তোলো কফিন! কুইক!
কফিন তোলা হল।
ভাঙো। যিশুর পবিত্র ক্রস হাতে নিয়ে গম্ভীর গলায় আদেশে করলেন পাদ্রীবাবা।
পুরোনো জীর্ণ উইধরা কফিনের ডানা গাঁইতির এক চাপে ভেঙে গেল। সঙ্গে সঙ্গে ঝুঁকে পড়ল সবাই।
একটা গোটা কংকাল শুয়ে আছে কফিনের মধ্যে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। কোথাও এতটুকু ধুলোমাটি নেই। মনে হল কেউ যেন কংকালটা ধুয়ে মুছে রেখে গিয়েছে।
চোয়ারম্যানবাবু খুব উঁচু থেকে নাকে রুমাল চেপে কফিনের দিকে তাকিয়ে ওরে বাবা! ও যে আস্ত কংকাল! বলে দশ পা পিছিয়ে গেলেন।
কফিনটা ওপরে তোলা হয়েছে। হঠাৎ পাদ্রীবাবু ঝুঁকে পড়লেন কংকালের ওপরে।
কংকালের পাঁজরের মধ্যে ওটা কী পাদ্রীবাবা?
সবাই দেখল সমুদ্রের বড়ো কঁকড়ার মতো কালো একটা কী পাঁজরের মধ্যে যেন বাসা বেঁধেছে।
পাদ্রীবাবা বললেন, বলা যায়, এটাই ভ্যাম্পায়ারের হার্ট। দাঁড়ান ওটা খুঁচিয়ে ভেঙে দিই।
বলে যে মুহূর্তে পাদ্রীবাবা একটু অন্যমনস্ক হয়েছেন তখনি কংকালটা লাফিয়ে উঠে দুহাত বাড়িয়ে তার গলা টিপতে গেল। বিচক্ষণ পাদ্রীবাবা যেন বুঝতে পেরেছিলেন এরকম কিছু ঘটতে পারে। তিনি তার ব্যাগ থেকে একটা হাতুড়ি বের করে অব্যর্থ লক্ষ্যে ঘা মারলেন কংকালের খুলিতে। খুলি ফেটে চৌচির হয়ে গেল। কংকালটা লুটিয়ে পড়ল কফিনে। আরশোলার মতো অনেকগুলো পোকা খুলি থেকে বেরিয়ে কফিনের মধ্যে ছোটাছুটি করতে লাগল।
যাক শান্তি! দুহাত তুলে বলে উঠলেন পাদ্রীবাবা।
তারপর চেয়ারম্যানের দিকে ফিরে বললেন, চেয়ারম্যানবাবু, আমার কাজ শেষ। এবার আপনার কাজ করুন।
চেয়ারম্যান সে কথার উত্তর না দিয়ে বললেন, কী সর্বনাশ! আর একটু হলেই তো আপনি মরেছিলেন। চোখের সামনে দেখলাম অত বড়ো গোটা কংকালটা লাফিয়ে উঠে আপনাকে মারতে গেল!
যাক মারতে তো পারেনি। এখন কফিনসুদ্ধ কংকালটা নিয়ে গিয়ে পোড়াবার ব্যবস্থা করুন।
তা করছি। কিন্তু আপনি?
আপনারা যান। আমি সামান্য একটু কাজ সেরে যাচ্ছি।
বলে তিনি আমাকে নিয়ে শূন্য কবরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। তারপর ব্যাগ থেকে কিছু অজানা গাছের শুকনো লাল পাতা আর কিছু শুকনো লতাপাতা বের করে কবরের মধ্যে ছড়িয়ে দিলেন।
তারপর নকুলকে নিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে রিকশায় উঠলাম। তখন ঝড় থেমে গেছে। প্রকৃতি শান্ত।
[শারদীয়া ১৪১৪]
অলৌকিক ক্যালেন্ডার
লোকটিকে প্রথম থেকেই আমার বেশ মজার লেগেছিল। কুচকুচে কালো রঙ। একমাথা রুক্ষু চুল। লম্বা নাক। চোখ দুটো জ্বলজ্বলে। পাতলার ওপর গড়ন। দেখলে মনে হয় গম্ভীর প্রকৃতির। কিন্তু আলাপ হয়ে গেলে বেশ সহজ মানুষ বলেই মনে হয়।
এই মানুষটির সঙ্গে কিন্তু যে অবস্থায় আলাপ হয়েছিল তা বেশ সুখকর ছিল না।
সেবার পুজোর ছুটিতে দাক্ষিণাত্য ভ্রমণে গিয়েছিলাম। রামেশ্বরম, মহীশূর, কন্যাকুমারিকা দেখে শেষে তিরুপতি দর্শনে এসেছিলাম। বেশ উঁচু উঁচু পাহাড়। পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি হয়েছে। সেই আঁকাবাঁকা পথে বাসে করে পাহাড়ে উঠতে হয়। পাহাড়ের ওপর উঠেই অবাক! রীতিমতো শহর। যাই হোক এখান থেকে কিছুদূর হাঁটলে বা রিকশায় গেলে তিরুপতির মন্দির।
বেজায় ভিড়। দর্শনপ্রার্থীদের লম্বা লাইন। পুজো দিতে দিতে বিকেল হয়ে গেল। তারপর জায়গাটা ভালো করে দেখতে লাগলাম। পশ্চিম বাংলা থেকে এত দূর আসা তো আর বার বার হয় না। হয়তো এই প্রথম–এই শেষ।
দেখতে দেখতে সন্ধ্যে হয়ে গেল। তাড়াতাড়ি নামার জন্যে বাসস্ট্যান্ডে এলাম। কিন্তু হায়! লাস্ট বাস পাহাড় থেকে নেমে গিয়েছে। আজ আর নিচে নামার উপায় নেই।
মহা দুশ্চিন্তায় পড়লাম। কী করব এখন? এদিকে আলো জ্বলে উঠেছে। কিন্তু ওদিকে–অর্থাৎ পাহাড়ের দিকে জমাট অন্ধকার। ঐ অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে আঁকাবাঁকা পথ নেমে গিয়েছে। দুপাশে পাহাড়ী জঙ্গল। দেখলেও ভয় করে।
তাহলে? বললাম বটে জায়গাটা শহরের মতো, কিন্তু গেরস্তবাড়ি বিশেষ নেই। দোকানপাট, ব্যাঙ্ক, পোস্টাপিস এই সবই বেশি।
গেরস্ত লোক যদি বা থাকে তাহলেও কি এই অজানা অচেনা একজন বাঙালিকে কেউ আশ্রয় দেবে?
কী করব ভাবছি। এই সময়ে ঐ মানুষটির আবির্ভাব। ও যেন দেখেই আমার অবস্থা বুঝতে পেরেছে। হেসে ভাঙা ভাঙা বাংলায় বলল, বাস ফেল করেছেন?
এই রকম একটা জায়গায় ঐ রকম চেহারার মানুষের কাছে বাংলা কথা শুনব আশা করিনি। বিনীতভাবে বললাম, হ্যাঁ। লাস্ট বাস কখন জানতাম না।
–তা হলে এখন কি করবেন ভাবছেন?
–কিছুই তো ভেবে পাচ্ছি না।
লোকটি হাসল।–তবে চলে আসুন এই গরিবের কুটিরে।
তাই যেতে হলো।
কুটিরই বটে! চারিদিকে পাহাড় আর জঙ্গল। তারই মধ্যে পাথর দিয়ে ঘেরা ঘরের মতো। মাথা গোঁজার আস্তানা। ভেতরে পিলসুজের ওপর মস্ত এক পেতলের প্রদীপ জ্বলছে। তারই ঘোলাটে আলোয় গুহাটা দেখলাম। একপাশে একটা খাঁটিয়া। একটা কম্বল আর তেলচিটে বালিশ। একটা দড়ি টাঙানো। তাতে গোটা দুয়েক ময়লা প্যান্ট–একটা ছেঁড়া তোয়ালে।
গুহার ওদিকে একটা কালো পর্দা টাঙানো–যেন থিয়েটারের স্টেজের স্ক্রিন।
লোকটি বলল, তিরুপতি তো দর্শন করলেন। আমার ঠাকুর দেখবেন না?
বলে পর্দাটা সরিয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে যা দেখলাম তাতে আমার গা শিউরে উঠল। ফুল-পাতা ভরা একটা পুরনো কাঠের গামলার মধ্যে একটা মড়ার খুলি বসানো। খুলিটা সিঁদুরে সিঁদুরে লাল হয়ে গেছে।
