সে একা থাকবে শুনে তারা বারণ করল। কিন্তু চঞ্চল শুনল না। ওদের কাছ থেকে চাবি নিয়ে সন্ধে থেকেই রয়ে গেল সেই ঘরে।
পরের দিন চঞ্চল ফিরে এল গোয়ালপাড়ায়। এসেই পিসেমশাইয়ের বাড়ি না গিয়ে সোজা চলে এল জুলিদের বাড়ি। তাকে নিরাপদে ফিরতে দেখে সবাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। কিন্তু এ কী চেহারা হয়েছে তার! দুচোখ লাল, চুল উস্কোখুস্কো, মুখে কথা নেই। সবাই তার অভিজ্ঞতার কথা জানতে চাইল। কিন্তু আশ্চর্য যে ছেলে এত গল্প করে সে একটি কথাও বলল না। বার বার জিজ্ঞেস করার পর সে শুধু একটা কথাই বলল, ও কিছু না।
সবাই বুঝল ও যেন অনেক কিছু চেপে যাচ্ছে।
এরপর চঞ্চলের মধ্যে কেমন একরকম পরিবর্তন দেখা দিল। উদাস হয়ে পুকুরপাড়ে না হয় খাঁ খাঁ মাঠে একা বসে থাকে। ক্রমে সবাই ওকে এড়িয়ে চলতে লাগল কী জানি বাবা!
একমাত্র ও জুলিদের বাড়ি যায়। জুলিরা ওকে আদর করে বসতে দেয়। আগের মতোই গল্প করে। কিন্তু চঞ্চলের গল্প বলা হঠাৎই যেন বন্ধ হয়ে গেছে।
চঞ্চলের আর একটা খেয়াল জাগল এ বাড়ির সবাইকে নিয়ে প্ল্যানচেট করা। এই প্ল্যানচেট নিয়ে ওদের বাড়ির কৌতূহলের সীমা ছিল না। শুধু জুলির মা বলতেন, কী দরকার বাপু ওসব আত্মাতাত্মাকে ডেকে! ওরা যেখানে শান্তিতে আছে সেখানেই থাকুক।
তারপর এই যে কলিংবেল–যা নিয়ে আজ গভীর রাতে এত দুর্ভাবনা সেটার ব্যবস্থা তো ঐ চঞ্চলদাই করেছিল।
ঘুম আসছিল না জুলির। চোখ বুজিয়ে কেবলই সেইসব কথা মনে পড়ছিল।
তখন সবে গোয়ালপাড়ায় ইলেকট্রিক এসেছে। চঞ্চল হাঁকডাক করে বাড়ি ঢুকল।
কী ব্যাপার? জুলির মা জিজ্ঞেস করলেন।
আর চেঁচামেচি, কড়া নাড়া, শেকল নাড়ার দরকার নেই মাসিমা। বোতামটা বাইরে থেকে টিপবে আর ভেতরের লোক জানলা দিয়ে উঁকি মেরে জিজ্ঞেস করবে–কে?
জুলির মা হাসলেন। বললেন, এত পাগলামিও তোমার মাথায় আসে!
পাগলামি কেন বলছেন মাসিমা? জানলা থাকলে যেমন পর্দার দরকার, দরজা থাকলেই কলিংবেলের দরকার।
জুলির মা বললেন, কোনো দরকার ছিল না।
হ্যাঁ, ছিল। আমি লাগিয়ে দিচ্ছি। কেউ না বাজাক, আমিই বাজাব।
এরপর চঞ্চল যখন-তখন আসে আর কলিংবেল টেপে। ছেলেমানুষের মতো তার কী আনন্দ!
কয়েক মাস পরে এ বাড়িতে যারাই আসে তারাই বেল বাজিয়ে ঢুকতে লাগল। এটা আবার চঞ্চলের বিশেষ পছন্দ হলো না। সবার মতো সে বেল বাজাবে না। জানিয়ে দিল সে যখন বেল টিপবে একসঙ্গে তিনবার।
এই এমনি করে, বলে তিনবার বেল টিপল। ব্যস আপনাদের আর জিজ্ঞেস করতে হবে না। বুঝে নেবেন আমি এসেছি।
এরপর থেকে চঞ্চল যখনই আসে ঐভাবে বেল বাজায়। সবাই বুঝতে পারে আর কেউ নয় চঞ্চল এসেছে।
রাত এখন প্রায় তিনটে বাজে। গাঢ় অন্ধকারের মধ্যে বাঁশবাগানটা স্তব্ধ বিভীষিকার মতো থমথম করছে। দূরের মাঠ আর আকাশ যেন অন্ধকারে এক হয়ে গেছে। বাড়ির সকলে দিব্যি ঘুমিয়ে পড়েছে। এই যে হঠাৎ আজ রাত-দুপুরে কলিংবেলটা তিনবার বেজে উঠল, কে বাজাল তা নিয়ে কেউ মাথা ঘামাচ্ছে না। কিন্তু জুলি অত সহজে ব্যাপারটা ঝেড়ে ফেলতে পারছে না। সে জানে এটা একটা অশুভ সংকেত। কিছু একটা ঘটবেই। তাই তার চোখে ঘুম নেই। কেবলই চঞ্চলের কথা মনে পড়ছে।
জুলির মনে পড়ে সেদিনের কথা। চঞ্চল পুরনো ইংরিজি পত্রিকার একটা ছেঁড়া পাতা কোথা থেকে নিয়ে এল।
জুলি–জুলি দেখে যাও।
না জানি কী মহামূল্যবান জিনিস মনে করে জুলি চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতেই এসে দাঁড়াল।
একটা ছবি।
অদ্ভুত ছবিটা। গভীর জঙ্গলের মধ্যে একটা বিশাল দোতলা বাড়ি। জানলাগুলো বন্ধ। বাড়িটা পুরনো। চারিদিকে পাঁচিল ঘেরা। ভেতরে নানারকম বড়ো বড়ো পাথরের মূর্তি। কিন্তু বাড়িটার সামনের দিকে দোতলার জানলার ঠিক নিচে বোধহয় পাথরেরই একটা ভয়ংকর মুখ। সে মুখ মানুষের তো নয়ই, গল্পে-পড়া রাক্ষস-দৈত্য-দানবেরও নয়। ছবিতেও মনে হয় সেটা কোনো অলৌকিক জীবের মুখ।
চঞ্চলের দারুণ উৎসাহ। ছবিটা দেখতে দেখতে তার মুখচোখ কেমন হয়ে যাচ্ছিল।
জুলি জিজ্ঞেস করল, এই বাড়িটা কার? মুখটাই বা অমন কেন?
চঞ্চল হতাশ হয়ে বলল, এর ইতিহাস সবই লেখা ছিল। কিন্তু ছিঁড়ে গেছে। ইস কিছুই জানা গেল না।
পত্রিকাটা তুমি পেলে কোথায়?
চঞ্চল বলল, কলকাতায় গিয়েছিলাম। রিপন স্ট্রিটে একটা কাগজের দোকানে পুরনো পত্রিকা বিক্রি হচ্ছিল। হঠাৎ চোখে পড়ল। ওটা চাইলাম, তা দিল না। বলল, এক টাকা লাগবে। কী আর করি! এক টাকা দিয়ে ছবিটা কিনে ফেললাম।
তুমি কী চঞ্চলদা!
চঞ্চল অবাক হয়ে বলল, কেন?
নেহাৎই একটা পুরনো ছবি। ইংরিজি ম্যাগাজিনে অমন কত ছবি বেরোয়। তা নিয়ে এত মাতা ঘামাবার কি আছে?
চঞ্চল একটু হাসল। বলল, এ ছবিটা সাধারণ ছবি নয় জুলি। এই যে বাড়িটা–দেখলেই বোঝা যায় এর মধ্যে কোনো অজানা রহস্য লুকিয়ে আছে। নয় কি?
জুলি বলল, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। আর্টিস্টরা তাদের খেয়ালমতো ছবি আঁকে। তা নিয়ে আমাদের মাথা ঘামাবার কি আছে?
চঞ্চল বলল, আছে। মনে রাখতে হবে এই ধরণের ছবি একজন আর্টিস্ট শুধু শুধু কল্পনা করে আঁকে না। হয় কোনো এক সময়ে বাড়িটা দেখেছিল কিংবা কারও কাছ থেকে বাড়িটার কথা শুনেছিল। ব্যাপারটা তার মনে এমনই গেঁথে গিয়েছিল যে, সে একজন আর্টিস্ট বলেই ছবিটা না এঁকে পারেনি। আর বাড়িটা ও তার কাহিনি একজন ইংরেজ সম্পাদকের এতই ভালো লেগেছিল যে তিনি সেই কাহিনি ছবিসুদ্ধ না চেপে পারেননি। আমার দুর্ভাগ্য, ছবিটুকুই পেলাম, কাহিনিটা পেলাম না। সেটা ছিঁড়ে গেছে।
