অভিজিৎ কদিন এখানে ছিল না। কলকাতায় গিয়েছিল। তার কানেও সাহেবের কথা। গেল। ভাবল দেখাই যাক কিরকম সাহেব। তেমন হলে সাহেবকে নিয়ে তাদের কাগজে সচিত্র ফিচার লিখবে। তাই ক্যামেরাটাও সঙ্গে নিল।
সমুদ্রগড় রেলবাজারটা গোয়ালপাড়ার কাছেই। ঘুরতে ঘুরতে সাহেবের দেখা পেল নসরৎপুরে একটা ভাঙাবাড়ির কাছে। সাহেব সেই বাড়ির ভাঙা চাতালের ওপর খবরের কাগজ পেতে আপন মনে কী লিখছ। অভিজিৎ দেখে অবাক হলো সাহেব যে কলম দিয়ে লিখছে তা ফাউন্টেন পেন বা ডট পেন নয়, সে কলম মান্ধাতার আমলের বড়ো পালকের কলম। বহুকাল আগে যখন ডট পেন তো নয়ই, এমনকি কালিভরা ফাউন্টেন, কাঠের হ্যাঁন্ডেলে সরু নিবগোঁজা কলমেরও চল হয়নি তখন লোকে লিখত শরের কিংবা পাখির পালক চেঁছে কলম তৈরি করে। এ যুগের একজন সাহেব কেন ঐরকম কলম দিয়ে লিখছে কে জানে!
সাহেব ঝুঁকে পড়ে লিখছিল। পাশেই একটা মস্ত পোঁটলা।
এখন তো কতরকমের বড়ো বড়ো ট্রিব্যাগ বিগশপার বাজারে চল হয়েছে–তার জায়গায় পোঁটলা! এই ধরনের পোঁটলা করে আগে ধোপারা বাড়ি বাড়ি থেকে কাপড় কাচতে নিয়ে যেত। ফেরিওয়ালা মেয়েদের শাড়ি, ব্লাউজ, সায়া এমনিভাবে পোঁটলা বেঁধে হাঁক দিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরত। ট্রেনে গেরস্তরা যেত বাক্স-প্যাটরার সঙ্গে পোঁটলা নিয়ে। আশ্চর্য! মান্ধাতার আমলের সেই পোঁটলা আজ সাহেবের কাছে।
অভিজিৎ-এর খুব ইন্টারেস্টিং লাগল। সে সাহেবের সামনে গিয়ে বলল, গুড মর্নিং।
সাহেব একবার চোখ তুলে তাকাল। হেসে বলল, ভেরি গুড মর্নিং। বোসো।
তারপরেই ইতস্তত করে ভাঙা ভাঙা বাংলায় বলল, কিন্তু তোমায় কোথায় বসতে দেব? এ তো ডানকানের রাজপ্রাসাদ নয়।
অভিজিৎ অবাক হয়ে বলল, ডানকান কে?
মাই গড! স্কটল্যান্ডের রাজা ডানকানের নাম মনে নেই? সেই যাকে অকৃতজ্ঞ সেনাপতি ম্যাকবেথ নিজে হাতে খুন করেছিল?
কী সব বলছে সাহেব! অভিজিৎ থতমত খেয়ে গেল। একটু সামলে নিয়ে বলল, কী লিখছ?
সাহেব হেসে বলল, হিস্ট্রি–নয়া হিস্ট্রি।
যাঃ বাবা! ইতিহাস লিখছে! এ তো আচ্ছা পাগল। তা এখানে বসে লিখছ কেন?
সাহেব নিরুপায় গলায় বলল, কী করব? কোথায় থাকব? আমায় কেউ জায়গা দেয় না।
কদিনের জন্যে এসেছ এখানে? ফর এ ফিউ ডেজ। কয়েকদিনের জন্যে। আমি টুরিস্ট। বেশিদিন কোথাও থাকা হয়।
হোটেলে থাকতে পার। টাকাপয়সা নেই?
সাহেব একটু হাসল। তারপর তার লম্বা কোটের বাঁ পকেট থেকে বের করল একটা বড়ো থলি। থলিটা মেঝের উপর উপুড় করতেই ঝনঝন করে পড়ল একগাদা কুইন ভিক্টোরিয়ার মুখওয়ালা খাঁটি রূপোর টাকা। তার মধ্যে আবার অনেকগুলো সোনার গিনি।
অভিজিৎ-এর তো চোখ ট্যারা। এত টাকা পকেটে নিয়ে ঘুরছে।
কিন্তু সাহেব, এসব তো পুরানো আমলের টাকা। এ তো এখন চলবে না।
এবার সাহেব তার ঢিলে প্যান্টের ভেতরের গোপন পকেট থেকে বের করল গোছ গোছ অশোকস্তম্ভ মার্কা নোট।
এ তো অনেক টাকা। তাহলে হোটেলে থাকছ না কেন?
সাহেব বলল, আমি বিদেশী বলে সবাই এমনকি বয়-বাবুর্চিরাও খুব বিরক্ত করে। কেবল আমার ঘরে উঁকিঝুঁকি মারে। হাসবে দাঁত বের করে।
অভিজিৎ বুঝল বিদেশী বলেই নয়, আসলে পাগলাটে বলেই ওদের এত কৌতূহল।
তুমি আসছ কোথা থেকে?
সাহেব গম্ভীরভাবে বলল, আমি তো বলেছি আমি টুরস্টি। আমার আসা-যাওয়ার ঠিক নেই। তবে একটা বিশেষ জায়গা খুঁজে বেড়াচ্ছি … বলতে বলতে সাহেব কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে গেল।
অভিজিৎ আর ঘাঁটাল না। তবে ওর বেশ পছন্দ হলো সাহেবকে। খুব ইনটারেস্টিং। একে নিয়ে কাগজে লেখা চলে। আরও ভালো হয় যদি ওকে কয়েক দিনের জন্যে তাদের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া যায়। তাদের বাড়ির দরজা সকলের জন্যেই খোলা। সাতদনি–দশদিন যে কেউ স্বচ্ছন্দে থেকে যেতে পারে।
বাড়ি নিয়ে যাবার প্রস্তাব করতেই সাহেব কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তোমাদের বাড়ি আমাকে নিয়ে যেতে চাও? হোয়াই? আমাকে নিয়ে গিয়ে তোমার লাভ?
অভিজিৎ বলল, তোমাকে আমার ভালো লেগেছে। বাবা-মায়েরও নিশ্চয় ভালো লাগবে। আর আমার একজন খুব সুইট বোন আছে। পড়াশোনা করছে। বিলেত যাবার ইচ্ছে। তোমাকে কাছে পেলে খুব খুশি হবে।
সাহেব বললে, তবে চলো।
এই বলে প্রৌঢ় সাহেব অত বড়ো পোঁটলাটা কাঁধে তুলে নিয়ে মেরুদণ্ড সোজা করে অভিজিৎ-এর সঙ্গে হাঁটতে লাগল।
.
এদিকে ঠাকুরমশাই কেবলই জুলির মাকে চাপ দিচ্ছেন, এ বাড়িতে প্রেতাত্মা আছে। একটা যজ্ঞ করে দিই।
ঠাকুরমশাই দেখেছেন বাড়ির মধ্যে একমাত্র এই মহিলাটিই তার কথা শুনতে চান। তিনিও যেন মনে করেন এ বাড়িতে কেউ থাকে। কিন্তু ছেলে-মেয়ে দুজনেই ভূত তাড়াবার নাম করলেই খেপে ওঠে। ভূতের সঙ্গে নিত্য বাস করতে ভালোবাসে।
আর-একদিন যজ্ঞের কথা বলতেই জুলি তেড়েফুঁড়ে উঠল। গুরুদেবের ছেলের মান-সম্মান না রেখেই বললে, আপনি বার বার ঐ এক কথা বলেন কেন বলুন তো? যজ্ঞট করে বাবার ঘাড় মুচড়ে দুপয়সা বাগাতে চান?
ঠাকুরমশাই তো হাঁ। এ বাড়ির মেয়ের মুখে এমন কথা শুনতে হবে কখনো কল্পনা করেননি। তোতলাতে তোতলাতে বললেন, না–না, তোমাদের ভালোর জন্যেই বলি।
জুলি ফুঁসে উঠে বলল, ভূত থাকে থাক। এ নিয়ে আপনাকে মাথা ঘামাতে হবে না, আপনি যেমন খাচ্ছেন-দাচ্ছেন, ঘুরে বেড়াচ্ছেন তেমনি বেড়ান। আপনি গুরুদেবের ছেলে বলেই কেউ আপনাকে যেতেও বলবে না। তবে সব কিছুর একটা সীমা থাকা দরকার। বলে জুলি কাঁধে একটা ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে গেল।
