জুলি বলল, একটা পুরনো বড়ো বাড়ি ছাড়া এর মধ্যে আর কী আছে তা তো বুঝতে পারছি না। হ্যাঁ, বাড়িটা অবশ্য একটু অন্য ধরনের। ছাদটা কচ্ছপের পিঠের মতো ঢালু হয়ে গেছে। এই পর্যন্ত। এর বেশি বোঝবার দরকারও নেই। আর্টিস্টের খেয়াল।
চঞ্চল বলল, দেখলে মনে হয় বহু পুরনো এই বাড়িতে কেউ থাকে না।
জুলি বলল, এই পুরনো বাড়িতে কে থাকবে? বন্ধ জানলাগুলো দেখলেই তা মনে হয়।
চঞ্চল হাসল একটু। বলল, সব জানলাই বন্ধ নয়। ভালো করে লক্ষ্য করে দেখো বাঁদিকে একটা জানলা খোলা। দেখেছো।
হ্যাঁ।
হঠাৎ একটা জানলা খোলা কেন?
জুলি বলল, ঝড় বাতাসে খুলে যেতেই পারে।
ঝড় বাতাসে দুপাটই এমন সমানভাবে ভোলা থাকে? ভালো করে দেখো।
জুলি বলল, তা বটে। কেউ যেন ইচ্ছে করে একটা জানলা খুলে রেখেছে।
এই কথাটাই তোমাকে এতক্ষণ বোঝাতে চাইছিলাম। ছবিটা যে এঁকেছিল কী অসাধারণ তার হাতের কাজ। শুধু তাই নয় জুলি, আমার দৃঢ় বিশ্বাস আর্টিস্ট নিজে কোনো দিন বাড়িটা দেখেছিল। একটু থেমে বলল, তাছাড়া দেখো, বাড়ির সামনে আবার সার সার সুপুরি গাছ– যেন বাড়িটাকে আড়াল করে রেখেছে। সব কিছু মিলিয়ে বাড়িটা কেমন রহস্যময়, তাই নয় কি?
তাই তো মনে হচ্ছে।
সবচেয়ে রহস্যজনক মনে হচ্ছে এ বাড়িতে কেউ একজন থাকে। আর সে থাকে দোতলার একটা ঘরে। কিন্তু সে কে? কেন ঐরকম বাড়িতে একা থাকে?
এই বলে চঞ্চল ছবিটার উপর ঝুঁকে পড়ে নিবিষ্ট মনে আরও কী যেন দেখতে লাগল।
কী দেখছ অমন করে? জুলি জিজ্ঞেস করল।
দেখছি বাড়িটা কোথায় হতে পারে?
জুলি বলল, বাড়িটার গঠন দেখে মনে হচ্ছে সে আমলের সাহেবদের বাড়ি।
তা ঠিক। কিন্তু জায়গাটা কোথায়? পেছনে দেখো আবছা পাহাড় দেখা যাচ্ছে। আর্টিস্ট জঙ্গলের মধ্যে পাইন গাছ দেখাতেও ভোলেননি। আমার মনে হয় দার্জিলিঙের কাছাকাছি কোনো জায়গায়।
কিন্তু দার্জিলিঙের কাছে হলে তো আরও পাহাড় দেখা যেত।
ঠিকই বলেছ। তবে নর্থ বেঙ্গলের কোনো জায়গা হতে পারে। ঐ বাড়িটা দেখতে আমাকে যেতেই হবে।
না-না, নর্থ বেঙ্গল নয়। ছবির কোণে ছেঁড়া জায়গাটা ভালো করে লক্ষ্য করো। কি দেখছ?
জুলি ঝুঁকে পড়ে দেখতে লাগল।
হা হা, এই যে As….. N…..ar….।
চঞ্চল বলল, তাহলে বলো কোন জায়গার প্রথম কথাটা As দিয়ে।
জুলি বলল, প্রথমেই তো আসাম নামটা মনে হয়।
ঠিক বলেছ। তার পর N–আচ্ছা ওটা থাক। শেষেরটা ধরো ar। কী হতে পারে?
জুলি তখনই আসামের ম্যাপটা খুলে দেখতে লাগল।
নাঃ একটাই জায়গা পাচ্ছি কাছাড়।
চঞ্চল উৎসাহে লাফিয়ে উঠে বলল, ব্যস, ঠিকানা মিল গয়া। কাছাড় নর্থ কাছাড়।
জুলি হেসে বলল, তুমি সত্যিই পাগল। বাড়িটা আছে কিনা তার ঠিক নেই, হয়তো আর্টিস্টের সবটাই কল্পনা আর তুমি তাই খুঁজতে বেরোবে!
চঞ্চল হাসল না। গম্ভীরভাবে বলল, আমি বুঝতে পারছি ও বাড়ি আর্টিস্টের কল্পনা নয়। সত্যি সত্যিই আছে। আর আমি তা খুঁজে বের করবই।…
তারপর একদিন চঞ্চল ছবিটা বাঁধিয়ে নিয়ে এল। জুলির হাতে দিয়ে বলল, এটা তোমায় দিলাম।
জুলি অবাক হয়ে বলল, আমাকে কেন?
চঞ্চল গম্ভীরভাবে বলল, এই ছবিটা নিয়ে সব আলোচনা শুধু তোমার সঙ্গেই হয়েছে। এর মর্ম আর কেউ বুঝবে না।
অগত্যা জুলিকে ছবিটা টাঙিয়ে রাখতে হলো। আর কিছু না হোক পুরনো বাড়ি হিসেবে একটা আকর্ষণ আছে। তাছাড়া এতই সুন্দর ছাপা যে বাড়িটা পুরনো হলেও চকচক করছে।
এ ঘটনা কালনার সেই ভুতুড়ে বাড়ি দেখতে যাবার আগে। কালনার সেই বাড়িতে এক রাত্তির কাটিয়ে আসার পর থেকে চঞ্চলদা কেমন যেন হয়ে গেল। উদ্ভ্রান্ত, অন্যমনস্ক। তাদের বাড়িও কম আসত। যে জুলি তার বোনের মতো, বন্ধুর মতো, তার সঙ্গেও কম কথা বলত।
সে একরকম ভালোই হয়েছিল। দিনরাত শুধু ভূত-ভূত-ভূত আর প্লানচেট করা, এসব তার মায়ের মতো জুলিরও ভালো লাগত না।
আগে জুলি কলকাতায় মামার বাড়ি চলে গেলে চঞ্চল রোজ খবর নিয়ে যেত কবে গোয়ালপাড়া আসবে, কিন্তু এবার যখন গেল, চঞ্চল একবারও খোঁজ নেয়নি। ভালোই।
মাস তিনেক পর জুলি গোয়ালপাড়ায় ফিরে এসে শুনল চঞ্চল কোথায় চলে গেছে নিরুদ্দেশ। ওর পিসেমশাই একদিন নাকি এ বাড়িতে খোঁজ করতে এসেছিলেন জুলির মা বাবাকে কিছু বলে গেছে কি না।
সেই যে চঞ্চল নিরুদ্দেশ হয়ে গেল আর ফেরেনি আজ পর্যন্ত। কি হলো ছেলেটার? অন্তত জুলি খুব ভাবত ওর কথা। তারপর ধীরে ধীরে চঞ্চল সবার মন থেকে দূরে সরে গেল।
হঠাৎ একদিন রাত দুপুরে কলিংবেলটা বেজে উঠল। পরপর তিনবার। সেদিনও চমকে উঠেছিল সবাই। চঞ্চল ফিরে এসেছে তাহলে।
তারপর যখন দরজা খুলে কাউকে দেখতে পেল না তখনই এ বাড়ির সকলের বুকটা হাহাকার করে উঠল। বুঝল, চঞ্চল আর এ জগতে নেই। কোথায় কোন অজানা জায়গায়, নিঃস্ব অবস্থায় ঘুরতে ঘুরতে বেঘোরে প্রাণটা হারিয়েছে।
চঞ্চল এদের এতই ভালোবাসত যে নিজের একটা ছবি বাঁধিয়ে রেখে গিয়েছিল। বলেছিল, যেদিন আমি থাকব না, তখনও যদি আমার কথা মনে পড়ে তোমরা আমার এই ছবিটা দেখো। আমি তোমাদের কাছেই থাকব।
সেদিন সকালবেলায় জুলি বিমর্ষ মনে যখন চঞ্চলের কথা ভাবছিল, হঠাৎ লক্ষ্য পড়ল চঞ্চলের ছবিটার দিকে। কাচটা কিরকম চিড়ে গেছে। ও খুব আশ্চর্য হয়েছিল আলমারির ভেতরে রাখা ছবির কাচ ভাঙল কি করে?
