সত্যিই লোকটা অদ্ভুত। পশ্চিম দিকের একটা ঘর ওঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। সেই ঘরে উনি যত রাজ্যের ঠাকুর-দেবতার ছোটো ছোটো মূর্তি সাজিয়ে রেখেছেন। দেওয়ালে দেওয়ালে দুর্গা, কালী, জগদ্ধাত্রীর ছবি। রোজ অনেক দূরে গঙ্গায় স্নান করা চাই। সকালে উঠেই সারা বাড়িতে গঙ্গাজল ছেটান। তারপর ভালোরকম ভোজনপর্ব সেরে কাছেপিঠে মন্দির-টন্দির দেখতে বেরোবেন, ফিরবেন সন্ধের পর। তারপর অনেক রাত পর্যন্ত ঘণ্টা, শাঁখ বাজিয়ে চলবে তার অতগুলো ঠাকুরের পুজো। সারাদিন ধুনোর ধোঁওয়ায় ঘর অন্ধকার। রাতে ঘুমের দফারফা। লোকটার কোনো কাণ্ডজ্ঞান নেই। যেন কদিনেই বাড়িটাকে নিজের বাড়ি বলে মনে করে নিয়েছেন। কিছু বলার উপায় নেই। হাজার হোক গুরুদেবের ছেলে! তার ওপর ঠাকুর-দেবতা নিয়ে ব্যাপার। কাজেই মুখ বুজে সব সহ্য করে যেতে হয়।
অভিজিৎ তো লোকটাকে দু চক্ষে দেখতে পারে না, গুজগুজ করে বলে, ওকে আমি তাড়াবই।
এরা ভাই-বোনে যে তাকে দেখতে পারে না, গুরুদেবের পুত্রটি তা ভালো করেই বোঝেন। একদিন জুলির মাকে কথায় কথায় বলেন, বৌমা, তোমরা আমার খুব আদর-যত্ন কর ঠিকই, কিন্তু তোমার ছেলে-মেয়েরা আমায় দেখতে পারে না। ভক্তি-শ্রদ্ধা একেবারে নেই।
সুলেখা তাড়াতাড়ি বলেন, আসলে কী জানেন ঠাকুরমশাই, এরা তো একালের ছেলে মেয়ে। এদের চালচলন, কথাবার্তা একটু অন্যরকম।
ঠাকুরমশাই বিরক্ত হয়ে বললেন, ওরা তো আমার সঙ্গে কথাই বলে না, আমার ঘরের দিকে তাকায় না পর্যন্ত। এত অবজ্ঞা! এরকম হলে আমি থাকি কি করে?
ব্যস্ত হয়ে সুলেখা বলেন, না না, ওরা ছেলেমানুষ। ওদের ব্যবহারে কিছু মনে করবেন না। ক্ষমা করবেন।
এবার ঠাকুরমশাই একটু শান্ত হলেন। বললেন, তাছাড়া বৌমা, আমি যতদিন এ বাড়িতে আছি ততদিন তোমাদের কোনো অমঙ্গল হতে দেব না। আমার এই এতগুলো দেবদেবীর পুজো নিষ্ফল নয় জেনো।
তারপরই নিচু গলায় বললেন, যদি চাও তত তোমার গুণধর ছেলে-মেয়েদের সুমতির জন্যে ছোটোখাটো একটা যজ্ঞ করে দিই। বেশি খরচ পড়বে না।
শুনে তো সুলেখা চমকে উঠলেন। ছেলে-মেয়েদের কানে গেলে রক্ষে থাকবে না। বললেন, ও সব এখন থাক্ ঠাকুরমশাই। দরকার হলে বলব।
বলাই বাহুল্য ঠাকুরমশাই মনে মনে চটে গেলেন।
এর পর একদিন ঠাকুরমশাই সন্ধের পর বাড়ির সবাইকে ডাকলেন। বললেন, খুব দরকারি কথা আছে।
জুলি তো যাবেই না। অভিজিৎ-এরও যাবার ইচ্ছে নেই। মা-বাবা বারবার বলায় জুলিকে বললে, লোকটা কী বলে শোনাই যাক না।
ধুনোর ধোঁওয়ায় ঘর অন্ধকার। ধোঁওয়াটা একটু পাতলা হয়ে গেলে সবাই ঢুকল। ঠাকুরমশাই একটা কম্বলের আসনে বসেছিলেন। সামনের মেঝেতে খড়ি দিয়ে আঁক-জোক কাটা। চার কোণে চারটে সুপুরি। মাঝখানে একটা ছোটো কাপড়ের টুকরোয় কী সব বাঁধা।
সবাই মেঝেতে বসলে ঠাকুরমশাই গম্ভীরভাবে বললেন, যে জন্যে ডেকেছি শোনো। তোমাদের এই বাড়িতে প্রেতাত্মা আছে।
মাগো! বলে জুলির মা আঁৎকে উঠলেন।
ঠাকুরমশাই বলতে লাগলেন, এ বাড়িতে এসে পর্যন্ত দেখছি বাতাস বেশ ভারী। এমনটা কেন হলো তা জানবার জন্যে খড়ি পেতে দেখলাম, হ্যাঁ, ঠিক যা ভেবেছি। প্রেতাত্মা দিব্যি ডেরা গেড়ে বসে আছে।
অভিজিৎ বলেন উঠল, তা থাক না। ক্ষতি তো করছে না।
ঠাকুরমশাই বললেন, বল কী বাবা! প্রেতাত্মা বাড়িতে পুষে রেখে দেবে! এখনও পর্যন্ত ক্ষতি করেনি বলে ভবিষ্যতে করবে না জানছ কি করে?
অভিজিৎ যতই বিদ্রূপ করে বলুক, তার মায়ের বুকটা ছ্যাৎ করে উঠল। ঠাকুরমশাই তো একেবারে ভুল বলেননি। তার চঞ্চলের কথা মনে পড়ল। যে তিনবার এসেছে সে যে এখানেই এখন বসে আছে কিনা কে জানে।
ঠাকুরমশাই তখন বলছেন, প্রেতাত্মা নিয়ে অবহেলা করা ঠিক নয়। ওদের মর্জি বোঝ ভার। আজ চুপচাপ আছে, কালই হয়তো অঘটন ঘটাতে পারে।
সুধীনবাবু বললেন, তা আপনি কী করতে চান?
ঠাকুরমশাই বললেন, ছোটোখাটো একটা প্রেত তাড়ানো যজ্ঞ। কম খরচেই করে দেব। আপনারা আমার কথা বিশ্বাস করছেন না, কিন্তু ভেবে দেখুন তো সত্যিই কি কোনোদিন ভৌতিক ঘটনা ঘটেনি?
হঠাৎ জুলি উঠে চলে গেল। অভিজিৎ হেসে বললে, পাড়ার কার কার কাছ থেকে শুনেছেন বলুন তো!
ঠাকুরমশাই বললেন, তোমাদের যদি একান্তই অবিশ্বাস হয় তাহলে এসব আলোচনা থাক। বলে নিজেই খড়ির ছক মুছে ফেললেন। জুলি পরে একসময়ে হাসতে হাসতে মাকে বলল, বাবার গুরুদেবের ছেলেটি কিন্তু ব্যবসা ভালোই বোঝেন। প্রেতাত্মা নয়, তিনি নিজেই এ বাড়িতে দিব্যি ডেরা গেড়ে বসেছেন। নড়বার নাম নেই।
অভিজিৎ বলল, বাবা নিতান্ত ভালোমানুষ আর গুরুদেবের ভক্ত তাই কিছু বলতে পারেন না। ঠাকুরমশাই সেই সুযোগটাই নিচ্ছেন।
কোনো যজ্ঞই হলো না। তবু ঠাকুরমশাই দিব্যি থেকে গেলেন। শুধু জুলির মায়ের মনটা খচখচ করতে লাগল–ঠাকুরমশাই খুব ভুল তো বলেননি। একটা যজ্ঞটজ্ঞ করলেই হতো। কিন্তু ছেলে আর মেয়ের ইচ্ছের বিরুদ্ধে কিছু বলতে পারলেন না। জুলি শুধু ভাবল, চঞ্চলদা কি এই লোকটারই কাছ থেকে সাবধান হতে ইঙ্গিত করেছিল?
.
সাহেবের আবির্ভাব
সমুদ্রগড় রেলবাজারে নাকি একজন পাগলা সাহেব এসেছে। কোথা থেকে এসে জুটেছে কে জানে। কখনো গাছের তলায় কখনো পুকুরপাড়ে বসে থাকে। কী তার উদ্দেশ্য কেউ তা জানতে পারেনি। খাঁটি সাহেব এ অঞ্চলের লোক সিনেমা টি.ভি.তে ছাড়া এর আগে চোখের সামনে দেখেনি। তাই তাদের কৌতূহলের শেষ নেই।
