–রাইট! বলে বুলুর পিঠ চাপড়ালাম।
–যাই হোক, কিন্তু চুরি যায়নি তো?
–না! এইটুকুই রেহাই।
–ঠিক জান কিছু চুরি যায়নি?
বুলু হেসে বলল, ঘরে ঢুকে এক নজর দেখে কিছু চুরি গেছে বলে তো মনে হলো না।
–চলো, এখনি তোমার বাড়ি যাব।
বলে তখনই গায়ে হাওয়াই শার্টটা চড়িয়ে বুলুকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।
ওদের বাড়ি ঢুকেই চলে এলাম ওদের বাইরে-ঘরে। বুলুকে বললাম, তোমার আলমারিটা খোলো।
বুলু চাবি বের করে লাগাতে গেল কিন্তু তার দরকার ছিল না। আলমারিটা খোলাই ছিল। ভেতরে সেই খুলিটা নেই।
সেই অবস্থাতেই বেরিয়ে পড়লাম।
বুলু ব্যাকুল হয়ে পিছু ডাকল–কোথায় যাচ্ছেন?
বললাম, কবরডাঙায় তোমার ঐ ভণ্ড মামার আস্তানায়।
ও প্রায় কেঁদে উঠল–না-না, এই সন্ধ্যেবেলা যাবেন না।
কিন্তু আমার তখন জেদ–ওটা উদ্ধার করে লোকটাকে পুলিশে দিতেই হবে।
ঠাকুরপুকুরের এদিকটায় কখনো আসিনি। দুধারে মাঠ, কোথাও বা রীতিমতো জঙ্গল। কবরডাঙা। জায়গাটা রীতিমতো গ্রাম। তবু রাস্তাটা পিচঢালা। বাস চলে। মাঝে মাঝে লরিও যায়। এখানে পুরনো বাড়ি কি আছে জিজ্ঞেস করতেই একটা লোক মাঠের ওপর বিরাট দোতলা ভাঙা বাড়িটা দেখিয়ে দিয়ে বলল, ভূতের বাড়ি তো?
হাঁ, বলে মাঠে নেমে পড়লাম। লোকটা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
তখন সন্ধ্যে হয়ে গেছে। দূর থেকে বাড়িটাকে দেখে মনে হচ্ছিল প্রেতপুরী। ইট খসে পড়ছে। আলসের মধ্যে দিয়ে উঠেছে অশ্বথের চারা। ঢুকে পড়লাম সেই বাড়িতে। অন্ধকার। চারিদিক থমথম করছে। তারই মধ্যে হঠাৎ মনে হলো যেন দুটো জ্বলজ্বলে চোখ! থমকে গেলাম।
না, একটা কুকুর। কুকুরটা আমায় দেখে পালাল।
সামনেই সিঁড়ি। টর্চও সঙ্গে করে আনিনি। দেশলাই জ্বালতে জ্বালতে দোতলায় উঠে এলাম। একটা ঘর। বোধ হয় এই একটি মাত্র ঘরেই দরজা জানলা আছে। ঢুকে পড়লাম। দড়িতে ঝুলছে একটা লুঙ্গি, একটা ফর্সা পাজামা, একটা পাঞ্জাবি। সামনে কালো কাপড় ঢাকা– ওটা কি?
ভালো করে দেখলাম। ওটা একটা তে-পায়া। চমকে উঠলাম। এইরকম তে-পায়াতেই তো প্রেতাত্মা নামানো হয়। মামা কি তা হলে
কিন্তু আসল জিনিসটি কোথায়? মামাই বা কোথায়?
আবার দেশলাই জ্বালোম। লক্ষ্য পড়ল কুলুঙ্গিতে। একটি তামার পাত্রে সেই ছোট্ট মড়ার খুলিটি!
আমি মরিয়া হয়ে খুলিটা তুলে নিয়ে পকেটে পুরলাম। তারপর এক ছুটে নীচে। সামনেই সেই মাঠ। মাঠের পরেই পিচঢালা রাস্তা। পাছে দৌড়লে কারো নজরে পড়ি তাই জোরে হাঁটতে লাগলাম। নিশ্বাস বন্ধ করে হাঁটছি। চারিদিকে অন্ধকার–শুধু অন্ধকার!
হঠাৎ আমার মনে হলো, এই নির্জন মাঠে আমি আর একা নই। কেউ যেন পিছনে রয়েছে।
…হ্যাঁ, স্পষ্ট বুঝতে পারছি পিছনের মানুষটি এসে পড়েছে। …আমি দৌড়তে লাগলাম। কিন্তু পারলাম না। পিছনের লোকটা ঝাঁপিয়ে পড়ল আমার ওপর। আমি হুমড়ি খেয়ে পড়লাম। সে অমনি আমাকে জাপটে ধরল। উঃ, কী কঠিন সে হাত দুটো। সে স্বচ্ছন্দে আমার পকেট থেকে খুলিটা বের করে নিল। তারপর আমার গলা টিপে ধরল। ..মৃত্যু নিশ্চিত জেনে আমি প্রাণপণ শক্তি প্রয়োগ করলাম। এক মুহূর্তের জন্যে ওর হাতটা ঢিলে হয়ে গেল। অমনি কোনরকমে নিজেকে মুক্ত করে নিয়ে ছুটলাম রাস্তার দিকে। সেও ছুটে আসছে আমার পিছনে।
রাস্তায় লরির হেডলাইট..তবু আমি ঝাঁপিয়ে পড়লাম রাস্তায়। লোকটাও সঙ্গে সঙ্গে লাফ দিল।
লরিটা দুরন্ত গতিতে বেরিয়ে গেল।
ভালো করে তাকিয়ে দেখলামনা, আমি বেঁচে আছি। কিন্তু রাস্তার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছে ওটা কি?
কিন্তু সেদিকে মন দেবার মতো অবস্থা তখন ছিল না। হাঁটতে লাগলাম ডায়মন্ডহারবার রোডের দিকে।
.
পরের দিন সকালে বুলুদের বাড়ি চা খেতে খেতে সমস্ত ঘটনা বললাম। কাগজেও ঐ অঞ্চলে লরিচাপা পড়ে একটি মৃত্যুর খবর বেরিয়েছে।
বুলু বলল, আপনি খুব বেঁচে গেছেন কাকু! ভাগ্যি খুলিটা তখন আপনার কাছে ছিল না।
আমি হেসে বললাম, আর লরির চাকার নীচে খুলিটারও সদ্ব্যবহার হয়ে গেল।
বুলু একটু হাসল। তারপর বলল, কিন্তু আশ্চর্য এই যে–লোকটার যে বর্ণনা কাগজে রয়েছে তার সঙ্গে মামার চেহারা মেলে না।
আমি বললাম, তা জানি। ওটি মামার সাকরেদ। মামা কিন্তু রইলেন বহাল তবিয়তে। হয়তো আবার আসবেন।
বুলু শিউরে উঠল।
[শারদীয়া ১৩৯৩]
ম্যাকবেথের তরোয়াল
দুপুর রাতে কলিংবেল
অনেক রাতে সুধীনবাবুর ঘুমটা আচমকা ভেঙে গেল। কলিংবেল বাজছে–কিরিং-কিরিং কিরিং। নিঝুম গোয়ালপাড়ার বিরাট বাঁশবাগানের শুকনো পাতা আর রাতজাগা পাখিজাগা চমকে দিয়ে শব্দটা যেন দূরে মাঠের দিকে মিলিয়ে গেল। পাশের ঘর থেকে জুলি আর তার মাও এসে পড়েছে। বেলটা ততক্ষণে থেমে গেছে। অন্য একটা ঘর থেকে চোখ রগড়াতে রগড়াতে বেরিয়ে এল অভিজিৎ।
কেউ বেল বাজাচ্ছিল না?
সুধীনবাবুই উত্তর দিলেন, হ্যাঁ।
এত রাত্তিরে কে আসবে? বললেন অভিজিতের মা।
যে-ই আসুক দেখতে তো হবে। বললেন সুধীনবাবু।
বেলটা তো আর বাজছে না। দরজা খেলার দরকার কি?
এতক্ষণ জুলি একটা কথাও বলেনি। গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়েছিল। এবার বলল, বেল আর বাজবেও না।
বোনকে ধমক দিয়ে অভিজিৎ তার বাবার মতোই বললে, তবু তো দেখতে হবে।
তা দেখো গে না। কাউকেই দেখতে পাবে না। থমথমে মুখে বলল জুলি।
অভিজিৎ পা-জামাটা টাইট করে পরে দরজার দিকে এগোচ্ছিল, মা বললেন, খালি হাতে যাসনে। ঐ লাঠিটা নিয়ে যা। বলা যায় না তো
