জুলি বলল, সে তো জনসাধারণের হাতে ক্ষমা পায়নি। সেও তো খুন হলো।
সাহেব বলল, খুন হয়ে সে কি মনে করেছে পাঁচশো বছর ধরে দিব্যি নিশ্চিন্তে কবরের মধ্যে ঘুমোবে? না, তা হতে দেব না।
সাহেবের এ কথায় সকলেই অবাক হয়ে গেল। এ তো বদ্ধ পাগলের মতো কথা! যে মৃত–কবরের মধ্যে যার হাড়গুলো পর্যন্ত ধুলো হয়ে গেছে, তার ওপর আজ কী প্রতিশোধ নেবে? কেনই বা অতি তুচ্ছ অতি সাধারণ স্কটল্যান্ডবাসী একটা আধপাগলা সাহেব প্রতিশোধ নিতে যাবে?
সে কথাটাও সাহেব ধীরে ধীরে পরিষ্কার করে দিল।
একবার উঠে নিজের ঘরে গেল। তারপর সেই মস্ত পোঁটলা থেকে বের করে আনল পেতলের একটা ছোট্ট ক্যাশবাক্স।
জুলি দেখল ক্যাশবাক্সটার দু হ্যাঁন্ডেলে মোটা সুতো বাঁধা। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, এরকম সুতো বাঁধা কেন?
সাহেব গম্ভীরভাবে বলল, আমার পোঁটলার গায়ে এটা সেফটিপিন দিয়ে লাগানো থাকে। বলা তো যায় না কখন কে এটা তুলে নেয়।
কী অমূল্য রত্ন আছে এর মধ্যে? ঠাট্টা করে বলল জুলি।
সেটা দেখাবার জন্যেই তো নিয়ে এলাম। বলে খুব যত্ন করে ক্যাশবাক্সর ডালাটা খুলে তার মধ্যে থেকে একটা শক্ত কাগজের খাম বের করল। তার মধ্যে থেকে বেরুল ঠিকুজি কুষ্টির মতো পাকানো একটা কাগজ। সাহেব গম্ভীর গলায় বলল, আজ পর্যন্ত বাইরের কাউকে আমার সত্যিকার পরিচয় দিইনি। আজ তোমাদের কাছে তাই দেব।
এই পর্যন্ত বলে সাহেব কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল, আমি হচ্ছি গ্রেট ব্যাংকোর একমাত্র বংশধর।
এই বলেই সে পাকানো কাগজটা সবার সামনে খুলে দেখাল।
এমন একটা অদ্ভুত কথা শোনার জন্যে কেউই প্রস্তুত ছিল না। সবাই ঝুঁকে পড়ল কাগজটার ওপর। খুব ছোটো ছোটো জড়ানো অক্ষরে অনেকগুলো নামের তালিকা। পড়ার সাধ্য কারো নেই। সাহেব গর্বভরে বললে, এরা সব আমার পূর্বপুরুষ।
জুলি কিছুমাত্র ইতস্তত না করে বলল, তুমি কী বলতে চাইছ আমি তো তার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারলাম না।
সাহেব বললে, না বুঝতে পারার কারণ কী? আমি যে মহামান্য বীর ব্যাংকোর বংশধর তার প্রমাণ তো দেখালাম।
জুলি বলল, কিন্তু সাহেবদাদা, ব্যাংকো বলে সত্যিই কি কেউ ছিল? কবিরা ঐরকম কত চরিত্র কল্পনায় সৃষ্টি করে থাকেন।
কখনোই না। পোয়েটগ্রা যা কিছুই সৃষ্টি করে তার অনেকখানিই সত্য। শেক্সপীয়রের অন্য নাটকগুলোর মধ্যে রিচার্ড দ্য সেকেন্ড, জুলিয়াস সিজার, কিং লিয়ার, কিং জন কি সত্যি সত্যি ছিলেন না। কাজেই প্লিজ বাজে তর্ক কোরো না। আমি যে ব্যাংকোর বংশধর তা বিশ্বাস করতে চাও কোরো, না হলে কোরো না। তাতে আমার কিছু আসে যায় না। বলে রাগে গোঁজ হয়ে বসে রইল।
সুধীনবাবু বললেন, বেশ, আমরা মানলাম তুমি সেই ব্যাংকোরই বংশধর। কিন্তু তুমি যে বললে, এতকাল পর ম্যাকবেথের ওপর প্রতিশোধ নেবে, কী করে তা সম্ভব?
অভিজিৎ এতক্ষণ মুখ টিপে হাসতে হাসতে সাহেবের পাগলামির কথা শুনছিল। এবার বলল, তুমি কি মনে কর সাহেব, ম্যাকবেথের মৃতদেহ স্কটল্যান্ডে সমাধি না দিয়ে সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে আসামে সমাধি দিতে এসেছিল?
ও নো নো মাই ডিয়ার–আমি ম্যাকবেথের ডেডবডির কথা তো বলিনি।
তাহলে ঐ বাড়িতে কী আছে? কি জন্যে ওখানে যেতে চাইছ? কোনো গুপ্তধন?
আই হেট মানি। ধন-দৌলতকে আমি ঘৃণা করি। দেখবে আমার কত টাকা? বলে সাহেব তার লম্বা কোটের–যে কোটটা সে কখনও ছাড়ে না–পকেটে হাত ঢোকাচ্ছিল, অভিজিৎ বলল, থাক। দেখাবার দরকার নেই। আমরা জানি তোমার অনেক টাকা। তুমি শুধু বলো ঐ বাড়িতে কী আছে।
সাহেব এদিক থেকে ওদিক বার দুই মাথা নেড়ে বলল, সে কথা আমি কিছুতেই বলব না। এইটুকু শুধু বলতে পারি, ঐ বাড়ির মধ্যে সুরক্ষিত ভাবে যে জিনিসটি আছে তার খোঁজে পাঁচশো বছর ধরে কত দেশের কত মানুষ পাগলের মতো ঘুরে বেড়িয়েছে। কেউ তার ট্রেস পায়নি। পেয়েছি শুধু আমি। এই–এই দ্যাখো সেইসব পুরনো পুঁথি–বই।
সবাই ঝুঁকে পড়ল। কিন্তু সেই দুর্বোধ্য লাতিন ভাষা কেউ বুঝতে পারল না।
কিছুক্ষণ চুপচাপ। কেউ কথা বলছে না। জুলি আর অভিজিৎ লুকিয়ে চোখ চাওয়া-চাওয়ি করে হাসছে। আর সাহেব একটা পায়ের ওপর অন্য পা-টা তুলে হাতের ওপর থুতনি রেখে কী যেন ভাবছে।
এবার তাহলে কি করবে? জিজ্ঞেস করলেন সুধীনবাবু।
সাহেব মনে মনে বোধহয় সেই রহস্যময় বাড়িতে চলে গিয়েছিল। চমক ভাঙল। বললে, আঁ, কি করব? কালই এখান থেকে স্টার্ট করব।
একটু থেমে বলল–এখানে তোমাদের ভালো ব্যবহারের কথা কোনোদিন ভুলব না। আমি স্কচ। যে উপকার করে সে যে দেশের মানুষই হোক তার ওপর কৃতজ্ঞ থাকাই আমাদের ধর্ম। তোমরা প্রত্যেকেই ভেরি গুড। তবে
তবে কি? জুলি জিজ্ঞেস করল।
শুনলে তোমরা দুঃখ পাবে, আমার ঘরের সামনেই যে লোকটি ছিল সে মোটেই ভালো লোক নয়। আমার সম্বন্ধে তার বড্ড বেশি কৌতূহল ছিল। জানই তো বেশি কৌতূহল আমি মোটেই পছন্দ করি না। এই পর্যন্ত বলে সাহেব হঠাৎ থেমে গেল। বলল, ভাবছি কাল সকালেই আমি যাব।
অভিজিৎ হঠাৎ নরম গলায় বলল, সাহেব, একটা রিকোয়েস্ট করব। রাখবে?
সাহেব কথা না বলে অভিজিৎ-এর দিকে তাকাল।
তুমি যদি আমাকে সঙ্গে নাও তাহলে আমি বড়োই খুশি হই। আর সেই সঙ্গে
কথা শেষ করতে না দিয়েই সাহেব রেগে উঠে বলল, no! আমি কাউকে সঙ্গে নেব না।
