.
ম্যাকবেথের তরোয়াল
গভীর বন আর পাহাড়ে ঘেরা অসমের এই অঞ্চলটা। চারিদিকে যেন সবুজের মেলা। অসমের একটি জেলা এই উত্তর কাছাড়। পার্বত্য জেলাটির সদর শহর হাফলং। সামনে হেমপেট্রপেট পাহাড়। দক্ষিণ প্রান্তে বরাইল পর্বতশ্রেণী। মাঠে মাঠে কমলা, আনারস, আর পানের চাষ।
একশো বছরেরও আগে এইসব জনবসতিহীন দুর্ভেদ্য জঙ্গলে বড়ো বড়ো মশা, জোঁক, বিষধর সাপ, হিংস্র দাঁতাল শুয়োর, চিতা আর বুনো হাতির পালের সঙ্গে লড়াই করে জীবনের বড়ো রকমের ঝুঁকি নিয়ে কিছু সাহেব সুদূর ইংলন্ড থেকে এখানে এসেছিল চা-বাগান করতে। তাদের সে প্রচেষ্টা সফল হয়েছে। অসমের চা-বাগানের চা-এর নাম আজ ভারতের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে।
ট্রেন, বাস, কখনও দুর্গম জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে বিষাক্ত সাপ আর রক্তচোষা জোঁকের হাত থেকে বাঁচতে বাঁচতে ওরা এক জায়গায় এসে দাঁড়াল। জায়গাটার নাম বোধ হয় দামছাড়া। দুর্গম জঙ্গলে ঢাকা এই দামছাড়া গ্রাম।
সারা পথে সাহেব দূরে দূরে ছিল। ট্রেনে ছিল অন্য কমপার্টমেন্টে। একটি কথাও বলেনি। অস্বাভাবিক গম্ভীর হয়ে ছিল। এমন ভাব যেন এদের চেনেই না। তার জন্যে জুলিরা কিছু মনে করেনি। তারা ছিল নতুন জায়গা দেখার আনন্দে বিভোর হয়ে।
এইবার তারা তিনজনে এসে দাঁড়াল একটা ছোটো টিলার ওপরে।
এতক্ষণে সাহেব কাঁধ থেকে পোঁটলাটা নামিয়ে রেখে কথা বলল।
এখান থেকেই আমরা আলাদা হয়ে যাব।
কিন্তু আমরা থাকব কোথায়?
সাহেব বলল, সেটা তোমরাই ঠিক করবে। তোমরা কোথায় থাকবে তার ব্যবস্থা করা আমার কথা নয়। তবু আমি তোমাদের হেলপ করছি–সোজা চলে যাও কিছু দূর। আমি শিলচরে নেমে জেনে নিয়েছি, বেশ কিছু দূরে লারসিংগার চা-বাগান। সেখানে একটা বাংলো আছে। সেখানেই থাকার ব্যবস্থা করে নাও।
আর তুমি?
সাহেব মুখ কঠিন করে বলল, শর্ত মেনে চলো, নইলে আমার হাতেই বিপদে পড়বে।
অভিজিৎ বলল, সরি সাহেব। তুমি যেখানে খুশি যাও। আর কোনো কথা জিজ্ঞেস করব না।
সাহেব তখনই টিলা থেকে নেমে চলে যাচ্ছিল, জুলি ব্যস্ত হয়ে ডাকল, সাহেব।
সাহেব ঘাড় বেঁকিয়ে তাকাল।
তোমার পোঁটলাটা ফেলে যাচ্ছ।
ওটার আর দরকার নেই।
জুলি অবাক হয়ে বলল, সে কী! এতেই যে তোমার সব আছে।
সাহেব এবার পায়ে পায়ে এগিয়ে এল এদের কাছে। বলল, হ্যাঁ, এতে আমার অনেক কিছু আছে। কিন্তু তার আর দরকার নেই। আমি ঠিক জায়গায় পৌঁছে গেছি। শুধু সেই বাড়িটা খুঁজে বার করা বাকি। সে বাড়িতে ঢুকতে গেলে কোনো বাড়তি বোঝা নিয়ে ঢাকা যাবে না।
সাহেবের সব কথাই বরাবর অদ্ভুত। এ কথাটা শুনেও তারা অবাক হয়ে গেল।
সাহেব তার বড়ো হলদে বিশ্রী দাঁতগুলো বের করল। বোধহয় হাসবার চেষ্টা করল। তোমরা কিছু জানতে চেয়েছিলে, তা আগে বলিনি। এখন বলতে পারি। কারণ এই মুহূর্তে নির্জন এই টিলার চারিদিকে জনমানবের চিহ্ন নেই। তোমাদের সঙ্গে আমার আর দেখাও হবে না। কলকাতায় ফিরে তোমরা যদি গোপন জিনিসটির কথা ফাঁস করেও দাও তাহলেও আমার ক্ষতি নেই। ততক্ষণে সেই মহামূল্য জিনিসটি আমার মুঠোয় চলে আসবে।
কী সেই মহামূল্য জিনিসটি বলবে কি? জিজ্ঞেস করল অভিজিৎ।
শয়তান ম্যাকবেথের মন্ত্রপূত তরোয়াল।
ম্যাকবেথের তরোয়াল! সে তো কবেকার কাহিনি। যদি ম্যাকবেথ নামে সত্যিই কেউ থেকেও থাকে তাহলে তার তরোয়াল এতদিন পর
হ্যাঁ, সম্ভব। ভুলে যেও না এটা ছিল ডাইনিদের মন্ত্রপূত তরোয়াল। ঐ তরোয়াল যার মুঠোয় থাকবে, পৃথিবীতে কোনো শক্তি তাকে মারতে পারবে না। সে তরোয়াল কোনোদিনই নষ্ট হবে না।
জুলি জিজ্ঞেস করল, তাহলে জনতার হাতে ম্যাকবেথ মরল কি করে?
সাহেব বলল, তার আগে তার তরোয়ালটা চুরি করে অন্য তরোয়াল রাখা হয়েছিল। নিরুপায় শয়তানটা নিজের তরোয়াল না পেয়ে বাধ্য হয়ে অন্য তরোয়াল নিয়ে লড়াই করেছিল। তাই তাকে খুব সহজেই মরতে হয়েছিল।
জুলি অবাক হয়ে বললে, আমি খুব ভালো করে শেক্সপীয়র পড়েছি। এসব তো লেখা নেই।
কোনো বইয়েতেই লেখা নেই। আছে শুধু আমার কাছে পুরনো পুঁথিতে। নইলে অকারণে জীবনের সুখ, ঐশ্বর্য, আনন্দ ছেড়ে সেই স্কটল্যান্ড থেকে অসমের এই জঙ্গলে ছুটে আসি?
তুমি কি বলতে চাইছ ম্যাকবেথের সেই তরোয়াল ঐ রহস্যময় বাড়িতেই আছে?
হ্যাঁ, আমার পুঁথি তাই বলছে। আর পুরনো দুষ্প্রাপ্য পুঁথি মিথ্যে বলে না।
জুলি বলল, কিন্তু ম্যাকবেথকে মাটি দেওয়া হলো তার দেশে আর তার তরোয়াল পড়ে রইল অসমে। এ তো অবাক কাণ্ড।
সাহেব বলল, অবাক হবার কিছু নেই। ম্যাকবেথের তরোয়াল আগেই সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তারপর তা একজনের হাত থেকে অন্যজনের হাতে হাতে ঘোরে। সে তরোয়াল যোগ্য লোক ছাড়া যার হাতেই যায় তার সর্বনাশ হয়। শেষ পর্যন্ত তোমাদের এই ভারতবর্ষের কোনো সাধুই একজন পাদ্রীকে বলে দেয়, এই তরোয়ালের হাত থেকে বাঁচতে হলে কোথাও গোপনে লুকিয়ে রাখো।
অভিজিৎ বলল, কেন, তরোয়ালটা ভেঙে ফেলে দিলেই হতো?
সাহেব বলল, ও তরোয়াল ভাঙা যায় না, আগুনে পোড়ে না, সমুদ্রে ডোবে না। তাই পাদ্রীর নির্দেশে এটাকে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। আর ম্যাকবেথের প্রেতাত্মা তার প্রিয় তরোয়ালটিকে আগলে রাখার জন্যে সেই বাড়িতেই আজও রয়েছে। বহুকাল পর আমি আর একবার সেই শয়তানটার মুখোমুখি হতে চাই।
