অভিজিৎ রাগল না। বলল, সঙ্গে নিতে আপত্তি কী? আমি তো ঐ বাড়িটার ধারে কাছে যাব না। শুধু তোমার সঙ্গে গিয়ে অসমটা দেখা নেওয়া আর কি?
সঙ্গে সঙ্গে জুলি বলে উঠল, হা সাহেব, প্লিজ আপত্তি কোরো না। আমিও তাহলে দাদার সঙ্গে যাব।
সাহেব গম্ভীর গলায় বলল, তোমরা ছেলেমানুষি করছ। যে জায়গার খোঁজে আমি একা একা কত বছর ধরে ঘুরে বেড়িয়েছি, আজ আমি সঙ্গে করে কাউকে নিয়ে যেতে পারি ভাবলে কী করে? সে গোপন জায়গার খোঁজ আমি কাউকে দেব না। এমনকি ওখানে পৌঁছে যদি তোমাদের সেই ফ্যামিলি ফ্রেন্ডকেও দেখতে পাই তাহলে তাকেও তখুনি মরতে হবে। হ্যাঁ, আমার হাতেই মরতে হবে। আমার ক্ষমতা কতখানি তা জান না। আমার পথে বাধা দিতে এসেছিল তিনজন। তিনজনকেই আমি এইভাবে গলা টিপে শেষ করে দিয়েছি। বলে দুহাত তুলে মোটামোটা আঙুলগুলো ছড়িয়ে দিল।
জুলির মা আঁৎকে উঠলেন।
জুলি বলল, আমরা তোমায় কথা দিচ্ছি যদি ঐ বাড়ি তুমি খুঁজে পাও তাহলে তার ত্রিসীমানাতেই আমরা যাব না। কারণ ঐ বাড়িতে কী আছে আমরা জানি না, জানবার কৌতূহলও নেই।
জুলির কথায় সাহেব একটু নরম হলো। বলল, তাহলে সেই ভয়ংকর জঙ্গলে তোমরা যেতে চাইছ কেন?
অভিজিৎ বলল, শুধু জায়গাটা দেখবো।
জুলি বলল, দেখ সাহেব, তুমি অনেক জঙ্গল, পাহাড়-পর্বত ঘুরেছ। তোমার সঙ্গে আমরা যদি কদিন থাকতে পারি তাহলে তোমার কাছ থেকে কত গল্প শুনতে পাব। সেটাই আমাদের লাভ। তাছাড়াজুলি একটু থামল।
সাহেব তাকাল।
তাছাড়া এই দুদিনেই তুমিও আমাদের ফ্যামিলির একজন হয়ে গেছ। তোমার সঙ্গে গেলে আমাদের এতটুকু ভয় করবে না।
সাহেব অনেকক্ষণ চুপ করে কী ভাবল। তারপর বলল, বেশ, নিয়ে যাব। কিন্তু কতকগুলো কডিশান আছে।
কী শর্ত বলো।
সাহেব বলতে লাগল, প্রথমত সেখানে আমি যেখানে থাকব সেখানে তোমরা থাকবে না।
বেশ রাজি।
দ্বিতীয়ত আমার কাজে কোনো কৌতূহল দেখাবে না। আমি কোথায় যাচ্ছি না যাচ্ছি সেদিকে তাকাবে না। সেখানে তোমরা অসুখে পড়লে বা বিপদে পড়লেও আমি কাছে গিয়ে দাঁড়াব না।
ঠিক আছে। ওখানে আমরা ইনডিপেন্ডন্টলি নিজের নিজের মতো থাকব।
থার্ডলি, তোমরা নিজেরা ইচ্ছে মতো ফিরে আসবে। আমি কবে ফিরব, না ফিরব, কোনদিক দিয়ে ফিরব সে আমার ব্যাপার।
অভিজিৎ বলল, হ্যাঁ অবশ্যই।
ফোর্থলি, আমি আবার বলছি, যদি দেখি তোমরা আমায় ফলো করছ তাহলে তার পরিণতির জন্যে তোমরা দায়ী থাকবে।
হ্যাঁ। রাজি।
ফিফথলি, খরচ সব তোমাদের। তোমাদের জন্যে আমি একটা রুপিও খরচ করব না।
জুলি আর অভিজিৎ দুজনেই হেসে উঠল। বলল, ওর জন্যে ভেবো না সাহেব। আমরা বেগার (begger) নই।
.
খুব বিরক্ত হয়েই সাহেব ওদের নিয়ে অসমের উদ্দেশে রওনা হয়ে গেল। ওরা চলে গেল আর পরের দিনই কলকাতা থেকে এল গুরুদেবের ছেলের চিঠি। লিখেছে, প্রথমেই জানাই কয়েক দিনের জন্যে কলকাতায় এসেছি। তারপর বাংলাদেশে চলে যাব। পরে জানাই ঐ ভাবে হঠাৎ চলে আসায় আপনারা নিশ্চয় অবাক হয়েছেন। আমার অভদ্রতাও হয়েছে। স্বীকার করি। কিন্তু কেন ঐভাবে চলে আসতে হলো সে কথা সেদিন বলতে ভরসা পাইনি বিশেষ করে আপনার মেয়ের সামনে। আপনার মেয়ে আমাকে দুচক্ষে দেখতে পারে না, অপমান করে। আমার অপরাধ কী, না আমি বলেছিলাম আপনাদের বাড়িতে প্রেতাত্মার যাওয়া আসা আছে। সেই কারণে আপনাদেরই মঙ্গলের জন্যে যজ্ঞশান্তি করতে চেয়েছিলাম। আপনারা আমার কথা তো বিশ্বাস করেনইনি, উল্টে আপনার মেয়ে আমাকে যথেচ্ছ অপমান করে। সেইজন্যেই কী কারণে চলে আসতে হলো বলতে চাইনি। আজ বলছি।
ঐ সাহেবটি আসার পর থেকেই ওর ওপর আমার সন্দেহ হয়। লোকটা ঠিক স্বাভাবিক নয়। আমার সামনাসামনি ঘর। তাই লক্ষ্য রাখতে লাগলাম। এই গরমেও দুদিনের মধ্যে ওকে স্নান করতে দেখিনি। প্যান্ট-জামা ছাড়তে দেখিনি, কোনোদিন রান্না করতে দেখিনি। শুনেছিলাম ও নাকি বাইরে থেকে খেয়ে আসে। বাইরে থেকে খেয়ে আসে কেন? আপনাদের বাড়িতে তো আদর-যত্নর ত্রুটি নেই। আমি তো আপনাদের কাছে বেশ কয়েকদিন থেকে সেই কথাটাই বুঝে গেলাম। তবে কেন সাহেব খেতে চাইত না?
সেদিন রাত তখন এগারোটা হবে। সাহেবের ঘরে খুটখাট শব্দ হচ্ছিল। ভাবলাম এত রাতে সাহেব কী করছে দেখি তো? উঁকি মেরে দেখলাম সাহেবের ঘরের দরজা ঠেসানো। অন্যদিন ঘরে ঢুকেই খিল দিয়ে দেয়। আজ বোধহয় খিল দিতে ভুলে গেছে। খুব কৌতূহল হলো। পা টিপে টিপে ওর দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। দরজাটা সাবধানে ফাঁক করলাম। অমনি যে দৃশ্য আমার চোখে পড়ল তা দেখে আঁৎকে উঠলাম। দেখলাম সাহেব দুহাতে করে বড়ো বড়ো কাঁচা মাংসের টুকরো খাচ্ছে। মাংসের রক্ত ওর দুকষ বেয়ে গড়াচ্ছে। আর ঠিক তখনই সাহেব আমাকে দেখে ফেলল। সঙ্গে সঙ্গে ও সেই রক্তমাখা হাত তুলে মোটা মোটা আঙুলগুলো ফাঁক করে আমার গলা টিপে ধরতে এগিয়ে এল। আমি ভয়ে বারে বলে চিৎকার করে ছুটে ঘরে গিয়ে খিল দিয়ে দিলাম।
এই হলো ব্যাপার। আমি নিশ্চিত ও মানুষ নয়– রাক্ষস কিংবা দানব কিংবা পিশাচ। আপনাদের আবার সাবধান করে দিলাম। যত শীঘ্র পারেন ওকে তাড়ান। নইলে পুলিশে দিন। নতুবা বিপদে পড়বেন…
চিঠি পড়ে সুধীনবাবু অবাক। জুলির মাও পড়লেন। এ কী সম্ভব? লোকটা একটু পাগলাটে আছে ঠিকই কিন্তু ঠাকুরমশাই যা বলছেন তা সত্যি হলে তো মারাত্মক ব্যাপার। আর এই লোকের সঙ্গে ওঁর ছেলেমেয়ে দুটো অজানা অচেনা জায়গায় গেল! কোনো ঠিকানা পর্যন্ত নেই! এখন তো ওদের সাবধান করে দেবারও উপায় নেই। তাহলে? গভীর দুশ্চিন্তায় পড়লেন সুধীনবাবু আর তাঁর স্ত্রী।
