সাহেব উত্তেজনায় ছুটে এসে জুলির হাত দুটো জড়িয়ে ধরে বলল, থ্যাঙ্ক ইউ থ্যাঙ্ক ইউ। জায়গাটার কত খোঁজ করেছিলাম–কোথায় না গিয়েছিলাম–পাহাড়ে, জঙ্গলে, নদীর ধারে ধারে। এমনও দিন গেছে, খেতে পাইনি, জন্তু মেরে কঁচা মাংস পর্যন্ত খেয়েছি। আজ সে জায়গার সন্ধান পেলাম।
বলতে বলতে হঠাৎ সে উঠে নিজের ঘরে চলে গেল। তারপর একটা কাঠের ছোটো বাক্স হাতে করে চেয়ারে এসে বসল, বাক্সটা খুলে একটা হলদে হয়ে যাওয়া জীর্ণ কাগজ বের করল। তাতে অনেক কিছুই লেখা। কাগজটা সবার সামনে টেবিলের ওপর রেখে বলল, বাড়িটার বর্ণনা এখানে পরিষ্কার দেওয়া আছে। তোমাদের এখানে এসে সেই বাড়ির ছবিটাই নিজের চোখে দেখলাম। কাগজের বর্ণনার সঙ্গে ছবিটা হুবহু মিলে যাচ্ছে। থ্যাঙ্ক ইউথ্যাঙ্ক
জুলি বলল, ও বাড়িতে কী আছে? ওখানে যেতেই বা চাইছ কেন?
সাহেব আবার রেগে উঠল। বলল, বেশি কৌতূহল ভালো নয় মিস। ওটা আমার পার্সোনাল ব্যাপার।
জুলি ঘাবড়াল না। বলল, আমাদের বললে তোমার কোনো ক্ষতি হবে না। ঐ বাড়িটা সম্বন্ধে আমাদের বন্ধুটিরও কৌতূহল ছিল। আর সেই কৌতূহল মেটাতে গিয়েই যে সে মরেছে তাতে আমাদের কোনো সন্দেহ নেই।
সাহেব বলল, হ্যাঁ, যদি সে সত্যিই সেখানে পৌঁছে থাকে তাহলে মরেছেই।
জুলি বলল, এই জন্যেই আমাদের কৌতূহল স্বাভাবিক। তাছাড়া একটু আগেই তুমি বলে ফেলেছ শয়তান ম্যাকবেথের হাত থেকে কারও নিষ্কৃতি নেই। যদি এতই গোপনীয় হয় তাহলে ও কথাটা বললে কেন?
জুলির কথায় সাহেব থমকে গেল। একটু ভেবে বলল, ম্যাকবেথের নাম শুনেছ কখনও?
জুলি বলল, তা শুনব না কেন? ম্যাকবেথ গ্রেট ড্রামাটিস্ট শেক্সপীয়রের একটা বিখ্যাত নাটকের নাম।
সাহেব অবাক হয়ে বলল, তুমি শেক্সপীয়র পড়েছে?
অবশ্যই। শুধু ম্যাকবেথ কেন? রিচার্ড দ্য সেকেন্ড, দ্য টেমপেস্ট, কিং লিয়ার, জুলিয়াস সিজার….কত বলব?
গোয়ালপাড়ার মতো একটা গ্রামের মেয়ে শেক্সপীয়রের এতগুলো বই পড়ে ফেলেছে জেনে সাহেব অবাক হলো। সেই সঙ্গে একটু নরমও হলো।
বলল, ম্যাকবেথকে তোমার কিরকম লাগে?
জুলি বলল, দুনিয়ায় যদি একশো জন লোভী, নিষ্ঠুর আর অকৃতজ্ঞ রাজা থাকে তাহলে ম্যাকবেথ তাদের মধ্যে এক নম্বর।
সাহেব বলল, শুধু লোভী আর অকৃতজ্ঞই নয়, লোকটা ছিল একটা পাক্কা শয়তান। অরণ্য অঞ্চলের এক নির্জন প্রান্তরে যে একদল ভয়ংকর দেখতে গালে দাড়ি ডাইনিরা ঘুরে বেড়াত তাদের সঙ্গে বোন সম্পর্ক পাতিয়ে ম্যাকবেথ তাদের ইচ্ছেতেই দেশের আর নিজেরও সর্বনাশ করেছিল।
জুলি বলল, অথচ ম্যাকবেথের মতো অতবড়ো বীর সেনাপতি যদি না সেদিন রাজা ডানকানের পাশে থাকত তাহলে কিছুতেই নরওয়ের রাজা সোনোর হাত থেকে স্কটল্যান্ডকে রক্ষা করতে পারত না।
থামো! হঠাৎ গর্জে উঠল সাহেব। তুমি দেখছি সেই শয়তানটারই গুণগান করে যাচ্ছ। রাজার আর একজন অতি বিশ্বস্ত বীর সেনাপতি ব্যাংকোর কথা তো বলছ না? আর ম্যাকবেথ যে এত বড়ো যোদ্ধা হয়ে উঠেছিল তা শুধু নিজের ক্ষমতায় নয়, ডাইনিদের মন্ত্ৰপড়া তরোয়ালটার জোরে। তরোয়ালটা সে এক মুহূর্তের জন্যে কাছছাড়া করত না।
জুলি তরোয়ালের কথায় গুরুত্ব না দিয়ে হেসে বলল, তুমি মিথ্যে রাগ করছ। ম্যাকবেথের কথা তুললে বলেই ম্যাকবেথের কথা বলছিলাম। নইলে ব্যাংকোকে কি উপেক্ষা করতে পারি? আমার তো মনে হয় ম্যাকবেথ নাটকে ব্যাংকোর মতো অত ভালো, অত বিশ্বস্ত, অত হতভাগ্য চরিত্র দুটি নেই।
সাহেব আবার নরম হলো। বলতে লাগল, একবার সেই দৃশ্যটা কল্পনা করো মিস, ম্যাকবেথ আর ব্যাংকোর নেতৃত্বে একদিকে ডানকান-বাহিনী, অন্যদিকে বিদ্রোহী ম্যাকডোনাল্ড আর স্যেনোর নরওয়ে বাহিনী। ফাইডের আকাশ শুধু ঘোড়ার খুরের ধুলোয় ধুলোয় অন্ধকার–বিস্তীর্ণ প্রান্তর রক্তে রক্তাক্ত! সেই অসম্ভব যুদ্ধে জয়ী হলো ঐ ম্যাকবেথটা আর সকলের প্রিয় ব্যাংকো। তারপর
জুলি বলল, তারপর ম্যাকবেথ ফের দেখা করল সেই ছাগলদাড়ি ডাইনি বোনদের সঙ্গে। তারা মুখ টিপে হেসে ম্যাকবেথকে বললে, এবার তুমি রাজা হবে।
ম্যাকবেথ অবাক হয়ে বললে, আমি রাজা হব! কী করে তা সম্ভব? আমি তো সামান্য সেনাপতি। তাছাড়া মহামান্য, মহাপ্রাণ রাজা ডানকানের নিজেরই তো ছেলে আছে।
ডাইনিরা তাকে মন্ত্রণা দিল, একটু বুদ্ধি খরচ করে চেষ্টা করলেই হবে। বলেই ডাইনিরা অদৃশ্য হয়ে গেল।
সাহেব বলে উঠল, আর মনে করে দেখো তখনই ব্যাংকো বন্ধুকে পরামর্শ দিয়েছিল– সাবধান! ডাইনিদের কথায় ভুলো না বন্ধু।
কিন্তু ততক্ষণে ম্যাকবেথের মনে রাজা হবার লোভ জেগে উঠেছে।
জুলি বলল, রাজা ডানকান ম্যাকবেথের ওপর খুশি হয়ে তাকে অন্য একটি জায়গায়– আহা কী যেন নাম–
সাহেব বলল, কডর!
হ্যাঁ, কডরের অধিপতি করে দিলেন। আর সেই অকৃতজ্ঞ লোকটা গোটা স্কটল্যান্ডের রাজা হবার লোভে শেষ পর্যন্ত নিজের হাতে খুন করল রাজা ডানকানকে।
তারপর–তারপর বলো। উত্তেজিত হয়ে উঠল সাহেব। তারপর কী করল শয়তানটা? যেহেতু ব্যাংকো বলেছিল, বন্ধু, ডাইনিদের কথা শুনো না, সেই কারণে ম্যাকবেথ ভাবল ব্যাংকো বুঝি তার সৌভাগ্যে হিংসে করছে, তাই একদিন রাতে, বন্ধুকে নেমন্তন্ন করে ডেকে মাঝপথে লোক লাগিয়ে খুন করে দিলে।–বলতে বলতে সাহেব পাগলের মতো চেঁচিয়ে উঠল, এই অপরাধের কি কোনো ক্ষমা আছে?
