তারপর জুলির কি মনে হলো, প্ল্যানচেট করতে বসেছিল। এ বিদ্যেটা শিখেছিল চঞ্চলের কাছ থেকেই।
চোখ বুজিয়ে একমনে চঞ্চলের কথা ভাবতে ভাবতেই প্ল্যানচেটের চাকাটা সাদা কাগজের ওপর নড়তে শুরু করল। পেন্সিলে বড়ো বড়ো অক্ষরে একটা লেখা ফুটে উঠল যেও না।
আশ্চর্য! জুলিদের যে এবার পুজোর ছুটিতে গ্যাংটকে যাবার ঠিক হয়েছে, চঞ্চল জানল কি করে?
যে ভাবেই জানুক এই যে প্ল্যানচেটে স্পষ্ট যেতে বারণ করা হয়েছে তাই নিয়ে বাড়ির সবাই দুর্ভাবনায় পড়ল। অভিজিৎ বলল, ও সব গাঁজাখুরি কথা ছাড়া তো। চঞ্চলের খেয়ে দেয়ে কাজ নেই, এখন ভূত হয়ে এসে কলিংবেল বাজাবে–প্ল্যানচেটে সাবধান করে দেবে।
কাজেই যেতে হলো। কিন্তু গ্যাংটক থেকে গাড়িতে ছালেক দেখতে গিয়ে কীভাবে যে খাদে পড়তে-পড়তে বেঁচে গিয়েছিল তা আজও ভাবলে ভয়ে বুক কেঁপে ওঠে।
এর কিছুকাল পরে আবার একদিন রাতে তিনবার কলিংবেল বেজেছিল। অথচ দরজা খুলে কাউকে দেখা যায়নি। আবার ছবির কাচে চিড়। আবার প্ল্যানচেট নিয়ে বসা। আবার নিষেধভুল করছ … বিপদ…।
সেবার জুলি কয়েকজন বান্ধবীর সঙ্গে একটা চাকরির জন্যে চণ্ডীগড়ে ইন্টারভিউ দিতে যাচ্ছিল। বাড়িতে সবাই বাধা দিয়েছিল। চাকরি হলে তো সুদূর চণ্ডীগড়ে থাকতে হবে। একজন অল্পবয়সী মেয়ের পক্ষে মা-বাবাকে ছেড়ে বিদেশে একলা থাকা সম্ভব? কিন্তু জুলি অন্য প্রকৃতির মেয়ে। বড্ড বেশি সাহসী আর জেদী। সে বলল, গিয়েই দেখি না। তেমন বুঝলে চাকরি ছেড়ে দিয়ে চলে আসব।
কেবল দাদাই বলল, যদি এখনই চাকরি করতে চাস তাহলে না হয় ঘুরেই আয়। পশ্চিমবাংলায় পড়ে থাকলে কোনোদিন চাকরি হবে না। তাছাড়া অ্যাডভেঞ্চার হবে। একলা একলা স্বাধীন জীবন–দারুণ!
যাওয়া যখন স্থির তখন হঠাৎ জুলির কিরকম মাথা ঘুরতে লাগল। উঠতে গেলেই মাথা ঘুরে পড়ে যায়। শুয়ে শুয়েও মনে হয় ছাদটা যেন দুলছে। কিছুক্ষণের জন্য অনেকেরই মাথা ঘোরে। কিন্তু এরকম সারাদিন
ডাক্তার ওষুধ দিয়ে গেলেন। বলে গেলেন, বাড়ির বাইরে যাওয়া এখন দু-তিন দিন বন্ধ। অথচ আজ পর্যন্ত জুলির কোনোদিন মাথা ঘোরেনি। এ যেন যাওয়াটা পণ্ড করার জন্যই হঠাৎ এই রোগ।
যাওয়া হয়নি, মঙ্গল। যে কম্পার্টমেন্টে জুলিদের রিজার্ভেশন ছিল সেই কম্পার্টমেন্টেই বড়ো রকমের ডাকাতি হয়ে গেল। জুলির বন্ধুরা কাঁদতে কাঁদতে কোনোরকমে বাড়ি ফিরে এসেছিল।
দু-দুবার এরকম হওয়ায় এই অলৌকিক ব্যাপারে জুলির কেমন বিশ্বাস জন্মে গেছে। তার মনে হয় চঞ্চল সত্যি তাদের ভালোবাসে বলেই মৃত্যুর পরও ভুলতে পারেনি। বিপদের ঝুঁকি থাকলে সাবধান করে দেয়।
এইবার তৃতীয় বার।
এবারও ছবির কাছে চিড় ধরা। চিড় ধরা কেন? এটা কি সবাইকে জানানো যে, সে সত্যি এসেছিল?
সারারাত ঘুম হলো না জুলির। ভোরবেলা একটু ঘুম এসেছিল, মায়ের ডাকে ঘুম ভেঙে গেল। অনেক বেলা হয়ে গেছে। ওঠ। চায়ের জল চড়িয়েছি।
জুলি হাতমুখ ধুয়ে চা খেল। কিন্তু সারা রাত যে ঘুমোয়নি সে কথা প্রকাশ করল না। কাল রাতেও যে চঞ্চল এসেছিল তাতে আর সন্দেহ নেই। কিন্তু কেন? আবার কোন বিপদের জন্যে সাবধান করতে চাইছে? আশ্চর্য! এ নিয়ে কেউ তেমন মাথা ঘামাচ্ছে না।
জুলি তাড়াতাড়ি স্নান সেরে দরজা বন্ধ করে প্ল্যানচেট নিয়ে বসল।
আবার লেখা ফুটে উঠল–ওর কাছ থেকে সাবধান।..ব্যস্ত এইটুকু। ওটা কে? কিছুই বোঝা গেল না। এ বাড়িতে তো কতজনই আসে। এই তো সেদিন কলকাতা থেকে তার দু বন্ধু এল। নবদ্বীপ, শান্তিপুর, কৃষ্ণনগর, কালনা ঘুরে বেড়াল। একটা নতুন ঝি রাখা হয়েছে। সে তো দুবেলা আসে। খুব গল্প করে মায়ের সঙ্গে। এত গল্প কিসের? ওর কাছ থেকেই কী সাবধান হতে বলছে?
জুলি আবার কয়েকদিনের জন্যে কলকাতায় গিয়েছিল। ফিরে এসে দেখে একজন অপরিচিত লোক বাইরের ঘরে সোফার ওপর দিব্যি পা তুলে বসে আছে। খালি-গা, গলায় ধবধবে পৈতে, পরনে মোটা সুতোর ধুতি, কাঁধে গামছা। কুচকুচে কালো রঙ। নাকটা বসা।
এমন একজন লোককে তাদের বাড়িতে দিব্যি বসে থাকতে দেখে জুলি তো অবাক।
লোকটা উঁচু উঁচু দাঁত বের করে হেসে বলল, কি খুকি, কলকাতা থেকে এলে? বড়ো হয়েছ, কোথায় শাড়ি পরবে, তা নয় ওসব কী পরেছ? তা ছাড়া একা একা কলকাতায় যাওয়া-আসা করা ঠিক নয়। তোমার বাবা-মা বারণ করতে পারে না? যাও ভেতরে যাও।
লোকটার কথা শুনে জুলির সর্বাঙ্গ রাগে জ্বলে উঠল। কোনো কথা না বলে গটগট করে ভেতরে চলে গেল।
মাকে বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল, লোকটা কে?
মা জিব কেটে বললেন, ছিঃ, ওভাবে বলে না। উনি বাংলাদেশ থেকে এসেছেন। তোমার বাবার গুরুদেবের ছেলে।
তা এখানে কেন?
কাছাকাছি তীর্থস্থানগুলো ঘুরবেন।
যেখানে যত খুশি ঘুরুন, কিন্তু আমাদের বাড়ি কেন?
মা শান্ত গলায় বললেন, নবদ্বীপ, শান্তিপুর তো এখান থেকে কাছে। তা ছাড়া তোমার বাবার গুরুদেব ছিলেন ওঁর বাবা। এখানে ছাড়া আর কোথায় উঠবেন?
তা বলে ঐরকম একটা লোক আমাদের বাড়িতে?
উপায় কি?
কদিন থাকবে?
মা বললেন, তা কিছু বলেননি। তবে জিনিসপত্রের বহর দেখে মনে হচ্ছে কিছুদিন থাকবেন।
জুলি হাতের ব্যাগটা বিছানায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বলল, আমি তাহলে কালই কলকাতায় চলে যাব।
কিন্তু জুলি কলকাতায় গেল না। ভেবে দেখল, বাড়িতে এইরকম একটা উটকো লোককে রেখে চলে যাওয়া উচিত হবে না।
