্যবস্থা করে দিলাম।
সকালে ঘুম থেকে উঠে অবাক। কেশব নেই। ঘর খালি। কিরকম হলো? এত সকালে গেল কোথায়?
বিছানার দিকে তাকিয়ে দেখলাম–যেমন ফর্সা চাদর পেতে দিয়েছিলাম তেমনই আছে। কেউ যে শুয়েছিল তা মনে হয় না। গেলাসে জল দিয়েছিলাম। সেটাও ঠিক তেমনি ঢাকা পড়ে আছে। অর্থাৎ ঘরে যে কেউ ছিল তার চিহ্নমাত্র নেই।
মনে মনে যেমন অবাক হলাম তেমনি দুঃখও পেলামকেশবের এমনি ভাবে পালিয়ে যাওয়াটা ঠিক হয়নি।
এমনি সময়ে কে যেন এসে আমায় দ্বিগুণ অবাক করে দিয়ে বলল, পালিয়ে যাবে কি বাইরের দরজা তো ভেতর থেকে বন্ধই রয়েছে।
এইবার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। সে আবার কী?
এ রহস্যের মীমাংসা আমরা কেউ করতে পারলাম না। তবে সেইদিনই খবরের কাগজের এক কোণে একটা ছোট্ট খবর ছিল। পার্ক স্ট্রীটের পুরনো কবরখানায় এক অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির মৃতদেহ পাওয়া গেছে। তার সঙ্গে ছিল একটা পুঁটলি। পুটলির মধ্যে পাওয়া গেছে একটা অস্বাভাবিক মড়ার মাথার খুলি! মৃত্যুর কারণ জানা যায়নি। পুলিশ তদন্ত করছে।
আমার হাত থেকে কাগজটা পড়ে গেল। বুঝতে বাকি রইল না অজ্ঞাতপরিচয় মানুষটি কেশব রাও ছাড়া আর কেউ নয়। তার বডি পাওয়া গেছে কাল সকালে। তাহলে কাল রাত্তিরে আমার বাড়ি কে এল?
তবে কি ও নেপাল থেকে ফিরে কলকাতাতেই ছিল? তাহলে
কেনই বা শুধু এক রাত্তিরের জন্যে এল? আর–আর তার মৃত্যু হঠাৎ কবরখানাতেই বা হলো কেন?
সবই রহস্যময়। তখনই কী মনে হলো ছুটলাম পাশের ঘরে। দেখি রুণা কখন এ ঘরে এসে ক্যালেন্ডারটার দিকে জলভরা চোখে তাকিয়ে রয়েছে। ক্যালেন্ডারটা এত দিন পর কে যেন উল্টে দিয়েছে।
» অলৌকিক জল্লাদ ও জীবন্ত কঙ্কাল
রহস্যের সূত্রপাত
খুব বেশি দিন না হলেও দেখতে দেখতে পনেরো বছর হয়ে গেল আমি কলকাতায় পুলিশের কাজ করছি। এই পনেরো বছরে কত চোর-ডাকাত ধরলাম, কত খুনিকে আদালতে পাঠালাম। কত মারামারি কত রক্তপাত! ফলে মনটা যেমন কঠোর তেমনি ভয়শূন্য হয়ে গেছে। সঙ্গে রিভলবারটা থাকলেই হলো।
শুধু চোর-ডাকাত-খুনি নিয়ে কারবার হলে মনে তেমন দাগ কাটত না। ওসব তো প্রায় সব পুলিশ অফিসারদের জীবনেই ঘটে। কিন্তু আমার সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্যবশত জীবনে এমন কিছু অবিশ্বাস্য ভয়াবহ অলৌকিক ঘটনা ঘটেছে যা কোনদিন ভুলতে পারব না। এই ঘটনাগুলো লিখে রাখার জন্যেই আপাতত এক মাসের ছুটি নিয়ে নিরিবিলি দেশের বাড়িতে এসেছি।
জায়গাটা নিরিবিলি। কিন্তু বাড়িটা নিরিবিলি নয়। আমাদের এই দোতলা বাড়িটা খুবই পুরনো। বাড়ির পিছনে অনেকদূর পর্যন্ত আমবাগান আর বাঁশঝাড়। এখনও গভীর রাতে শেয়াল ডাকে, খটাস বনবেড়াল ঘুরে বেড়ায় নিশ্চিন্তে। বাড়ির পশ্চিমে একটা পচা পুকুর। তার এদিকে একটা ভাঙা শিবমন্দির। ছোটোবেলায় ঐ পুকুরপাড়ে, আসশ্যাওড়ার ঝোপে কত চোর পুলিশ খেলেছি। তখন কি ভেবেছিলাম বড়ো হয়ে আমাকেই চোর-ডাকাত ধরে বেড়াতে হবে!
বাড়িটার সবচেয়ে আকর্ষণ বিরাট ছাদ। এই ছাদে কত ঘুড়ি উড়িয়েছি, ছোটাছুটি দাপাদাপি করেছি। আজও এ বাড়ির ছোটো ছেলেমেয়েরা ছাদেই খেলা করে।
এ বাড়িতে পাকাপাকিভাবে থাকে আমার মেজো আর ছোটো ভাই তাদের স্ত্রী, পুত্র কন্যাদের নিয়ে। এখন কলকাতা থেকে আমি এক মাসের জন্যে এসেছি স্ত্রী আর বারো বছরের দুষ্টু নোটনকে নিয়ে। আমার ভাগে যে দুখানি ঘর তা উত্তর দিকে। একখানি ঘর আমার একেবারে নিজস্ব। ঐ ঘরে বসে আমি দেশ-বিদেশের যত অপরাধ কাহিনি পড়ি। আর এখন এই ঘরে বসেই লিখছি আমার জীবনে ঘটে-যাওয়া বেশ কয়েকটি অলৌকিক ঘটনা।
আমার ঘরের জানলা দিয়ে তাকালে প্রথমেই চোখে পড়ে আমাদের উঠোনের ওপর নারকেল গাছটা। সেই ছোটবেলা থেকে দেখছি গাছটাকে। এখনও দিব্যি আছে। নারকেল গাছটা যেন আমাদের পরিবারেরই একজন হয়ে গেছে। গাছটাকে আমরা সবাই ভালবাসি। তারপরেই চোখে পড়ে সেই বিশাল আমবাগান আর বাঁশঝাড়ের জঙ্গল। যতদূর দেখা যায় শুধু গাছের সবুজ মাথা। যখন সন্ধের অন্ধকার নেমে আসে তখন ঐ বাগান-জঙ্গলকে কেমন রহস্যময় বলে মনে হয়। কেমন ভয় করে। মনে হয় যেন কোনো অজানা আতঙ্ক ওৎ পেতে আছে গাছগুলোর ডালে ডালে।
