এইসব কথা নিজের মনে ভাবতে ভাবতে সে যখন ঘুরছিল তখন হঠাৎ চোখে পড়ল সাহেবের খোলা জানলা দিয়ে দু-তিনটি কাক ঢুকে কী যেন মুখে করে আনছে। তাড়া দিতেই একটা কাকের মুখ থেকে যেটা পড়ে গেল সেটা দেখে জুলি বেশ অবাক হয়ে গেল।
এক টুকরো বড়ো কঁচা মাংস। মাংসের গায়ে রক্ত লেগে রয়েছে।
জুলি প্রথমে ভাবল সাহেব বোধহয় বেঁধে খাবে বলে মাংস কিনে এনে রেখেছিল। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো এ দুদিন তো সাহেবকে রাঁধতে দেখা যায়নি। একটা ছোটো স্টোভ আছে বটে তাতে চা করা যায় কিন্তু মাংস রাঁধা যায় না। তাছাড়া সাহেবের কাছে কড়াই, ডেকচি, হাঁড়ি, এসব আছে বলেও তো মনে হয় না। তাহলে? কাঁচা মাংস আনার কারণ কী?
ভাবতে ভাবতে জুলি বাড়ি এসে ঢুকল। আর ঐ চিন্তাটা মাথা থেকে চলে গেল।
সাহেব সকালেই কোথায় বেরিয়েছিল, এইমাত্র ফিরল একটা ইংরিজি খবরের কাগজ হতে করে। বাইরের ঘরে ছেলেমেয়েদের নিয়ে সুধীনবাবুকে বসে থাকতে দেখে সাহেব টুপি খুলে সবাইকে গুড মর্নিং জানাল।
সুধীনবাবু হেসে জিজ্ঞেস করলেন, এত সকালে কোথায় বেরিয়েছিলে?
সাহেব বললে, একটা কাজ ছিল। এবার তো যেতে হবে। তাই কাজগুলো চুকিয়ে ফেলছি।
অভিজিৎ মনে মনে হাসল, কাজ যে কত তা জানতে বাকি নেই। পুরনো ভাঙাবাড়ি খুঁজে বেড়ানো। কত রকমের পাগলই না আছে!
জুলির মা এক কাপ কফি তৈরি করে নিয়ে এসে সাহেবের হাতে দিলেন। সাহেব হেসে বলল, থ্যাঙ্ক ইউ।
মুশকিল হয় সাহেবের সঙ্গে কথা বলতে গেলে। সে নিজে থেকে যদি কিছু বলে তাহলে শোনা যায়, কিন্তু কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে হয় উত্তর দেয় না, নইলে এলোমেলো উত্তর দেয়। যেমন জুলি হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, সাহেব তুমি কি স্নান কর না? দুদিন তো তোমায় স্নান করতে দেখলাম না?
সাহেব উত্তরে বললে, তোমাদের এই জায়গাটা তোমাদের মতোই বড়োই সুন্দর। আমার খুব ভালো লেগেছে। যেখানে যাচ্ছি, সেখান থেকে যদি ফিরে আসতে পারি তাহলে আবার তোমাদের সঙ্গে দেখা করে যাব।
সুধীনবাবু বললেন, ধন্যবাদ। কিন্তু তুমি এখান থেকে কোথায় যাবে?
সাহেব কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে রইল। তারপর বলল, আমার যাওয়ার কি কোথাও ঠিক আছে, বাবু? আমি সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়িয়েছি। যা খুঁজছি তা এখনও পাইনি।
জুলি বলল, তাহলে তুমি ঠিক ট্যুরিস্ট নও। ট্যুরিস্টরা নানা জায়গা দেখবার জন্যেই ঘুরে বেড়ায়। কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে ঘোরে না। কিন্তু দেখছি তোমার ঘুরে বেড়াবার পেছনে একটা বিশেষ উদ্দেশ্য আছে। তাই না?
সাহেব যেন ধরা পড়ে গেল। তাই গম্ভীরভাবে বলল, তা হয়তো ঠিক।
তোমার উদ্দেশ্যটা আমাদের কাছে বলতে বাধা আছে কি?
হ্যাঁ আছে। অবশ্যই আছে। আর আমার সম্বন্ধে বেশি কৌতূহলটা আমি মোটেই পছন্দ করি না। বলতে বলতে সাহেবের মুখটা চাপা রাগে লাল হয়ে গেল।
সাহেবের কাছ থেকে এইরকম উত্তর কেউই আশা করেনি। সবাই যেন গালে চড় খেলো।
হঠাৎ সাহেবের চোখে পড়ল দেওয়ালে টাঙানো একটা ছবি। সে বসে বসেই ছবিটি দেখতে লাগল। তার মুখের ভাবের পরিবর্তন হলো। মুগ্ধ স্বরে বলে উঠল, বাঃ, চমৎকার ছবি তো!
বলতে বলতেই সাহেব গৃহকর্তার অনুমতি না নিয়েই ছবিটার কাছে উঠে গেল। তারপর গভীর মনোযোগের সঙ্গে ছবিটা দেখতে লাগল। দেখতে দেখতে সাহেবের দুচোখ বড়ো বড়ো হয়ে উঠল, গা কঁপতে লাগল। উত্তেজিত গলায় জিজ্ঞেস করল, এ ছবি তোমরা কোথা থেকে পেয়েছ?
সাহেবের এইরকম উত্তেজনায় সকলেই চমকে উঠল। সুধীনবাবু ভয়ে ভয়ে বললেন, আমাদের একজন ফ্যামিলি ফ্রেন্ড এটা দিয়েছিল।
এ ছবি সে কোথায় পেয়েছিল?
সুধীনবাবুই উত্তর দিলেন, কলকাতার একটা পুরনো কাগজের দোকানে। বিলেতের একটা ইংরিজি ম্যাগাজিনে ছবিটা ছাপা হয়েছিল। ছবির সঙ্গে বাড়িটার ইতিহাসও ছিল। আনফচুনেটলি সেটা পাওয়া যায়নি। ছিঁড়ে গিয়েছিল।
ওঃ মাই গড! বলে সাহেব সেখানেই একটা চেয়ারে বসে পড়ল।
একটু পরে বলল, তোমরা কি প্লিজ তোমাদের সেই ফ্যামিলি ফ্রেন্ডের সঙ্গে আমার দেখা করিয়ে দেবে?
অভিজিৎ বলল, সরি সাহেব, হি ইজ নো মোর। সে আর বেঁচে নেই।
মুহূর্তে ঘরটায় যেন শোকের ছায়া নেমে এল। সবাই চুপ করে রইল।
জুলিই প্রথমে নীরবতা ভাঙল। বলল, জান সাহেব, তোমার মতো সেও ছবিটা দেখে কেমন হয়ে গিয়েছিল। বলেছিল, ঐ বাড়িটা তাকে খুঁজে বের করতেই হবে। তারপর সেই যে চলে গেল, আর ফিরল না। কোথায় কিভাবে মরল তা কে জানে!
সাহেব ভুরু কুঁচকে বলল, সে যে মরেছেই তার কোনো প্রমাণ পেয়েছ?
প্রমাণ? কাগজে কলমে প্রমাণ না পেলেও এমন কিছু প্রমাণ এ বাড়ির সকলেই পেয়েছে যা প্রকাশ করে বলা যায় না। সুধীনবাবু শুধু বললেন, বেঁচে থাকলে সে নিশ্চয় এতোদিনে ফিরে আসত।
সাহেব যেন নিজের মনেই বলল, যদি ঐ বাড়িতে গিয়ে থাকে তাহলে কোনোদিনই ফিরবে না। শয়তান ম্যাকবেথের হাত থেকে কারো নিষ্কৃতি নেই। প্রকাশ্যে বলবে, কিন্তু ছবির এই বাড়ি কোথায় তা সে জানবে কি করে?
জুলি ভুল করে ফেলল। বললে, ছবির এক কোণে ছেঁড়া ছেঁড়া কতকগুলো অক্ষর আছে। তাই থেকেই
ছেঁড়া ছেঁড়া অক্ষর? সাহেব লাফ দিয়ে উঠে ছবিটার কাছে গিয়ে অক্ষরগুলো দেখতে লাগল। তারপর হতাশ হয়ে বলল, না, কিছুই বুঝলাম না।
জুলি হেসে বলল, কিন্তু আমাদের সেই ফ্রেন্ডটি বুঝে নিয়েছিল। As for Assam, N for North…….ar for Kachar.
