এই রকম সিঁদুরমাখা খুলি আমি সাধুসন্ন্যাসীদের কাছে অনেক দেখেছি। এর জন্যে গা শিউরে ওঠেনি। শিউরে উঠেছিল অত বড়ো খুলি কখনো দেখিনি বলে।
এ কি মানুষের খুলি?
লোকটি আমার দিকে তাকিয়ে হাসল।
–কি ভাবছেন?
–এত বড়ো খুলি কোথায় পেলেন? এ কি মানুষের?
লোকটি আবার হাসল। বলল, দানিকেন পড়েছেন তো? সেই অতিমানবের কথা?
আশ্চর্য হলাম। এ লোকটা দানিকেনও পড়েছে।
মুখে বললাম, হ্যাঁ, ওঁর সব কখানা বইই আমার পড়া।
লোকটি বলল, আমিও ওঁর মতে বিশ্বাসী। তা ছাড়া এই খুলিটাই তো একটা মস্ত প্রমাণ। নয় কি?
–এটা পেলেন কোথায়?
এবারও এ প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গিয়ে বলল, তবে দানিকেনের চেয়ে আমি আরো কিছু গভীর তত্ত্ব খুঁজে বেড়াচ্ছি। বলে মৃদু হেসে অন্য প্রসঙ্গে চলে গেল। আমিও আর কৌতূহল দেখালাম না।
সেদিন পাহাড়ের গুহায় কলা, চিড়ে আর দুধ খেয়ে খাঁটিয়ায় শুয়ে রাত্রিবাস হলো। বেশ ভালো করেই আলাপ জমল। লোকটির নাম কেশব রাও। জন্ম অনন্তপুর জেলায় পেনুকোণ্ডা শহরের কাছে। দীর্ঘকাল দেশ ছাড়া। এখন বাস তিরুপতির এই পাহাড়ে। লোকটির বিষয়ে আমি প্রথমে বলেছিলাম বেশ মজার লোক কিন্তু পরে মনে হয়েছে লোকটা বোধহয় একটু বিশেষ ধরনের পাগল।
প্রায় সারা রাত ধরে সে এমন সব কথা শোনালো যা পাগলামো ছাড়া অন্য কিছু হতে পারে না।
সে বললে, দানিকেনের মতে বহু সহস্র বছর আগে ভিন গ্রহ থেকে যে অতিমানবেরা পৃথিবী প্রায় আবিষ্কার করেছিল, এক সময়ে তারা আবার তাদের নিজেদের গ্রহেই ফিরে গিয়েছিল। এটা আমার মতে অ্যাবসার্ড–অসম্ভব।
কেশব রাও একটু হাসল। তারপর বলল, আমি মনে করি তারা কেউ ফিরে যায়নি। পৃথিবীতেই ছিল–পৃথিবীতেই আছে যে কোনো আকার নিয়ে।
তারপর ও বলল, তার এখন অনেক কাজ। সারা পৃথিবী ঘুরতে হবে। এইরকম খুলি আর কোথায় পাওয়া যায় দেখতে হবে।
একটু থেমে বলল, শুধু খুলি বা কঙ্কাল নয়। আমি বিশ্বাস করি তাদের আত্মাও এখনো বিশেষ বিশেষ জায়গায় আছে।
আমি আবার শিউরে উঠলাম।
এরপর সে যেন নিজের মনেই বলল–সবচেয়ে আগে যাওয়া দরকার ইস্ট ইউরোপে। কার্পাথিয়ান রেঞ্জ ট্রানসিলভেনিয়া–মোন্ডাভিয়াবুরো ভিনা—-বিসট্রিজ
এ সব কথা শুনতে আমার মোটেই ভালো লাগছিল না। তবু কিছু বলা উচিত মনে করেই বললাম–জায়গাগুলোর নামও তো শুনিনি।
কেশব রাও সরু করে হেসে বলল, ড্রাকুলা পড়েননি? ব্রাম স্ট্রোকারের ড্রাকুলা? সেই যে রক্তপায়ী পিশাচ যারা কত কাল ধরে–অ-মৃত অবস্থায় কবরে থাকে। কিন্তু রাত হলেই মানুষ-শিকারে বেরোয়।
আমি বললাম, হ্যাঁ পড়েছি। কিন্তু সে তো গল্প।
–গল্প! কেশবের চোখ দুটো গোল গোল দেখালো।–আমি যদি তার প্রমাণ দেখাতে পারি?
সর্বনাশ! বললাম, না-না, প্রমাণে দরকার নেই।
–সেসব জায়গায় আমায় যেতে হবে। কিছু যে একটা আছে তা খুঁজে বের করতে হবে।
আমি নীরবে মাথা নেড়ে সায় দিলাম। কোনো কৌতূহল প্রকাশ করলাম না।
এইভাবে সেই পাথরের গুহায় রাত কাটল। আমি খাঁটিয়ায় আর কেশব মাটিতে একটা বহু পুরনো বাঘছাল পেতে শুয়ে রইল।
সত্যি কথা বলতে কি সারা রাত বেশ ভয়ে ভয়েই কেটেছে। ভয়টা কেশবকে না তার ঐ অদ্ভুত ঠাকুরটিকে না অন্য কিছুতে বুঝতে পারিনি।
ভোর হলে প্রথম বাসটাই ধরার জন্যে যখন বিদায় নিচ্ছি তখন ভদ্রতার খাতিরে কেশবকে বললাম, যদি কখনো কলকাতায় আসেন তো দয়া করে আমার বাড়িতেই আতিথ্য গ্রহণ করবেন।
কেশব তখনই বলল, হ্যাঁ, কলকাতায় একবার আমায় যেতে হবে। বলে ঠিকানাটা দুর্বোধ্য ভাষায় লিখে নিল।
.
অনেক দিন কেটে গিয়েছে, কেশবের কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। হঠাৎ একদিন আমাদের সবার বাড়িতে কেশব এসে হাজির। ওকে দেখে প্রথমটা চিনতেই পারিনি। কি করে চিনব? কুচকুচে কালো রঙ, মুখে চাপ দাড়ি আগে ছিল না–পরনে দিব্যি শাট ও ট্রাউজার–চোখে বিস্কুটে কালো সানগ্লাস। বাঁ হাতে একটা বড়ো পুঁটলি আর ডান হতে সুটকেস। কেশব রাও দরজার কাছে দাঁড়িয়ে হাসছে।
যখন ও পরিচয় দিল তখন আমি সত্যিই খুশি হলাম। আমার মনে পড়ল সেই রাত্রে আশ্রয় দেওয়ার কথা। আশ্রয় না পেলে কী হতে বলতে পারি না। সেই আশ্রয়দাতা আজ এসেছে আমার অতিথি হয়ে। এ কী কম সৌভাগ্য!
তা ছাড়া তিরুপতি থেকে ফিরে এসে এই কেশবের কথা বাড়িতে সবার কাছে গল্প করেছিলাম। ভাইপো-ভাইঝিরা তো কেশবের কথা শুনে রোমাঞ্চিত। কবে কেশব আসবে তার জন্যে পথ চেয়ে থাকত। এত দিন পর শেষ পর্যন্ত সে সশরীরে হাজির।
ছেলেমেয়েরা বেশ আগ্রহ করেই ওর সঙ্গে আলাপ করতে এল। কিন্তু কী জানি কেন ওকে দেখে প্রথমেই ছেলেমেয়েরা কেমন ভয় পেয়ে গেল। সে কি ওর কুচকুচে কালো রঙের জন্য না কি ওর বিস্কুটে চশমাটার জন্যে?
যাই হোক দিন দুয়েকের মধ্যেই ছেলেমেয়েরা ওর সঙ্গে ভাব জমিয়ে ফেলল। ভাবটা ওদের সঙ্গে এমন জমল যে আমাকে যেন আর ওর দরকারই হয় না।
তবু দরকার হতো।
একদিন বলল, কলকাতায় পার্ক স্ট্রীট বলে একটা জায়গা আছে। সেখানে নাকি খুব পুরনো কালের কবর আছে?
সর্বনাশ! এখানে এসেও যে কবরখানার খোঁজ করে!
মুখে বললাম, হ্যাঁ, তা আছে। তবে খুব আর কি পুরনো? মাত্র শ দু আড়াই বছর আগের।
–তাতেই হবে। আপনি একদিন নিয়ে চলুন।
অগত্যা কেশবকে নিয়ে একদিনযা কখনো করিনি তাই করলাম। কবরখানায় ঢুকলাম। সার্কুলার রোড আর পার্ক স্ট্রীটের মোড়ে গাছপালায় ঢাকা সেই পুরনো কবরখানা। ঢুকতেই গা ছমছম করে উঠল। কিন্তু কেশবের এসব কিছুই হলো না। সে মহা আনন্দে বাঁধানো কবরগুলো দেখতে লাগল। তারপর একটা খুব পুরনো ভাঙাচোরা কবরের কাছে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।
