এ কী! এত কুয়াশা কোথা থেকে এল? জানলাগুলো তো সব বন্ধ।
এমনি সময় সেই কুয়াশার মধ্যে থেকে ধূর্জটিবাবু নড়েচড়ে সোজা হয়ে বসলেন। হলদে বোতামের মতো দুটো চোখ কুয়াশার ভেতরেই ধিকি ধিকি জ্বলছে। একটানে খুলে ফেললেন হাতের দস্তানাটা। লণ্ঠনের ঘোলাটে আলোয় দেখা গেল শীর্ণ একটা হাত ক্রমশ এগিয়ে আসছে। সেই হাতে ছটা আঙুল। ছুরির ফলার মতো অতিরিক্ত সেই আঙুলটা কাঁপছে তিরতির করে।
আতঙ্কে চিৎকার করে উঠতে গেলেন মহীতোষবাবু কিন্তু কুয়াশায় দম বন্ধ হয়ে গেল।
.
দুদিন পর সুস্থ হয়ে উঠলেন মহীতোষবাবু। কি যে ঘটেছিল কিছুই বুঝে উঠতে পারলেন না। জানলেন সেই রাত্রে লক্ষ্মণই ডাক্তার ডেকে এনে তাকে বাঁচায়। কিন্তু ধূর্জটিবাবুর পাত্তা আর পাওয়া যায়নি।
সেদিন বিকেলে সেই দোতলা বাড়িতে ধূর্জটিবাবুর খোঁজ নিতে গেলেন মহীতোষবাবু। অবাঙালী বৃদ্ধ একজন বললেন, দুদিন আগে হঠাৎ ভোরবেলায় সেই বাঙালীবাবু চলে গেছেন। তিনি এঁদের কেউ নন। চিনতেনও না। কলকাতা থেকে নাকি এসেছিলেন কয়েক দিনের জন্য। কোথাও থাকার জায়গা পাচ্ছিলেন না বলে বাইরের ঘরটা ভাড়া নিয়েছিলেন।
মহীতোষবাবু স্তম্ভিত হয়ে গেলেন।
[শারদীয়া ১৪০০]
» মড়ার খুলি ও মামা
আর একটু হলেই বুলুটা বাস চাপা পড়ত। এমন অসাবধানে রাস্তা পার হয়–
কথাটা বলল আমার ভাইঝি রীণা। বুলু ওর ক্লাসফ্রেন্ড। রীণার কাকু, কাজেই বুলুরও আমি কাকু। সম্প্রতি নেপাল ঘুরে এল। এখানে এসে এতক্ষণ বাড়ির সকলের কাছে নেপালের গল্প করছিল। আমি ছিলাম না। তাই আমার জন্যে একটুকরো স্লিপ রেখে গেছে।
স্লিপটা আমার হাতে দিতে দিতে রীণা গজগজ করল–এত অসাবধান মেয়েটা এখুনি যে কী সর্বনাশ হত!
সে কথার উত্তর না দিয়ে আমি স্লিপটা পড়তে লাগলাম।
শ্রীচরণেষু কাকু,
নেপালে গিয়ে দুটো মজার জিনিস পেয়েছি। শীগগির একদিন চলে আসুন।…
সেদিনই বিকেলে অফিস-ফেরত বুলুদের বাড়ি গেলাম। বাইরে-ঘরেই ওকে পাওয়া গেল। ও তখন নেপালের ওপর লেখা কয়েকটা বই থেকে কী সব নোট করছিল, আমায় দেখেই আনন্দে লাফিয়ে উঠল।
তারপর একটুও দেরি না করে আমায় টেনে নিয়ে গিয়ে ওর কাচের আলমারির মধ্যে রাখা দুটো মজার জিনিসের একটা দেখাল।
আমি একটু অবাক হয়ে বললাম–এই তোমায় মজার জিনিস?
ও খুব হাসতে লাগল।
মজার জিনিস নয়? এমন জিনিস ভূভারতে কোথাও আর পাকেন?
তা বটে। জিনিসটা আর কিছুই নয়, একটা মড়ার খুলি। মড়ার খুলি তো অনেক দেখেছি কিন্তু এত ছোটো খুলি কখনো চোখে পড়েনি। খুলিটা স্বচ্ছন্দে হাতের মুঠোয় ধরা যায়।
–কেমন? মজার জিনিস নয়? বলে বুলু আবার হাসতে লাগল।
–মজার কিনা জানি না, তবে অদ্ভুত।
এমনি সময়ে বুলুর মা চা জলখাবার নিয়ে ঢুকলেন।
–দেখুন দিকি মেয়ের কী অনাসৃষ্টি কাণ্ড! শাড়ি গেল, ইম্পোরটেড ছাতা গেল, ক্যামেরা গেল–শেষ পর্যন্ত এই মড়ার খুলিটা ফুটপাথ থেকে পঞ্চাশ টাকা দিয়ে কিনে আনল। আর তারপরেই কী বিপদ শুনেছেন তো? কাঠমাণ্ড থেকে দক্ষিণা কালী দেখতে গিয়ে সিঁড়ি থেকে একেবারে খাদে পড়ে যাচ্ছিল।
বুলুকে জিজ্ঞেস করলাম–এটা তো তোমার এক নম্বর মজার জিনিস, দু নম্বরটি?
বুলু মুচকে একটু হাসল। বলল, সেটা আজ দেখানো যাবে না, যে কোনো মঙ্গল কি শুক্কুরবারে আসবেন।
বুলুর এই দু নম্বর মজার জিনিসটি যে আরো কত অদ্ভুত হতে পারে তা আমার ধারণা ছিল না।
মঙ্গল কি শুক্কুরবার মনে নেই। একদিন সন্ধ্যের সময়ে বুলুদের বাড়ি গিয়ে দরজায় কলিংবেল টিপলাম। কিন্তু তখনই কেউ দরজা খুলে দিল। এরকম বড়ো একটা হয় না। শেষে বার তিনেক বেল টেপার পর–ওদের বাড়ি যে বুড়িমানুষটি কাজ করে–সে দরজা খুলে দিল।
কিন্তু ভেতরে ঢুকেই হতাশ হয়ে গেলাম। বুঝলাম বুলু নেই, বুলুর মাও নেই।
বুড়িকে জিজ্ঞেস করলাম–কেউ নেই?
ও মাথা দুলিয়ে জানাল আছে। বলে বাইরে-ঘরের পর্দা-ফেলা দরজাটা দেখিয়ে দিল।
যাক্, বুলু তা হলে আছে। মনে করে পর্দা সরিয়ে বসার ঘরে ঢুকতেই থমকে গেলাম।
না, বুলু নয়। কেউ একজন কোচে গা এলিয়ে সামনের সেন্টার টেবিলের ওপর দু পা তুলে বসে আছেন। পরনে ধবধবে পা-জামা, গায়ে গিলে করা আদ্দির পাঞ্জাবি।
ইনি যে কে তা বোঝার উপায় নেই। কেননা তিনি একখানা খবরের কাগজ মুখের ওপর আড়াল করে রয়েছেন।
কি করব ভেবে না পেয়ে জুতোর শব্দ করে সামনের কোচটা একটু টেনে নিয়ে বসলাম। কিন্তু ভদ্রলোক কাগজ সরিয়ে একবার দেখলেনও না। এমনকি শ্রীচরণ দুখানিও আমার মুখের সামনে থেকে নামালেন না।
খুবই বিশ্রী লাগছিল। একবার ভাবলাম উঠে চলে যাই। কিন্তু এই অতি অদ্ভুত, অদৃষ্টপূর্ব অভদ্র লোকটিকে ভালো করে না জেনেও যেতে ইচ্ছে করছিল না। অগত্যা একটা সিগারেট ধরিয়ে চুপচাপ বসে রইলাম।
এমনি কতক্ষণ গেল, হঠাৎ চমকে উঠলাম।
–আরে! ওটা কি?
ভদ্রলোকের কোচের একপাশে কোনোরকমে একটা ম্যাগাজিন চাপা দেওয়া সেই মড়ার খুলিটা না?
ভালো করে দেখতে গিয়ে সেন্টার টেবিলটা নড়ে গেল। একটা বই পড়ে গেল। আর ঠিক তখনই–আঃ! কী সৌভাগ্য আমার! ভদ্রলোক কাগজখানি মুখের সামনে থেকে সরালেন। অমনি তাঁর শ্রীচরণের মতো শ্রীমুখখানিও দেখতে পেলাম। ছুঁচলো মুখ। মাথাটা মুখের তুলনায় বড়ো। অনেকটা নারকেলের মতো। রুক্ষু চুলগুলো সেই মাথার ওপর ফেঁপে ফুলে উঠেছে। কিন্তু সরু গোঁফ-জোড়ার ভারি বাহার!
