এত অপমান সত্ত্বেও কিন্তু ঠাকুরমশাই বাড়ি থেকে নড়লেন না। তিনি এখন তীর্থদর্শন সেরে এ-বাড়ি ও-বাড়ি পুজো করে বেড়াচ্ছেন। জুলির মা একদিন বিরক্ত হয়ে সুধীনবাবুকে বললেন, ঠাকুরমশাই তো যাবার নাম করেন না। কী উদ্দেশ্য বুঝতে পারছি না। পাকাপাকিভাবে থেকে গেলেন নাকি?
সুধীনবাবু দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললেন, কী করব? মুখের ওপর যাও তো বলতে পারি না।
.
ঢিলে প্যান্ট, লম্বা কোট, মাথায় হ্যাট, কাঁধে মস্ত পোঁটলা, অস্বাভাবিক মোটা মোটা আঙুল, ঝোলা ঠোঁট, মাথাটা নারকেলের মতো এই মানুষটাকে দেখে ভুরু কোচকান ঠাকুরমশাই। মনে মনে বলেন, এ আপদ আবার কোথা থেকে জুটল।
কিন্তু আর কেউ বিরক্ত হলো না। এ বাড়ির এই একটা গুণ–যে কেউই অতিথি হয়ে আসতে পারে। থাকতে দেবার জায়গার অভাব নেই, খেতে দেবার ক্ষমতাও আছে। এ তো আবার সাহেব। আমাদের এখনও সাহেব-মেমদের প্রতি সমীহভাবটা যায়নি।
জুলি যখন শুনল লোকটার কেউ কোথাও নেই, টুরিস্ট মানুষ–সুদূর স্কটল্যান্ড থেকে ভারতে এসেছে। তারপর দিল্লি, কানপুর, বেনারস, পাটনা হয়ে কলকাতা। তারপর একেবারে এই সমুদ্রগড়ে। তখন দাদার মতোই খুশি হলো। অভিজিৎ-এর উদ্দেশ্য সাহেবকে নিয়ে কাগজে কিছু লেখে। আর জুলি ভাবল লোকটা যদি দু-চারদিন এখানে থাকে তাহলে তার দেশের কথা, বাড়ির কথা–ট্যুরিস্ট জীবনের কথা শোনে।
সাহেব খুশি মনেই থাকল। তার জন্যেও একটা বাথরুমওলা ঘরের ব্যবস্থা করা হলো। কিন্তু কী খাবে? একজন খাস স্কচ সাহেব তো আর ভাত, ডাল, সুক্তো, মাছের ঝোল খেতে পারবে না। তাহলে?
সাহেবই তাদের বাঁচিয়ে দিলো। বলল, আমার খাবার জন্যে ভাবতে হবে না। বাইরে ইচ্ছেমতো খেয়ে নেব। তোমরা যে দুদিনের জন্য থাকতে দিয়েছ এর জন্যে ধন্যবাদ।
শুধু খাওয়াই নয়, সাহেব আলাদা ঘর পেয়ে নিজেই চা বা কফি করে নেয়। ঐ বিরাট পোঁটলার মধ্যে যেমন একগাদা পুরনো বই আছে, কাগজ আছে, কালি কলম আছে তেমনি আছে একটা ছোট্ট বিলিতি স্টোভ, চা, চিনি, গুঁড়ো দুধ, আরও কত কি কে জানে।
একটু সময় পেলেই সে একটা খাতায় কী লেখে!
অভিজিৎ বলে, ও ইতিহাস লেখে।
জুলি নিজেই সাহেবের সঙ্গে ভাব জমাতে লাগল। কোথা থেকে আসছে, কোথায় যাবে, কেন দেশ-দেশান্তরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, নিজের লোক কেউ আছে কিনা, তার সঙ্গে যথেষ্ট টাকা আছে তবু কেন এইরকম লক্ষ্মীছাড়া পোশাক, হাত-পায়ের নখগুলো অত বড়ো বড়ো রেখেছ কেন ইত্যাদি।
সাহেব কিন্তু খুব সংক্ষেপে উত্তর দিয়েছে। সে বলেছে তার দেশ স্কটল্যান্ডে। দেশভ্রমণ করাই তার উদ্দেশ্য। তার নিজের লোক বলতে তেমন কেউ নেই। দেশভ্রমণের মধ্যেও তার একটা বিশেষ উদ্দেশ্য আছে–এ দেশে খুব পুরনো, পরিত্যক্ত বাড়ির সংখ্যা আর সেগুলোর ইতিহাস সংগ্রহ করা।
জুলি জিজ্ঞেস করেছে, এত দেশ থাকতে বর্ধমান জেলার সামান্য জায়গা এই সমুদ্রগড়ে কেন?
সাহেব বলেছে, তার লক্ষ্যই হচ্ছে গ্রামের পুরনো বাড়ির খোঁজ করা। ইচ্ছে করে সে সমুদ্রগড়ে আসেনি। হাওড়া থেকে নিউ জলপাইগুড়ি এক্সপ্রেসে উঠেছিল নর্থ বেঙ্গলে যাবার জন্যে। কিন্তু সমুদ্রগড়ে এসে ইঞ্জিন খারাপ হয়ে যাওয়ায় সে সমুদ্রগড় স্টেশনে নেমে পড়ে। জায়গাটা ভালো লাগায় এখানেই দুদিন থেকে যাবে ভেবেছিল। এটাও তো বেশ পুরনো জায়গা। সাহেব যা-ই উত্তর দিক জুলির কিন্তু মনে হয়েছে বাইরে সরল হলেও সাহেব খুব চালাক, অনেক কিছু চেপে গেছে। জুলি আর ঘাঁটাতে চায়নি। মরুক গে। হয়তো দিন দুই থাকবে তার পর আবার পোঁটলা কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে পড়বে।
.
সাহেবের এই বাড়িতে থাকার দ্বিতীয় দিন রাতে সামান্য একটা ঘটনা ঘটল।
রাত তখন প্রায় এগারোটা। শহরের মানুষের কাছে রাত এগারোটা এমন কিছু নয়। টি.ভি. দেখতে দেখতেই বারোটা বাজে। কিন্তু গোয়ালপাড়ার মতো জায়গায় রাত এগারোটায় চারিদিক নিঝুম হয়ে যায়।
জুলি দিব্যি ঘুমোচ্ছিল, হঠাৎ যেন চাপা চিৎকার কানে এল। কেউ যেন হঠাৎ কিছু দেখে ভয়ে আঁৎকে উঠল, বাপরে! বলে। ঐ একবারই। তারপর সব নিস্তব্ধ। ঘুমের ঘোরে শোনা। কিছু ভাববার আগেই জুলি আবার ঘুমিয়ে পড়েছিল।
পরের দিন সকালে ঠাকুরমশাই বোঁচকা-কুঁচকি, বড়ো টিনের সুটকেসটা নিয়ে চলে যাবার জন্যে প্রস্তুত।
সুধীনবাবু অবাক হয়ে বললেন, একি ঠাকুরমশাই, চলে যাচ্ছেন নাকি?
ঠাকুরমশাই গম্ভীরভাবে শুধু একটি কথাই উচ্চারণ করলেন, হ্যাঁ।
সে কী! হঠাৎ?
তা আমি বলতে পারব না। বললে তো আমার কথা কেউ বিশ্বাস করবে না। কী দরকার মিছিমিছি অপমান হওয়া।
এতদিন এখানে থেকে ঠাকুরমশাই হঠাৎ যে এমনি ভাবে সত্যি সত্যিই চলে যাবেন কেউ ভাবতে পারেনি। আর যাবার আগে কিছুতেই বলে গেলেন না যাবার কারণটা কী।
শুধু জুলি লক্ষ্য করেছিল, এক রাত্তিরে ঠাকুরমশাইয়ের দুচোখ বসে গিয়েছে, মুখে যেন রক্তের আভাসমাত্রও নেই।
হঠাই জুলির মনে হলো কাল রাতে ঘুমের মধ্যে মনে হয়েছিল কেউ যেন ভয় পেয়ে চেঁচিয়ে উঠেছে। সত্যিই তেমন কিছু শুনেছিল কিনা সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারল না। ঠাকুরমশাই কি ভয় পেয়ে অমন চিৎকার করেছিলেন?
বেলা তখন দশটা। অন্যদিনের মতো জুলি বাড়ির কম্পাউন্ডের মধ্যে অলসভাবে ঘুরছিল। ঘুরতে ঘুরতে এসে পড়ল বাড়ির পিছন দিকে। এদিকেই এক পাশে সাহেবের ঘর। অন্য পাশে ঠাকুরমশাইয়ের। মনে পড়ল ঠাকুরমশাই আজই সকালবেলায় হঠাৎ নাটকীয়ভাবে চলে গিয়েছেন। ঠাকুরমশাইকে সে মোটেই দেখতে পারত না। কিন্তু লোকটা ঘর শূন্য করে দিয়ে চলে গেছে মনে হতেই জুলি কেমন বিমর্ষ হয়ে গেল। কী উদ্দেশ্যে বলা নেই কওয়া নেই। বাংলাদেশ থেকে এসে দিব্যি এখানে থেকে গেলেন তা যেমন জানা গেল না, তেমনি জানা গেল না হঠাৎ এমন কী ঘটল যে বলা নেই কওয়া নেই চলে গেলেন। এখানে আসার উদ্দেশ্য একটা হতে পারে–বাংলাদেশে হয়তো খাওয়া-পরার কষ্ট হচ্ছিল, তাই এপারে চলে এসে গুরুপুত্রের দোহাই দিয়ে কিছুকাল নিশ্চিন্তে থেকে যাওয়া। কিন্তু এমন করে কেন চলে গেলেন তার কোনো সদুত্তর জুলি খুঁজে পেল না।
