অভিজিৎ মায়ের কথা শুনল না। লাইট জ্বেলে শুধু টর্চ হাতে দরজার দিকে এগোল। পিছনে সবাই। দরজাটা খুলতেই একটা হাওয়া ঢুকে দরজার পর্দাটাকে দুলিয়ে দিলো।
নাঃ কেউ নেই।
অভিজিৎ টর্চ জ্বেলে বাঁশপাতা মাড়াতে মাড়াতে বাগানটা দেখতে যাচ্ছিল, জুলি বলল, ফিরে আয় দাদা, কাউকে পাবি না।
তবু সে বাঁশবাগানের মধ্যে ঢুকে টর্চের আলো ফেলে দেখল, নারকেল গাছগুলোর মাথাতেও টর্চ ফেলল। শেষে হতাশ হয়ে ফিরে এল।
বাড়িতে ঢুকে ভালো করে খিল বন্ধ করে সবাই বসল সুধীনবাবুর ঘরে। সবার মুখে একটাই কথা, এত রাতে কে বাজাল বেলটা?
অভিজিৎ আলিস্যি ভেঙে বলল, কোনো চোর-ছচোরের কাজ। একবার ধরতে পারলে
জুলি গম্ভীর হয়ে বসেছিল। এবার বলল, চোরই হোক বা যে-ই হোক পালাতে গেলে তো শুকনো পাতা মাড়াবার শব্দ হবে। কোনো শব্দ পেয়েছ কি?
কেউ এর উত্তর দিতে পারল না।
জুলিই ফের বলল, আমি জানি কে বেল বাজিয়েছে।
কে? বাবা-মা দুজনেই ব্যস্তভাবে জিজ্ঞেস করলেন।
বেলটা কবার বেজেছিল মনে আছে?
সুধীনবাবু বললেন, বোধহয় দুবার।
না তিনবার।
জুলির মাও বললেন, হ্যাঁ তিনবার।
জুলি বলল, পর পর তিনবার কে বাজাতে পারে?
সবাই চুপ।
জুলি বলল, এরই মধ্যে ভুলে গেলে?
অস্ফুট স্বরে জুলির মা বললেন, চঞ্চল।
জুলি বলল, তোমরা আরও ভুলে গেছ গত তিন বছরের মধ্যে গভীর রাতে আরও দুবার এমনিভাবেই বেল বেজেছিল। আর আমার যদি ভুল না হয়–
বলতে বলতে জুলি পাশের ঘরে চলে গেল। তারপরই চাপা উত্তেজনা-ভরা গলায় ডাকল, মা, দেখে যাও।
সুধীনবাবু আর জুলির মা ছুটে পাশের ঘরে ঢুকলেন।
দ্যাখো।
দুজনেই অবাক হয়ে দেখলেন, আলমারির মধ্যে চঞ্চলের যে বাঁধানো ছবিটা ছিল তার কাচটায় চিড় ধরেছে।
ও মা! আঁৎকে উঠলেন জুলির মা। বললেন, এর আগেও তো দুবার ছবির কাচ এইভাবেই ফেটে গিয়েছিল।
জুলি বলল, আর সেই দুবারই আমরা কিভাবে বিপদের মুখ থেকে বেঁচে গিয়েছিলাম মনে আছে তো? ঘটনার আগে এমনিভাবেই বেল বাজিয়ে চঞ্চল দুবারই সাবধান করে দিয়েছিল।
একটু থেমে জুলি বলল, আজ আবার তিনবার বেল বাজল। জানি না নতুন কোন বিপদ থেকে সাবধান করার জন্যে চঞ্চল এসেছিল।
জুলির কথায় সকলের মুখ ভয়ে শুকিয়ে গেল।
.
চঞ্চল, ঠাকুরমশাই কথা
জায়গাটার নাম গোয়ালপাড়া। কালনা থেকে নবদ্বীপ, কৃষ্ণনগর কিংবা পূর্বস্থলী, চুপি যাবার বাসরুটে ছোট্ট একটা স্টপেজ এগোলেই সমুদ্রগড় রেল বাজার।
গোয়ালপাড়া গ্রামই বলা যায়। জুলিদের একতলা বাড়িটার পিছনেই বিশাল বাঁশবাগান। তার পিছনে মাঠ। মাঠের ধারে দাঁড়ালে কাটোয়া লাইনের ট্রেন দেখা যায়। জায়গাটার এখন উন্নতি হয়েছে। ইলেকট্রিক লাইট এসেছে, দু-একটা অবস্থাপন্ন বাড়িতে টেলিফোনও বসেছে। কিন্তু ঢের আগে যখন সন্ধে হলেই বাঁশবাগানে শেয়াল ডেকে উঠত, চোর-ডাকাতের ভয়ে সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে দরজায় দরজায় খিল পড়ত, ভূতের ভয়ে সবাই তটস্থ হয়ে থাকত সেই সময় এখানে বাস করতেন সুধীনবাবুর বাপ-ঠাকুর্দা। সুধীনবাবুরা অবশ্য বেশির ভাগ সময় থাকতেন কলকাতায়। অভিজিৎ আর জুলির পড়াশোনা কলকাতাতেই। এখন রিটায়ার করে সুধীনবাবু বাড়িটা হাল ফ্যাশানের করে নিয়ে এখানেই থাকেন। অনেকগুলো ঘর, ভালো বাথরুম। পাড়াগাঁয়ের এই সবুজ গাছ-গাছালি, খোলা মাঠের হাওয়া, শান্ত পরিবেশ সুধীনবাবুর খুব ভালো লাগে। কিন্তু জুলি আর তার দাদা অভিজিৎ বেশির ভাগ সময়েই থাকে কলকাতায় মামার বাড়িতে।
জুলি এম. এ-পরীক্ষা দিয়েছে। খুব স্মার্ট, বুদ্ধিমতী আর সাহসী। চাকরি করার জন্যে কলকাতার বাইরে যে কোনো জায়গায় তো বটেই, সুযোগ পেলে আমেরিকা পর্যন্ত যাবার ইচ্ছে। অভিজিৎ কলকাতায় থেকে খবরের কাগজে শখের সাংবাদিকতা করে। মাঝেমাঝে চলে আসে গোয়ালপাড়ায় নিজেদের বাড়িতে।
এদের বাড়ি থেকে অল্প দূরে চঞ্চল থাকত তার এক পিসেমশাইয়ের কাছে। বি. এ. পাশ করে বসে ছিল। চাকরি-বাকরি পায়নি। তার মা ছিল না, বাবা ছিল না। পিসেমশাই, পিসিমা বেকার ছেলেটার ওপর খুব চটা ছিল। কিন্তু এই আশ্রয়টুকু ছেড়ে সে যেতই বা কোথায়?
গোয়ালপাড়ায় চঞ্চলের একমাত্র আনন্দের জায়গা ছিল অভিজিৎদের বাড়ি। অভিজিৎ এর সঙ্গে তার বন্ধুত্ব ছিল। অভিজিৎ ছাড়াও এ বাড়ির সকলে চঞ্চলকে খুব ভালোবাসত।
চঞ্চলের মস্ত গুণ ছিল গল্প বলা–বিশেষ করে ভূতের গল্প। জুলি কলকাতা থেকে এখানে এলেই ডেকে পাঠাত চঞ্চলকে। প্রায় প্রতি সন্ধ্যায় চঞ্চল এ বাড়িতে এসে ভূতের গল্প শোনাত। ও বলত সবই নাকি ওর নিজের দেখা ঘটনা। সত্যি-মিথ্যে ভগবান জানেন। কিন্তু বানিয়ে বানিয়ে এমনভাবে গল্প বলত, মনে হতো যেন সত্যিই তা ঘটেছে। শুনতে শুনতে জুলির মতো মেয়েও ভয়ে কাটা হয়ে যেত।
যদি কেউ জিজ্ঞেস করত, সত্যি ঘটনা? চঞ্চল গম্ভীরভাবে বলত, আলবাৎ। এ তো আমার নিজে দেখা।
ব্যস, এর ওপরে আর তর্ক চলত না।
কত কথাই মনে পড়ে জুলির। কম সাহসী ছিল ছেলেটা!
একবার হলো কি, গোয়ালপাড়া থেকে মাইল সাত-আট দূরে এক বাড়িতে এমন ভূতের উপদ্রব হলো যে ভাড়াটে বিধবা মহিলা তার মেয়েকে নিয়ে সে-বাড়ি ছেড়ে অন্য বাড়ির সন্ধানে পাগলের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। কথাটা চঞ্চলের কানে এল। কালনা তো রীতিমতো শহর। সেখানে তিন-চারটে স্কুল আছে, কলেজ আছে, সাবডিভিশনাল পুলিশ অফিসার আছে– সেখানে ভূতের উপদ্রব! চঞ্চল ঠিক করল ব্যাপারটা জানতে হবে। জুলির মা বার বার নিষেধ করলেন। কিন্তু চঞ্চল শুনল না। সে কালনায় গিয়ে খোঁজ নিয়ে সেই বিধবা মহিলার সঙ্গে দেখা করল। ওদের কাছে সেই ভয়ংকর ঘটনার কথা শুনে চঞ্চল এক রাত্তিরের জন্যে সেখানে থাকতে চাইল।
